বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন-ভাতা-মর্যাদা বৃদ্ধির আন্দোলন প্রসঙ্গে কিছু মত ও দ্বিমত

কেন এই লেখা:

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির চলমান আন্দোলন সম্পর্কে চাইছিলাম না কিছু বলতে। গতকাল চবি’র এক ছাত্রের করুণ এক কাহিনী শুনে মনটা এমনিতে খুব ভারী হয়েছিলো। আজ সকালে সহকর্মী Ar Raji’র একটা সাহসী স্ট্যাটাস পড়ে এ বিষয়ে কিছু বলে ফেলার সাহস বেড়ে গেলো …!

বেশ কিছু দিন থেকে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের শিক্ষকদের সমিতিগুলো থেমে থেমে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির আন্দোলন করছে। থেমে থেমে বললাম এজন্য যে, উনারা যদি সত্যি সত্যিই দাবী আদায় করতে চাইতেন তাহলে ভর্তি পরীক্ষা ক’দিন বন্ধ করে রাখলেই পারতেন। ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের প্রতি মানবিক বিবেচনা হতে সে সময়ে ধর্মঘট না করে থাকলে তাদেরকে ভর্তি করানোর পরে প্রত্যেকের জীবনে ব্যক্তিগতভাবে চিরস্মরণীয় উচ্চশিক্ষাজীবন শুরুর দিন থেকেই কর্মবিরতি ঘোষণা করাটা কতটুকু মানবিক বা যৌক্তিক হয়েছে বা হচ্ছে? বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এটি প্রযোজ্য। বিষয়টাকে কেউ এমনও বলতে পারে, ভর্তি পরীক্ষার ‘সম্মানী’ হস্তগত করণে বিলম্ব সহ্য না হওয়াই আন্দোলন ফেলে রেখে পরীক্ষা গ্রহণের আসল কারণ ..?! জানি না ‘কর্তাব্যক্তিদের’ চিন্তায় আন্দোলনের কোন ছক কাজ করছিলো। পাবলিক ইউনিভার্সিটির স্যারেরা নিজেদের স্বার্থচেতনাকে নানা রকমের legal permissiblity বা moral rhetoric দিয়ে ঢেকে রাখার বিষয়েও বিশেষজ্ঞ বটে। কিছু ব্যতিক্রমী শিক্ষকও আছেন। Intrinsically moral – এ রকম শিক্ষক সিনিয়রদের মধ্যে হাতেগোণা কিছু আছেন। মিড-সিনিয়রদের মধ্যে একটু বেশি সংখ্যক শিক্ষক পেশাগত দিক থেকে স্বার্থচিন্তাশুন্য নীতিবাদী (deontologically moral) । তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সত্যিকারের আদর্শবাদী হলেন তরুণ শিক্ষকরা। অন্ততপক্ষে জয়েন করার পর থেকে প্রথম কয়েক বছর তাদের এই ফ্রেশ মেন্টালিটিটা থাকে।

শিক্ষকদের আর্থিক দুর্দশা-দুর্গতি:

ঘটনা-১: আমাদের এক সহকর্মী আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় হতে পড়াশোনা করেছেন। উনার এক সহপাঠী সেখানে শিক্ষক হিসাবে সাময়িকভাবে যোগদানের পর বাংলাদেশে বেড়াতে এসেছিলেন। ড. শাকিল। তিনি তখন ষাট হাজার রুপী বেতন পাচ্ছিলেন। বিশ হাজার মূল বেতন। মূল বেতনের সমপরিমাণ মহার্ঘ্য ভাতা। এবং সমপরিমাণ ঘরভাড়া ভাতা। এটি বারো-তেরো বছর আগের কথা। ঘটনা-২: এক সিনিয়ার শিক্ষক এক লেকচারারের কাছে মেয়ে বিয়ে দেয়ার পরে বললেন, দেখো, আমার মেয়ের জামাই যা বেতন পায় তারচেয়ে যে কোনো মিস্ত্রী প্রতি মাসে বেশি আয় করে …. ! বিশেষকরে আর্থিক সুবিধার দিক থেকে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কী পরিমাণে অবমানিত-বঞ্চিত তা এই ধরনের ঘটনা থেকে যে কেউ সহজে অনুমান করতে পারবেন।

low living, high thinking?

আমার ছোট ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পেরে কমার্স কলেজ হতে গ্রাজুয়েশান নেয়। এরপর সে সিএ ফার্স্ট পার্ট কমপ্লিট করে। সে প্রথম চাকুরীতে জয়েন করে সতের হাজার টাকা বেতনে। এর কয়েক বছর আগে আমি ফার্স্ট ক্লাস নিয়ে ডিপার্টমেন্টে লেকচারার হিসাবে জয়েন করি দু’হাজার আটশত পঞ্চাশ টাকার (২,৮৫০/=) মূল বেতনে …! সর্বসাকূল্যে সাড়ে চার হাজার টাকা। আপনারা বলতে পারেন, জ্ঞানী-গুণীদের জন্য ‘সাদামাটা জীবন, উচ্চ মার্গীয় চিন্তা’ (low living, high thinking) ই ভালো। আসলেই কি তাই? সক্রেটিক পিরিয়ডে এটি সত্যি হতে পারে। বর্তমান জমানায় আসল ব্যাপার হলো, low living, low thinking; high living high thinking। উচ্চশিক্ষার ব্যাপারে আমাদের ঘরের কাছের দেশগুলোসহ তাবৎ দুনিয়ায় এই নীতিকেই বাস্তবে অনুসরণ করা হয়। খুব সম্ভবত: বাংলাদেশ বাদে সবখানে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের এতো বেশি সুবিধা দেয়া হয় যে, যারা জানেনা তাদের কাছে সেসব রূপকথার গল্পের মতো শোনাবে। আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকেরা নিরীহ মাষ্টারদেরকে কোনো মতে বুঝ দিয়ে ঠকিয়ে যাচ্ছেন। অথচ তাদের সন্তানেরাই, দেশের ভবিষ্যত নাগরিকেরাই যে কার্যত: ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে! এভাবে হয়তো বিষয়টা নিয়ে তারা কখনো ভাবেন নাই। উপযুক্ত বেতন-ভাতা না দিলে মেধাবী ছাত্ররা কেন শিক্ষকতাকে পেশা হিসাবে বেছে নিবে?

রাজনীতি হলো শিক্ষকদের মর্যাদা হারানোর ঘূর্ণাবর্ত (black hole):

সরকার কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ঠকানো, তাদেরকে যাচ্ছেতাইভাবে বিহেভ করা, নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানো – এ সব কিছুই সম্ভব হচ্ছে রাজনীতির কারণে। বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত যে কোনো দুর্নীতি রাজনীতির মহৌষধে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যেতে পারে। যায়। তাই দুর্নীতিমুক্ত ক্যম্পাস গড়ার পূর্বশর্ত হলো শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতিমুক্ত ক্যম্পাস প্রতিষ্ঠা। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কোনোক্রমেই কোনো রকমের পলিটিক্যাল এক্টিভিজমের সাথে সম্পর্ক-সংশ্রব রাখা উচিত না। আমি একটা শিক্ষক-দলের নেতা ছিলাম। ঠাট্টা করে কেউ কেউ কিং মেকার ইত্যাদিও বলতেন। বিগত কয়েক বছর হতে আমি সকল ধরনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ত্যাগ করেছি। ঘোষণা দিয়েই [www.facebook.com/notes/904642376263575] ওসব কিছু বাদ দিয়েছি। সে সব কথা আজ থাক।

পেট ভরে ভাত খেতে না পারলে সারাদিন এটা-ওটা খাওয়ার জন্য আঁতি-উঁতি করা ক্ষুধার্ত ব্যক্তির মতো অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নানা রকমের সুবিধা খোঁজার কাজে সব সময়ে ব্যতিব্যস্ত থাকেন। এটি তাদের পেশাগত গবেষক বৈশিষ্ট্যের মারাত্মক ব্যত্যয়।

বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার ভয়াবহ অধঃপতনের চিত্র:

বাংলাদেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মাষ্টারির মতো এমন সুবিধার চাকুরী বোধহয় বিশ্বে আর নাই। বেহেশতে প্রবেশের পর আবাদান আবাদা সেখানে থাকার মতো দুনিয়ার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এ রকম স্থায়ী চাকুরীর সুযোগ নাই। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে সত্যিই ব্যতিক্রম …! বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়েতো কোর্স এসেসমেন্টের ব্যাপার আছে। ছাত্র-ছাত্রীদের মাধ্যমে কোর্স-টিচারের মূল্যায়নের ব্যাপার আছে। সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ এসব বিষয়ে পুরাই ব্রাহ্মণ …! কেউ তাদেরকে মূল্যায়ন করবে, চ্যালেঞ্জ করবে? অসম্ভব। ছাত্ররা শিক্ষককে মূল্যায়ন করবে, আর এর ভিত্তিতে তার চাকুরীর মেয়াদ বর্ধিতকরণ হবে কিনা তা নির্ধারিত হবে? পাগলের প্রলাপ …. !!! উনারা যে এতো এতো ডিগ্রী নিয়ে দয়া করে মাঝে মধ্যে ক্লাশ নিতে আসেন, তাইতো ঢের …!!!

লাল নোট:

লাল নোট বলে একটা কথা বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে প্রচলিত আছে। আমরা জানি, সাদা কাগজ কালের ব্যবধানে আস্তে আস্তে লালচে হয়ে যায়। তো মাষ্টার মশাই চাকুরীতে যোগদানের সময় কিছু হ্যাণ্ডনোট তৈরী করেছিলেন। বছরের পর বছর উনি সেগুলোই পড়ান। একই নোট। এবার বুঝছেন নিশ্চয়, লাল নোট কী জিনিস …! আমার একজন সহকর্মী গত আটত্রিশ বছর বিভাগে একটা কোর্সই পড়িয়েছেন। একই স্টাইলে। কন্টেন্ট, প্রেজেন্টেশান সব হুবহু একই। এ রকম দু’চারটা সিনিয়র শিক্ষক প্রতি বিভাগেই আছেন, মা-শাআল্লাহ! এমনও শিক্ষক আছেন, যারা সারা বছর মিলে কোনো কোর্সে পাঁচ-সাতটার বেশি ক্লাস নেন না। এবং সেসব ক্লাসও উনার নানা রকমের বিদেশ-অভিজ্ঞতার বয়ানেই শেষ করেন। ছেলে-মেয়েরা আসবে যাবে, ঘোরাফিরা করবে, ক্লাসও কিছু, মাঝে মধ্যে করবে – এটাই নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্টাইল …. !!!

বিশ্ববিদ্যালয় কী মূলত?

ঘোরাফিরার জায়গা? ক্লাসের প্রসংগে আমার কঠোর মনোভাবের বিষয়ে এক সহকর্মীর সাথে সেদিন বেপরোয়া ভঙ্গীতে কথা বলছিলাম। সারপ্রাইজিংলি তিনি আমার সাথে ঐক্যমত্য পোষণ করে বললেন, “মোজাম্মেল ভাই, আমি নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। ছাত্রজীবনে দক্ষিণ হালিশহর হতে আসা-যাওয়া করতাম। কিছু অর্থ উপার্জনেরও ব্যাপার ছিলো। তাই, প্রতিদিন ক্লাস করার জন্য আসতে পারতাম না। যেসব দিনে ভার্সিটিতে আসতাম কিন্তু কোনো ক্লাস পেতাম না, সেদিন আমি রীতিমতো কাঁদতাম …!!”

কত পার্সেন্ট ক্লাস হলে কোনো কোর্সে পরীক্ষা নেয়া যায়?

আমরা ছাত্রদের হাজিরা গণনা করি। আমরা নিজেরা আনঅথরাইজডভাবে ক’দিন অনুপস্থিত থেকেছি, ডিপার্টমেন্টে উপস্থিত থেকেও নানা ‘অফিসিয়াল কাজে’র অজুহাতে ক্লাস নেই নাই সে হিসাব কে রাখে? ৬০% ক্লাস না করলে ছাত্ররা পরীক্ষা দিতে পারেনা। কতো পারসেন্ট ক্লাস হলে কোনো কোর্সে পরীক্ষা নেয়া যাবে, তার কোনো হদিস কি আছে? অভিজ্ঞতায় দেখেছি কোনো কোনো পেপারে ১০% ক্লাসও না নিয়ে শিক্ষকরা প্রশ্ন সেট করেন …!! এখন আমার যে চিন্তাভাবনা, ছাত্রজীবনে যখন অন্যতম শীর্ষছাত্রনেতা ছিলাম তখন যদি তা থাকতো তাহলে অন্তত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাপরিবেশ আরো উন্নত হতো। ছাত্রজীবনে রাজনৈতিক কারণে বহু মিছিল করেছি, ধর্মঘট করেছি, তালা মেরেছি, অপসারণ আন্দোলন করেছি, ক্ষতি ও শাস্তির সম্মুখীণ হয়েছি। রাজনৈতিক স্বার্থচিন্তামুক্তভাবে বিশুদ্ধ শিক্ষা-অধিকারের কোনো ইস্যু নিয়ে কখনোতো তেমন কিছু করি নাই …! এখন আফসোস হয়!!

শুরুতে যে ছাত্রের করুণ কাহিনীর কথা বললাম সে চবি এপ্লাইড ফিজিক্সে চতুর্থ বর্ষ পরীক্ষা দিয়েছে। এপিয়ার সার্টিফিকেট দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে মাস্টার্সে ভর্তির জন্য আবেদন করেছে। সেই বিষয়টি নাকি মাত্র নতুন খুলেছে। সাময়িকভাবে। কয়েকশ পরীক্ষার্থীর মাঝে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় মাত্র পনের জনকে কোয়ালিফাই করেছে। তারমধ্যে সে তেরতম হয়েছে। স্যারেরা বারম্বার আশ্বাস দিয়ে ইতোমধ্যে তার রেজাল্ট পাবলিশড হবে। সেশন ফি সত্তর হাজার টাকা জোগাড়ের জন্য সে বাড়িতে গিয়ে এক লাখ টাকায় একটা জমি বিক্রী করেছে। যাহোক, ভাইভার দিন পর্যন্ত সাত মাসেও তার রেজাল্ট প্রকাশিত হয় নাই। বোর্ডের শিক্ষকদের হাতে পায়ে ধরেও কাজ হয় নাই। সে সেখানে ভর্তি হতে পারে নাই। সেখান থেকে ফোনে যোগাযোগ করার পরে এক শিক্ষক তাকে ধমক দিয়ে নাকি বলেছে, ‘আমরা কাজ করতেছি। তুমি কি মনে করো, আমরা বসে আছি? আমাদের কিছু করার নাই।’ কতো ছাত্রের এরকম কতো ক্যারিয়ার-ড্রিম দেশের প্রতিটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে দুমড়ে পরে বিচূর্ণ হচ্ছে তার ইয়াত্তা নাই।

বিদেশীদের মতো বেতন পেতে চাই, কিন্তু বিদেশীদের মতো সার্ভিস দিতে চাই কি?

শিক্ষকরা শুধুমাত্র নিয়মিত ক্লাস নিলেই হবে না। তাদেরকে ক্লাসে ভালোভাবে পড়াতে হবে। কী পড়াবেন তা লেকচার শিডিউল দিয়ে জানিয়ে দিতে হবে। কোর্স প্লান থাকতে হবে। যেভাবেই হোক না কেন, ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে কোর্স ম্যটেরিয়ালগুলো আগেভাগেই পৌঁছাতে হবে। প্রতিটা লেকচারের আগে লেকচার-শীট বা হ্যন্ডআউট স্টুডেন্টদের কাছে দিতে হবে। ক্লাসে প্রশ্ন করার অবাধ সুযোগ দিতে হবে। স্কুল ছাত্রদের মতো উঠ, বস, আসতে পারি স্যার, প্রেজেন্ট স্যার, ইয়েস স্যার, সালাম-কালাম ইত্যাদির হাস্যকর সাংস্কৃতিক-বাধ্যবাধকতাকে বাদ দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে আপণ মনে করতে হবে, ভালোবাসতে হবে, ইয়াং স্কলার হিসাবে সম্মান করতে হবে, তাদের সুবিধা-অসুবিধার কথা শুনতে হবে। তাদেরকে উপযুক্ত মানে মূল্যায়ন করতে হবে।

ব্যাধিই সংক্রামক, স্বাস্থ্য নহে:

এসব কিছু কিছুমাত্র অতিরিক্ত আশাবাদ নয়। বিদেশের যেসব উদাহরণ আমরা প্রায়ই বলি, তারা এসব কিছু সবসময়েই মেইনটেইন করে। তারা ক্লাসে যতক্ষণ পড়ান তার কয়েকগুণ সময় নিয়মিত নিজেরা পড়েন। প্রমোশনের জন্য যা দরকার তার বাইরেও ক্লাসের জন্য পড়াশোনা করে আসেন, আমাদের এখানে এমন শিক্ষকের সংখ্যা নিতান্তই কম। একই কোর্স বছরের পর বছর ধরে পড়ান এমন শিক্ষকই বেশি সংখ্যক। প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, ব্যাধিই সংক্রামক, স্বাস্থ্য নহে। কথাটার প্রাসঙিগকতা হলো, বিদেশের মতো আমরা বেতন চাই, কিন্তু বিদেশীদের মতো মানসম্মত শিক্ষাদানে আমরা আগ্রহী নই। অন্যরা কী সুবিধা পায় তা আমরা দেখি, তারা কতো নাজুক পরিস্থিতিতে চাকুরী করে তা আমরা ভাবি না, মানতে চাই না।

বিশ্ববিদ্যালয় এক্ট-অর্ডিন্যান্সে ক্লাস-পারফরমেন্সের কোনো মূল্যায়ন নাই…!!!

বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়টি শুধুমাত্র গবেষণার জন্য? আমার জানা মতে, বাংলাদেশে পিউর রিসার্চ ইউনিভার্সিটি একটাও নাই। সেটি দরকার কিনা, সেটি ভিন্ন আলোচনা। যদ্দুর জানি, এ দেশের সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা ও পাঠদানের সমন্বিত লক্ষ্যে (for both research & teaching) পরিচালিত। গবেষণার জন্য পাঠদান সহায়ক। যেমন মেডিকেল কলেজের প্র্যাকটিক্যাল করার জন্য প্রতিটা মেডিকেল কলেজের সাথে মানসম্পন্ন হাসপাতাল থাকে। আবার গুণগতভাবে উন্নত পাঠদানের জন্য নিয়মিত গবেষণা কর্ম অত্যাবশ্যক। এ যেন একটি অপরটির পরিপূরক।

সম্প্রতি আমাদের বিভাগে HEQEP এর একটা ওয়ার্কশপে এ বিষয়ে আমার প্রশ্নের উত্তরে উপাচার্য মহোদয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে রিসার্চ ইউনিভার্সিটি হিসাবে বললেন! যদি তাই হয়, তাহলেতো এখানে ক্লাস না হওয়া ইত্যাদি তো রীতিমতো জায়েয ই বটে ….। তাই না? শিক্ষকরাতো যার যার মতো করে নিয়মিত গবেষণা করছেন। জাতি-উদ্ধার হোক বা না হোক সেসব গাদা-গাদা গবেষণার ভিত্তিতে পদোন্নতি ও নানা রকমের সুযোগ-সুবিধাও নিচ্ছেন। পড়ানোর দরকার কী? কোনো টিচার যতই ভালো পড়ান, তা কি তার বেতন বৃদ্ধিতে কোনো অবদান রাখে? কে কোন কোর্স পড়ান, কীভাবে পড়ান, সেই কোর্স সংশ্লিষ্ট বিভাগে কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ, কোর্সটা কে ডিজাইন করেছে, তা কতো উন্নত, ছাত্ররা কোন কোন শিক্ষক ও কোন কোন কোর্স হতে অনেক বেশি উপকৃত, এসবের কি কোনো চাকুরীগত মূল্য (benefit points) আছে? বিশ্ববিদ্যালয়-জনপরিমণ্ডলে, বিশ্ববিদ্যালয় নীতিমালায় এগুলোর কি আদৌ কোনো প্রতিফলন বা কোনো ‘বস্তুগত মূল্য’ আছে?

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ঈমানী স্ট্যাটাস:

বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন ধরনের শিক্ষক চাকুরী করে।

(১) প্রথম গ্রুপে যারা আছেন তারা শিক্ষকতাকে এনজয় করেন। টিচিংটা তাদের passion, more than profession। এরা সংখ্যায় কম। এদের অবস্থা ঈমানের দিক থেকে এহসান পর্যায়ের। এরা যদি ধার্মিক হন তাহলে বলা যায় তাদের কাছে নামাজের মুসল্লা আর ক্লাসের লেকচার-ডায়াস – এ দুটিই হলো সমপরিমাণে পবিত্র ও সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।

(২) দ্বিতীয় গ্রুপে যারা আছেন তারা পড়ানোকে নিছক পেশাগত দায়িত্ব বিবেচনা করেন। নিয়মিত ক্লাসে যান। ফাঁকতালে সুযোগসুবিধাদির দিকেও যথাসম্ভব খেয়াল রাখেন। তাদের কাছে শিক্ষকতা হলো উপার্জনের উপায়। ঈমানের দিক থেকে এদের অবস্থা তাকওয়ার পর্যায়ে। এদের সংখ্যা প্রথম গ্রুপের চেয়ে বেশি।

(৩) লজ্জার বিষয় হলো, অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক তৃতীয় গ্রুপের অন্তর্ভূক্ত! মেধাবী হওয়ার কারণে এরা কোনো না কোনোভাবে শিক্ষক হয়েছেন। ক্লাস তেমন নেন না। ক্লাসে সিলেবাস অনুসরণ করে কখনো পড়ান না অথবা লাল নোট ধারী। ইনাদের সাথে সারাদিন কাটিয়েও আপনি কোনো একাডেমিক কথা শুনবেন না। ‘আমি এতো মেধাবী….’, ‘এভাবে আমি এতো এতো ডিগ্রী অর্জন করেছি’, এসবই তাদের সর্বোচ্চ একাডেমিক আলাপ। সারাক্ষণ ‘কী পাই নি..! কী পাই নি..!’ এমন একটা ভাব। শিক্ষকতার ঈমানের দিক থেকে এরা হলেন মুনাফিক স্ট্যাটাসের। বর্তমানে আমাদের দেশে সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এহেন ‘মুনাফিক শিক্ষক-এর সংখ্যাই সর্বাধিক। তথাকথিত better chance পেলে এরা এতো এতো গবেষণাকর্মকে রাতারাতি ভুলে গিয়ে যে কোনো কিছু করতেও দ্বিধা করবে না। বেতন-ভাতা বাড়ানোর এই ন্যায্য আন্দোলনে, কারো কারো দৃষ্টিতে এরাই সবচেয়ে বেশি সোচ্চার from a malafied motive of getting more money. বেতন বাড়িয়ে ফাঁকিবাজদেরকে সিনসিয়ার করা যাবে কি? মনে হয় না।

তুমি অধম, তাই বলিয়া আমি উত্তম হইবো না কেন?

আমার সহকর্মীদের অনেককেই সব সময়ে দেখি blame game চর্চায় ব্যস্ত। উনাদের দৃষ্টিতে ছাত্ররা এতো খারাপ! সরকার এতো ঠকাচ্ছে! প্রশাসন এতো খারাপ! ইত্যাদি ইত্যাদি। আচ্ছা, আমরা যদি শিক্ষক হিসাবে আমাদের যা করণীয় তার ন্যূনতম মানকে যে কোনো অবস্থায় অটুট রাখি, ছাত্ররা অমনোযোগী হয়ে ক’দিন থাকতে পারবে? আমরা যদি আমাদের মর্যাদাকে সব সময়ে স্মরণে রেখে সব কিছু করি তাহলে সরকার বা প্রশাসন ক’দিন আমাদেরকে ঠকাবে? ইগনোর করবে? বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া আসলে কতটুকু-কী হয়, তা কি সরকার জানে না? দ্রুত গতির ইঞ্জিনের সাথে সংযুক্ত থাকলে কোনো বগি কম গতিতে চলতে পারে কি? না। এক এক জন শিক্ষক এক একটা ইঞ্জিন। ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষকদের সাথে সংযুক্ত। সচল ইঞ্জিনের সাথে অচল কোনো বগি সংযুক্ত থাকতে পারে না। শিক্ষকরা ঠিক মতো তাদের দায়িত্বপালন করলে স্টুডেন্টরা তাদেরকে ফলো করতে বাধ্য। ছাত্র-ছাত্রীদের প্রেরণা জোগানো, সীমিত সম্পদ ও সাধ্যকে সর্বোচ্চ কাজে লাগানো – এগুলো শিক্ষকদেরই দায়িত্ব। এই দায়িত্ব কি সরকার এসে পালন করে দিয়ে যাবে? ছাত্র-ছাত্রীদের তুচ্ছ গণ্য করা, পাত্তা না দেয়া, সত্যি বলতে কী, তুচ্ছ কারণে কারো ক্যরিয়ারকে ‘জবাই করে দেয়া’, এসব যেন কোনো ব্যাপারই না …!! আফসোস …!!!! বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মতো এত অবাধ, লাগামহীন, স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারীতা দুনিয়ার কোনো পেশার লোকদের আছে কিনা সন্দেহ!!

বিশ্ববিদ্যালয় আইন রচনাকারীরা স্যারদের যে উচ্চ নৈতিক মান সম্পর্কে আগাম-অনুমান করেছিলেন তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে:

১৯৭৩ এর অধ্যাদেশ প্রণয়নের সময় আইন সভার সদস্যদের ধারণা ছিলো, ইনারা সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের জ্ঞানগুরু। ইনাদের জন্য নিয়মকানুন শিথিল করা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা যেহেতু বিবেক দ্বারা পরিচালিত, অতএব আইনগত বাধ্যবাধকতার এত দরকার নাই। এখন বুঝা যাচ্ছে, সেসময়কার এম.পি.রা একটা ইনোসেন্ট মিসটেক করেছেন। একটা বড় ধরনের ভুল করেছেন। আমার সহকর্মীরা এ পর্যায়ে আমার উপরে ক্ষেপবেন, নিশ্চত। আচ্ছা, যে স্যার নিজের বিভাগে ক্লাস নেন না, তিনি তার যাবতীয় প্রাপ্য ছুটির পরেও কীভাবে পার্টটাইম কোর্সটার সবগুলো ক্লাস ঠিকমতো নেন? কারণ, অন্য বিভাগে পার্টটাইম পড়ানোর পরে ক্লাসের হাজিরা অনুসারে সম্মানী দেয়া হয়। নিজের বিভাগে না পড়ালেও মাস শেষে ব্যাংক একাউন্টে বেতনের পুরো টাকাটা অটো প্রসেসে যোগ হয়ে যায়। তাই না? ক্ষুব্ধ শ্রদ্ধেয় সহকর্মীবৃন্দ, আপনারাই বলুন, রুটিন মোতাবেক ক্লাস না করার স্বাধীনতা আপনাদের কে দিল? দুঃখিত! আমি নামাজ পড়া আর ক্লাস করাকে ফরজ-ওয়াজিবের মতো বাস্তবে সমপরিমাণে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। একাডেমিক কমিটিতে আপনি স্বেচ্ছায় যে কোর্স পড়ানোর জন্য নিয়েছেন তা রুটিন মোতাবেক পড়িয়ে শেষ করাকে আমি ‘তারা যখন কোনো চুক্তি করে তখন তা পূর্ণ করে’ – কোরআনের এই আয়াত অনুযায়ী জরুরী (ফরজ) মনে করি।

শেষ কথা:

শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও মর্যাদা সন্তোষজনকভাবে বৃদ্ধি করা উচিত। শিক্ষকদেরকে বঞ্চিত করা প্রাকারান্তরে জাতিকেই বঞ্চিত করা। শিক্ষকের মর্যাদা অবনমন করে উচ্চ মানের শিক্ষা নিশ্চিত করা আদৌ সম্ভব নয়। অপরদিকে শিক্ষকগণ কর্তৃক যথোচিত মানের পাঠদান না করাও কিন্তু জাতিকে বঞ্চিত করার শামিল। তাই, শিক্ষকদের বেতন-ভাতা-প্রণোদনা ও মর্যাদা নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁদের ক্লাস পারফরমেন্সকে গুরুত্ব সহকারে মূল্যায়ণ করা উচিত। যে সব শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস নেন না, আমার মতে, আনুপাতিক হারে তাদের বেতন কর্তন শুধু নয়, একাডেমিক কমিটিতে কোর্স বণ্টনের সময় স্বেচ্ছায় কোর্স নিয়ে ঠিকমতো না পড়ানোর কারণে তাদের ওপর উল্টা জরিমানা আরোপ করা উচিত। এমনকি দশকের পর দশক ধরে ক্লাস-কোর্স-কন্টেন্ট ফাঁকি দেয়া শিক্ষকদের ডিমোশন, চাকুরীচ্যূতি এমনকি, জাতিকে বঞ্চিত করার অপরাধে তাদের জেলও হওয়া উচিত বলে মনে করি।

ফেসবুকে প্রথম প্রকাশিত লেখাটিতে মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য:

Mohammad Abdullah Arafat: আমি যখন ১ম বর্ষে ভর্তি হই, তখন একজন সিনিয়র টিচারের রুমে ঢুকে বললাম– স্যার আমি গবেষণা করতে চাই। তিনি আমাকে যা বললেন তা আমার জন্য হতাশাজনক ছিল। এই তো সেদিন, টিচারদের নিয়ে একটা ৬ দিন ব্যাপী প্রোগ্রাম হয়েছিল, স্টুডেন্টদের মধ্যে শুধু আমিই ৬ দিন এই প্রোগ্রামে ছিলাম। সেখানে একজন গবেষক, উপস্থিত টিচারদের উদ্দেশ্য করে বললেন, “আপনাদের লাল খাতা পরিহার করতে হবে, নিত্য নতুন ম্যাটেরিয়ালস স্টুডেন্টদের দিতে হবে।” এই কথা শুনে আমি দারুণ খুশি হয়েছিলাম, কিন্তু তারপরে হলো কি, সেই আগের লাল নোট খাতাই…? হ্যাঁ, আপনি ঠিক বলছেন। রাজনীতি শিক্ষকদের সর্বনাশ করছে। কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন শিক্ষকদের প্রক্টর পোস্টে দেয়া হয়। যারা ভালো মানের প্রতিশ্রুত গবেষক হতে পারত, তারা অধিকাংশ সময় এই সব ফালতু কাজে ব্যয় করছে? অন্তত আমার ডিপার্টমেন্টে আমি দেখি, আপনি যদি ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গাইড থেকে লিখেন, তাহলে নিশ্চিত ১ম ক্লাস পাবেন, অন্তত কাছাকাছি থাকবে!

Jalal Rumi: স্যার, ইচ্ছা ছিল লিখাটা শেয়ার করি। কিন্তু মাঝখানের দুইটা লাইনে বেশ কষ্ট পেলাম। তাই আর করা গেল না।

Mohammad Mozammel Hoque: কোন দুইটা? প্লিজ … !!!

Jalal Rumi: বিগত কয়েক বছর যাবত সকল ধরনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ত্যাগ করেছি– এই ঘোষণা…। স্যার, ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে এত্ত ভাল লাগা, শ্রদ্ধা করার কারণই আপনার এই সংশ্লিষ্টতা। সেটাকে রাজনৈতিক বলেন বা আদর্শিক যাই বলেন।

Mohammad Mozammel Hoque: ক. হ্যাঁ, আমি বর্তমানে দৃঢ়ভাবে এই মনোভাব পোষণ করছি, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কোনো বৃহত্তর রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্টতা রাখা নিতান্তই অনুচিত। খালি গায়ে ঘোরাফিরা করা যেমন বেআইনী না হলেও ভীষণ দৃষ্টিকটু তেমনি ‘রাজনীতি করা’টা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য একেবারেই বেমানান। বিশেষ করে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে।

খ. জামায়াতের চবি সভাপতি ড. হাবিবুর রহমান স্যারের এরেস্টের পরে ফেইসবুকে আপলোড করা আমার স্ট্যাটাসটি পড়তে পারো: www.facebook.com/MH.philosophy/posts/885672358116567 এই নোটটিও পড়তে পারো: www.facebook.com/notes/904642376263575

গ. তোমার আবেগকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু দুঃখিত! For last couple of years, I am totally detached with my former organizational attachments. I am convinced with my present position.

Zahid Hossain: সব পেশাই ঈমানী দায়িত্বই ভাবা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের যে কথাটা আমাকে এখনও কষ্ট দেয় তা হল “আমি তোমাদের না পড়ালেও আমার কিছু যায় আসে না, আমি বেতন ঠিকই পাব।” কতটা নিচু মনের হলে এমন মনের শিক্ষক ক্লাস ভর্তি শিক্ষার্থীদের এই কথা বলেন, আমি জানি না। ব্যক্তিগতভাবে এমন কিছু ব্যাপার নিয়ে লিখালিখি করায় আমি আমি অনেক হেনস্তা হয়েছি। জোর করে আমার থেকে মুচলেকা নেওয়া হয়েছিল যে আমি কোন শিক্ষকের ব্যাপারে কোন কিছু লিখব না, বলব না। সেই দিনগুলোর কথা আমি বিন্দুমাত্র ভুলিনি। সারা জীবন এইসব মনে থাকবে। ব্যাপারটা আমি শিক্ষা অংগনে শিক্ষার পরিবেশ প্রসংগে শেয়ার করলাম মাত্র।

Fazlur Rahman: শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও মর্যাদা সন্তোষজনকভাবে বৃদ্ধি করা উচিত। তবে যে সমস্ত শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস নেন না, আনুপাতিক হারে তাদের বেতন কর্তন শুধু নয়, কোর্স নিয়ে ঠিকমতো না পড়ানোর কারণে তাদের ওপর উল্টা জরিমানা আরোপ করা উচিত। এমনকি দশকের পর দশক ফাঁকি দেয়া শিক্ষকদের ডিমোশন, চাকরিচ্যুতি, এমনকি জাতিকে বঞ্ছিত করার অপরাধে জেলও হওয়া উচিত।

Sirajul Islam Sirajee: আমি একজন চবির দর্শন বিভাগের পেছন বেঞ্চের ছাত্র। এখন থাকি বিদেশ-ভূমিতে।
আজ স্যারের লেখাটা পড়ার পর কিছু বলার আগ্রহ ও সাহস দুইই জোগাল।

প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়ার পর আবিষ্কার করলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ কেমন মুখোশ নিয়ে ক্লাশ ও ক্যাম্পাসে ঘোরাঘুরি করেন। একজন শিক্ষক ক্লাশে এসে বললেন– তোমরা দর্শন পড়বে ভাল কথা, কিন্তু দর্শনকে নিজের জীবনে প্রতিফলন করার চেষ্টা করবে না। এ কি কথা! (বক্তা: এনায়েত স্যার)

ক্লাশ টেনে থাকতে যে স্যার সক্রেতিসের কথা বলতে বলতে আমার কিশোর মনে দর্শনের যে আবেশ সৃষ্টি করেছিল, তা নিমেষে কপোকাত! পরে এ বিষয়টা আমি ইংরেজি সাবজেক্টের এক বড় ভাইয়ের কাছে শেয়ার করেছিলাম। তিনি বললেন, ওনার উচ্চারণ কোর্সে ভর্তি হওয়া দরকার, শিক্ষকতা করার আগে।

পরে দর্শন বিষয়ে এ কথার পুনঃপুনিকতা হয়েছিল মনছুর স্যার, আবসার স্যার ও ম্যাক স্যারের মুখে।
একদিন তৃতীয় বর্ষে মোজাম্মেল স্যার বললেন– আমাদের জীবনটা হুজুর মোল্লাদের মত হয়ে গেছে। উনারা যেমন সকল কথায় ধর্মের ধরণা দেন, আমরাও সকল আলাপে দর্শনের ধরণা না দিয়ে পারি না। এ কি শুনালেন!

তাহলে দর্শনকে জীবনে মেশানো যায় (!?) না কি দর্শন রুটি-রুজি মাত্র?

অন্য একটি অভিজ্ঞতা শেয়ার না করে পারছি না। প্রথম বর্ষে কাঁপা কাঁপা শরীর-মন নিয়ে ভাইভা দিতে ঢুকলাম। সিগ্নেচার শিটে নাম, স্বাক্ষর ও রোল নং লিখলাম। স্যার প্রশ্ন করলেন,”তোমার বাড়ি কোন জেলায়?” জবাব দিলাম,”কক্সবাজারে।” এরপর কক্সবাজার বিষয়ে স্যার, এক্সটারনাল এবং আমি – তিন জনেই প্রাণবন্ত আলোচনা করলাম। উনারা দর্শন বিষয়ে কোন প্রশ্ন করলেন না। পরে যখন রেজাল্ট হল তখন দেখলাম ভাইভাতে আমি সি পেলাম। অদ্ভুত দর্শন! প্রসঙ্গত সেইদিন ভাইভাতে ছিলেন কোরবান স্যার।

জানতে ইচ্ছে হয়– এখনও কি কাজল ম্যাডাম পড়ানোর চেয়ে ধমকান বেশি? সফিক স্যার তার বিদেশ ভ্রমণ, মেয়েদের কাহিনি ও তার মনোবিজ্ঞানের কয়েকটা সংজ্ঞা দিয়ে কোর্স শেষ করেন? কিংবা – আবসার স্যার ‘বুজ্জনি’, ‘বুজ্জনি’ বলতে বলতে সারা ক্লাশে রাউন্ড দিতে থাকেন?

এখন আবার বেতন-ভাতা বৃদ্ধির আন্দোলন। বৃদ্ধি কোন কোন স্যারদের জন্য???

Tariq Faisal: টিচিং পারফর্মেন্স নিয়ে সব দেশেই সমস্যা আছে। আমি ইংল্যান্ডের দুইটা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি/করছি। একটা খুবই নিম্নমানের, আরেকটা দুনিয়ার সেরা ১০০ ইউনিভার্সিটির একটা। টিচিং কোয়ালিটিতে কিন্তু খুব একটা পার্থক্য নাই।

এখানে পরিস্থিতি এমন যে গবেষণা করলেই হবে না, প্রমোশনের জন্য ফান্ডিংও আনতে হবে। আমার এক কলিগ ৭০+ টপ টায়ার জার্নাল পাব্লিকেশন নিয়ে এখনও লেকচারার (আমাদের দেশের এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর এর সমমান)। আবার অনেকেই ৭/৮ বছরের মধ্যে ফুল প্রফেসর হয়ে গেছেন ভালো ফান্ডিং আনতে পারার জন্য।

টিচিং সবসময়েই অবহেলিত। মাত্র এই বছর থেকে কথা হচ্ছে টিচিং কোয়ালিটি এসেসমেন্টের। দুয়েক বছর পর থেকে প্রমোশনের ক্ষেত্রে টিচিং পারফর্মেন্সকেও কন্সিডার করবে বলে আশা করা যায়।

কয়েক মাস আগে পাকিস্তান আর বাংলাদেশ গিয়েছিলাম বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় সফরে। বেতন/ভাতা যে আসলেই বড় একটা ফ্যাক্টর এটা বুঝলাম পাকিস্তানের ইউনিভার্সিটিগুলো দেখে। পাকিস্তানে কিছু পাবলিক ইউনিভার্সিটি আছে যেখানে নিজ নিজ ডোমেইনের Q1 (বা 4*) জার্নালে পেপার পাব্লিশ করতে পারলে পেপার প্রতি ৫০,০০০ রুপি ইন্সেন্টিভ দেয়া হয়।

তাই শুধু বেতন ভাতা বাড়ালেই হবে না, সাথে আপনি যেটা বলেছেন, পারফর্মেন্সের সাথে সম্পর্কিত করে দিতে হবে। আমার ধারণা, শুধু বেতন তিনগুন করে দিলেও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর খুব একটা উন্নতি হবে না। কিন্তু কতজন শিক্ষক বেতনের সাথে পারফর্মেন্সের বাধ্যবাধকতা মেনে নিতে রাজি আছেন? খুব বেশি বলে মনে হয় না।

Saima Shams: সচরাচর এতোবড় লিখা পড়ার মত ধৈর্য্য রাখতে পারি না। কিন্তু আজকের লিখাটা এত এত এবং এতটাই যুক্তিসম্মত যে পড়তে পড়তে মনে হল যেন নিজের মনের চিন্তাগুলোর প্রতিচ্ছবি চোখের সামনে লিখা হয়ে দেখা যাচ্ছে। অনেক ধন্যবাদ স্যার আমাদের মত ভুক্তভোগী ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হয়ে এই কথাগুলো বলার জন্য। জানি না যাদের এই লেখাটা পড়ে নিজেদের একটু যাচাই করা উচিৎ তারা তা বুঝবেন কিনা। তাও আপনাকে ধন্যবাদ এমন সাহসী লেখার জন্য।

Shahadat Mahmud Siddiquee: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ‘শ্রেণি’আন্দোলন: বাস্তবতা ও ভবিষ্যত www.facebook.com/notes//945613592160769

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক: অতীতের ‘কিং মেকার’ ভূমিকার জন্য বর্তমানে কি অনুতপ্ত? ঘোষণা দিয়ে মতাদর্শগত অবস্থান থেকে সরে দাঁড়ানো কি সেটাই ইঙ্গিত করে না? স্ট্যটাসের মূল প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে সাইড প্রসঙ্গ নিয়ে কমেন্ট করার কারণ হচ্ছে, লেখক নিজেই মূল বিষয় প্রেজেন্ট করার সময় বার বার সাইড কন্টেন্টিতে ফিরে গিয়েছেন। রহস্য কি বা কোখায়?

Mohammad Mozammel Hoque: (১) না, আমার অতীত সাংগঠনিক অবস্থান ও কার্যকলাপের জন্য আমি মোটেও অনুতপ্ত নই। দেখুন, প্রচলিত ইসলামী আন্দোলনের সবচেয়ে ভালো সময়ে, ৮০-৯০ এর দশককে pick of the movement মনে করা অর্থে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়, অর্থাৎ চবিতে সুযোগ্য দায়িত্বশীলদের সাথে সাংস্কৃতিক-সাংঘর্ষিক-বুদ্ধিবৃত্তিক-সামাজিক-রাজনৈতিক-আধ্যাত্মিক তথা সকল গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ভূমিকা পালনের সুযোগ পেয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ!

(২) দলবিশেষ আর মতাদর্শ যে এক ও অভিন্ন নয়, তা আমি ২০১০ সাল হতে সোশ্যাল মিডিয়ায় নানাভাবে বারে বারে বুঝানোর চেষ্টা করেছি। আমি ইসলামী আদর্শের পক্ষেই আছি। তবে জামায়াতে ইসলামীতে নাই। জামায়াত আছে, থাকবে। বাদবাকি ধর্মীয়-রাজনৈতিক দল-গোষ্ঠীর মতো। এর pros & cons আলোচনার প্রসংগ আলাদা। যারা ইসলাম = জামায়াতে ইসলাম – অবচেতনে বা কার্যত এমনটা মনে করে, জানি না আপনি তাদের দলে কিনা। আমার বর্তমান মতাদর্শগত অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারবেন এই সাইটে: cscsbd.com। আপনার ক্লারিফিকেশনের জন্য এই প্রত্যুত্তর। বাদানুবাদে আমি নাই। ভালো থাকুন।

Fazlur Rahman: শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও মর্যাদা সন্তোষজনকভাবে বৃদ্ধি করা উচিত। তবে যে সমস্ত শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস নেন না, আনুপাতিক হারে তাদের বেতন কর্তন শুধু নয়, কোর্স নিয়ে ঠিকমতো না পড়ানোর কারণে তাদের ওপর উল্টা জরিমানা আরোপ করা উচিত। এমনকি দশকের পর দশক ফাঁকি দেয়া শিক্ষকদের ডিমোশন, চাকুরীচ্যুতি এমনকি জাতিকে বঞ্চিত করার অপরাধে জেলও হওয়া উচিত।

Tahsin Diya: নিরপেক্ষ দিক থেকে লেখার ক্ষমতা খুব কম মানুষেরই আছে। সেক্ষেত্রে আপনার লেখাগুলো ভালো উদাহরণ। আশা করছি লেখাটা তাদের দৃষ্টিগোচর হবে, যাদের সত্যিই এক্ষেত্রে কিছু করার ক্ষমতা আছে।

লেখাটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *