একবিংশ শতাব্দীতে ইসলামী আন্দোলনের কাজের ধরন: প্রেক্ষিত আজকের বাংলাদেশ

ভূমিকা:

ইসলামী আন্দোলনের নতুন ধারার কাজের ধরন কেমন হবে, অর্থাৎ প্রচলিত বৃহত্তর আন্দোলন জামায়াতে ইসলামীর সাথে এর সম্পর্ক কেমন হবে, সোজা কথায়, এটি কি জামায়াতের মধ্যকার একটি সংস্কারবাদী আন্দোলন হবে নাকি স্বতন্ত্র একটা নতুন ধারা হবে – তা নিয়ে ব্লগ ও ফেসবুকনির্ভর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গত বছর তিনেক হতে যে ব্যাপক মত-বিরুদ্ধ মত গড়ে উঠেছে, তারই প্রেক্ষিতে এই লেখা। এটি ইতিবাচক ধাঁচে ও প্রস্তাবনা আকারে উপস্থাপিত।

সোশ্যাল মিডিয়ার বিস্ফোরণ:

সাম্প্রতিক বছরসমূহে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নির্ভর হয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মতো মোস্ট রেজিমেন্টেড সংগঠনের সাংগঠনিক অচলায়তনের ভেতর থেকে ব্যক্তি উদ্যোগে নানা ধরনের পর্যালোচনামূলক বক্তব্য, সমালোচনা ও প্রস্তাবনা উঠে এসেছে। এই মত-প্রতিমত-বিরুদ্ধমতের ধারায় রয়েছে বৃহত্তর ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামান কর্তৃক ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের বকুল সেল হতে পাঠানো জামায়াতের বাহিরে একটা স্বতন্ত্র মডারেট ধারা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়ার প্রস্তাবনাভিত্তিক আলোচনা-সমালোচনা হতে শুরু করে তরুণ গবেষক এম এন হাসানের সাড়া জাগানো জামায়াত অধ্যয়ন সিরিজ। বাস্তবতা হলো বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে বিকশিত বিকল্প গণমাধ্যমের উন্মুক্ত প্লাটফরমে ব্যাপকভিত্তিক একটা প্রো-ইসলামিক ফোর্স গড়ে উঠেছে। হেফাজতে ইসলাম এই ধারায় সাম্প্রতিকতম সংযোজন।

আত্মপর্যালোচনায় ইসলামী দলগুলোর ব্যর্থতা:

দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে যারা ইসলামের জন্য কাজ করছে তারা পরষ্পরের বিরোধিতাই শুধু করছে, এমন নয়। সোশ্যাল মিডিয়ার বিশাল ও নিরাপদ প্লাটফর্ম পেয়ে দলীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ হতে শুরু করে সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা পর্যন্ত স্বীয় দলের নীতি আদর্শ ও কার্যক্রম নিয়ে খোলামেলা কথা বলছে। এর কিছু অংশ নিতান্তই ব্যক্তি আক্রমণ ও ঘৃণা-বিদ্বেষমূলক হলেও ওভারঅল এসব লেখালেখি ইসলামপন্থীদের মানসে এক নতুন দিগন্তের উন্মেষ ঘটিয়েছে। ইসলামের মতো একটা গতিশীল আদর্শের পতাকাবাহী হিসাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক দলসমূহ আত্মপর্যালোচনার অতি প্রয়োজনীয় এলিমেন্ট ও রিকোয়ারম্যান্টকে এর ন্যূনতম মানেও গ্রহণ বা প্র্যাকটিস করতে ব্যর্থ হয়েছে। লক্ষ্যণীয়, সোশ্যাল মিডিয়াতে ইসলামপন্থীদের তরফে উঠে আসা নানামুখী কথাবার্তার উল্লেখযোগ্য অংশই গঠনমূলক, সংশোধনমূলক ও প্রস্তাবনামূলক।

বর্তমান নাজুক সময়ে এসব কথাবার্তা কি সংগঠনকে দুর্বল করবে না? এসব সমালোচনা কি আত্মঘাতী নয়?

বাংলাদেশে আজ ইসলাম আক্রান্ত। হেফাজতে ইসলামের কানেকশানে তাবলীগের মতো বেখবর গোষ্ঠীও পরোক্ষভাবে আক্রান্ত। ‘দাওয়াতী কাজে’ সদাতুষ্ট নিরীহ তাবলীগপন্থীরাও অপারেশন শাপলা চত্বরের পরে ভীষণ অফেন্ডেড ফিল করছেন, ব্যক্তিগতভাবে জেনেছি। জামায়াত-শিবিরের উপর ভয়াবহতম রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন তো আছেই। এমতাবস্থায় ইসলামী সংগঠনসমূহের পর্যালোচনামূলক বক্তব্যকে যারা আত্মঘাতী মনে করছেন তাদের নির্দোষ সারল্যকে সম্মান করেই বলছি–

বিপদের সময়ে ধৈর্য্যধারণ করা, ক্ষমাপ্রার্থনা করা ও মোকাবিলা করা – এই তিনটি কাজের দ্বিতীয় ও তৃতীয়টির জন্য পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও আত্মসমালোচনা অত্যাবশকীয় শর্ত নয় কি? তদুপরি, বাংলাদেশে বিশেষ করে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম আক্রান্ত ও অসহায় হলেও সামাজিকভাবে এখনো ইসলামী শক্তিগুলো অনৈসলামিক শক্তিকে মোকাবিলা করে যাচ্ছে। তাছাড়া ইসলামপন্থীদের একটা বিরাট অংশ মোকাবিলার ময়দানে সক্রিয় নাই। তাদের অনেকেরই ময়দানে অনুপস্থিত থাকার নানাবিধ গ্রহণযোগ্য কারণ আছে বৈকি। ময়দানে অনুপস্থিতদের জন্য আত্মগঠনের চলমান কর্মসূচির পাশাপাশি ‘দলগঠনে’র মতো কাজেও ইতিবাচকভাবে সক্রিয় থাকা জরুরি নয় কি?

ইসলাম = জামায়াতে ইসলামী?

জামায়াতে ইসলামী ও এর বিভিন্ন অফশুটগুলো হলো ইসলামী আন্দোলন বা ইকামতে দ্বীনের (একমাত্র) ধারা। আর বাদবাকি সব খেদমতে দ্বীন বা সাধারণ দ্বীনি কাজ। এমনটি যারা মনে করেন তাঁদের কাছে ইসলাম = জামায়াতে ইসলামী বা জামায়াতে ইসলামী = ইসলাম।

রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম কায়েমের এজেন্ডা বা দাবি থাকলেই, যে কোনো ধরনের আরবিট্রেরি ও ইনকন্সিসটেন্ট কার্যক্রম ও সাংগঠনিক অবস্থান সত্ত্বেও তা সবই ইকামতে দ্বীনের অন্তর্ভূক্ত; আর সেটির সাথে একাত্ম হয়ে কাজ না করলে যে কেউ ইনফেরিয়র বা সাব-স্ট্যান্ডার্ড ‘খেদমতে দ্বীন’ হয়ে যাবে – এমনটি ধারণা করা এক ধরনের প্রান্তিকতার সমস্যা, আমি যাকে সচারাচর জামায়াতের লোকদের ‘সাংগঠনিকতাবাদ’ হিসাবে বলে থাকি।

সাংগঠনিকতাবাদ কী?

সাংগঠনিকতাবাদীরা তাত্ত্বিকভাবে আদর্শকে এক নম্বর দাবি হিসাবে গ্রহণ করলেও উক্ত আদর্শকে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বীয় সংগঠনের পদক্ষেপ বিশেষকে শিরোধার্য মনে করে। এ কারণে বাস্তবে তাদের কাছে সংগঠনই এক নম্বরের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আদর্শের জন্য সংগঠন বলা হলেও প্র্যাকিটিক্যলি তাতে দেখা হয়, সংশ্লিষ্ট দলীয় বিষয়াদির সমর্থন উক্ত তাত্ত্বিক আদর্শের মধ্যে আছে কিনা, তাই শুধু দেখা বা দাবি করা হয়। কোনো দলবিশেষের অনুসারীরা যা যা বলে থাকেন, উক্ত আদর্শ-কাঠামোতে এর বাহিরের যেসব বিষয় আছে সেসবকে আরোপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাস্তবে অকেজো করে রাখা হয়। কোনো তথ্যসূত্রের (নস্) পূর্বাপর সম্পর্ককে বিবেচনায় না নিয়ে শুধুমাত্র এর প্রামাণ্যতাকেই এর প্রয়োগযোগ্যতার ভিত্তি হিসাবে দাবি করা হয়। ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলন নিয়ে এমন হ-য-ব-র-ল পদ্ধতি সব ইসলামী দল ও প্রতিষ্ঠানই কমবেশি করে থাকে।

মডারেট ধারা কায়েম করা কিম্বা মডারেট হওয়ার চেষ্টা করা:

জামায়াতে ইসলামীর একটা বিকল্প (মডারেট) ধারা করতে হবে কিম্বা সব ইসলামী দলকে এক প্লাটফরমে আনতে হবে – এসব চিন্তা বাস্তবসম্মত নয়। আমার মতে, যার যার অবস্থান হতে ইসলামের জন্য প্লাটফরম গড়ে তুলতে হবে। এতে মাদ্রাসা শিক্ষিতদের সংগঠনকে আরো ‘নন-মডারেট’ হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের কার্যক্রমকে আরও গণমুখী করে সম্প্রসারিত করা উচিত। ইসলামী ছাত্রীসংস্থার কার্যক্রমকে সম্পূর্ণভাবে রিঅর্গানাইজ করতে হবে। সহজ বাংলায় ঢেলে সাজানো বলতে যা বুঝানো হয়। অর্থাৎ ক্ষেত্রবিশেষে তা আরও অনেক বেশি মডারেট হবে। যদিও ক্ষেত্রবিশেষে মডারেট হতে বা মডারেট করতে চাওয়াটা মোটেও বাঞ্ছনীয় নয়।

দ্বৈত শিক্ষাব্যবস্থা ও ইসলামপন্থীদের সম্পর্কে জনমানস:

বাংলাদেশে স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসা পদ্ধতির যে দ্বৈততা তা আমরা চাইলেই ভাঙতে বা একীভূত করে ফেলতে পারবো না। কয়েক শত বছরে যা তৈরি হয়েছে তা একটা সামাজিক কাঠামো হিসাবে স্থায়ী রূপ লাভ করেছে। মাদ্রাসা শিক্ষিতদের জন্য আলাদা সংগঠন না করায় মাদ্রাসা শিক্ষিতদের দ্বীনি চরিত্রের ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। ‘ইংরেজি শিক্ষিত’ মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ডের লোকজনেরা নিজেদের আলেম পরিচয় প্রায়শই গোপন করতে চান। প্রফেসর হয়ে যাওয়ার পরে তাঁরা নিজেদের মাওলানা উপাধী আর ব্যবহার করেন না। অথবা চান, প্রফেসর ও ড. উপাধী যেন আগে লেখা হয়। অন্য কোনো উপাধী না থাকলেই কেবল তাঁরা মুহাদ্দিস, মুফাসসির কিম্বা মুফতী সম্বোধনকে ব্যবহার করেন। নিজেদের বিভাগের নাম দেন ‘কোরআনিক সায়েন্সেস’, যা তাঁদের কাছে (হয়তোবা) যথেষ্ট শ্রুতিমধুর! আমার মতো অনেকের কাছে তা ‘ফিলোসফিক্যাল সায়েন্সেস’ এর মতো ‘….’ও বটে।

মাদ্রাসা শিক্ষিতদের নানাবিধ হীনমন্যতাবোধকে ইতিবাচকভাবে কাটানোর চেষ্টা না করে জামায়াত-শিবির সাংগঠনিকভাবে দুই ভিন্নধারাকে একীভূত করে প্রকারান্তরে দেশে ভাল মানের আলেম তৈরির পথকেই রুদ্ধ করে দিয়েছে। আলেমদেরকে ভাল আলেম হিসাবে গড়ে উঠতে হবে। সেটি প্রচলিত অর্থে মডারেট হতে চাওয়ার বিপরীত – এ কথাটাই বুঝাতে চেয়েছি।

প্লুরালিস্টিক ইসলামিজম:

প্রতিটা দল ও ব্যক্তি এক ধাঁচে গড়ে না উঠে যার যার মতো করে গড়ে উঠবে যাতে একটা বিস্তীর্ণ বাগানের মতো সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ নন-আর্টিফিশিয়াল সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে উঠে। এককেন্দ্রিক ইসলাম-ভাবনা হতে মুক্ত হয়ে প্লুরালিস্টিক ইসলামিজমকে এডপ্ট করতে হবে। সাংগঠনিক ঐক্য হবে গৌণ, আদর্শিক মতৈক্যই হবে ব্যক্তি ও দলসমূহের আন্তঃসম্পর্কের ভিত্তি।

নতুন ধারায় ইসলামী আন্দোলনের টার্গেট গ্রুপ কারা?

সমালোচনার বৈধতা:

যারা জামায়াতে ইসলামীর কাজের সাথে জড়িত তারা নতুন ধারায় ইসলামী আন্দোলনের কাজে কাদেরকে টার্গেট গ্রুপ হিসাবে বিবেচনা করবে? এই প্রশ্নের সাথে তারা দলীয় নীতি-আদর্শ ও ব্যক্তির কতটা প্রকাশ্য সমালোচনা করবে – এই বিষয়টি ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কিত।

সংস্কারের জন্য জামায়াত যখন প্রাইম টার্গেট গ্রুপ:

যদি জামায়াতকে এবং জামায়াতের সাথে থাকা লোকদেরকে টার্গেট গ্রুপ হিসাবে বিবেচনা করা হয় তাহলে প্রকাশ্যে জামায়াতের সমালোচনা করাটা অর্থহীন, স্ববিরোধী ও ক্ষতিকর। যদি জামায়াতের বাহিরের ইসলামপন্থীদেরকে টার্গেট গ্রুপ হিসাবে বিবেচনা করা হয় তাহলে প্রয়োজনে জামায়াতকে ‘ডিফেইমড’ করে হলেও ইসলামকে ডিফেন্ড করতে হবে। আর সাধারণ মুসলিম জনসাধারণকে টার্গেট গ্রুপ হিসাবে বিবেচনা করলে জামায়াত ও অপরাপর ইসলামী দল ও প্রতিষ্ঠানসমূহের অকাট্য ভুলগুলোকে অকপটে স্বীকার করে, সেগুলোর নিন্দা করে, ইসলামিস্টদের সীমাবদ্ধতাগুলোকে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো করে অস্বীকার করার ব্যর্থ চেষ্টা না করে, ইসলামকে আদর্শ হিসাবে আলাদাভাবে দেখাতে হবে, তুলে ধরতে হবে। ইসলামকে একটা অনন্য ব্র্যান্ড হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে ইসলামের সাথে সংযোজিত আগে পরের সব পরিচয়কে নিছক স্থানীয় ও গৌণ ব্যাপার হিসাবে বুঝতে হবে, বলতে হবে।

জামায়াতে ইসলামী কর্তৃক স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সংস্কার ও সংশোধনকে গ্রহণ করা:

জামায়াত যদি অভ্যন্তরীণভাবে সংশোধন ও সংস্কারকে গ্রহণ করে নেয় তাহলে সবচেয়ে ভালো। যে কেউ আশা করতে পারে, আগামীতে অনুকূল পরিস্থিতিতে জামায়াত তা করবে। বর্তমানে আক্রান্ত অপরাপর ইসলামী শক্তিও সম্ভাব্য অনুকূল কোনো আগামীতে নিজেদেরকে বাস্তবতার আলোকে সংশোধন করে নিবে – এমন আশাবাদও আমরা পোষণ করতে পারি। তবে আমার ধারণা এর বিপরীত। আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলে আমিই সবচেয়ে বেশি খুশি হবো। কিন্তু অভিজ্ঞতাপ্রসূত হিসাব আমাকে যা বলে তাহলো জামায়াত বা অন্য কোনো ইসলামী দল বা প্রতিষ্ঠান একান্ত আরোপিত ও বাধ্যগত পরিস্থিতি ছাড়া আদর্শ ও বাস্তবতা বিবেচনায় কখনো নিজেদের মধ্যে কোনো সিগনিফিকেন্ট ও সাসটেইন্যাবল পরিবর্তন বা সংস্কারকে অতীতেও গ্রহণ করে নাই, ভবিষ্যতেও করবে না।

সংস্কারের এই প্যারাডক্স বা ধাঁধাঁর ব্যাখ্যা:

ধরে নেই, জামায়াতের মতো উচ্চশিক্ষিত স্মার্ট ইসলামিস্টরা ‘ক’ গ্রুপ। অপরাপর ইসলামিস্টরা ‘খ’ গ্রুপ। বাদবাকি মুসলমানরা ‘গ’ গ্রুপ। ‘ক’ গ্রুপ অলরেডি ৭০% ইসলামিক। ‘খ’ গ্রুপ ৫০% ইসলামিক। ‘গ’ গ্রুপ ৩০% ইসলামিক। বলা বাহুল্য, ইসলামিক হওয়ার এই শতকরা কাল্পনিক হিসাব বাস্তব কর্মধারা নির্ভর। তাত্ত্বিকভাবে মুসলমান ব্যক্তি ও দল মাত্রই সর্বদা ১০০% ইসলামিক।

সাধারণভাবে মনে হবে, ‘ক’ গ্রুপ সংস্কার-পরিকল্পনা গ্রহণ করার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময়। ‘খ’ গ্রুপের পটেনশিয়ালিটি মাঝামাঝি। আর ‘গ’ গ্রুপের এগিয়ে যাওয়ার সম্ভবনা সবচেয়ে কম। এই আপাত সঠিক সুন্দর হিসাবটি নিতান্তই অবাস্তব ও ভুল। যারা আদৌ ইসলামিস্ট নয় এমন বৃহত্তর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানই আগামী দিনের ইসলামের জন্য সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময়।

ইডিওলজিক্যাল ফ্লুইডিটি:

যারা কোনো আদর্শকে বৃহদাংশে গ্রহণ করেছে তারা নিজেদের ‘গৃহীত আদর্শবাদ’কেই সম্পূর্ণ ও সর্বাঙ্গীন মনে করে এবং করছে। তাদের একমাত্র সমস্যা বা এজেন্ডা হলো সমাজ ও রাষ্ট্রে সেটি প্রতিষ্ঠা করা। নিজেদের আদর্শের ছাঁচে প্রতিনিয়ত যাচাই ও পুনর্গঠন করার বিষয়ে তারা মনে করে, তাদের সংশ্লিষ্ট দলীয় প্রতিষ্ঠাতা ইতোমধ্যে তা সেরে ফেলেছেন। অর্থাৎ দ্য অর্গানাইজেশান ইজ অলরেডি সাফিশিয়্যান্টলি ইসলামিক। ম্যাটার ইজ টু স্টাবলিশ দ্যা অর্গানাইজেশান স্টেক-হোল্ডারস লিডারশীপ অন দ্যা সোসাইটি এন্ড দ্যা স্টেট। সংস্কারকে গ্রহণ করার জন্য যে ইডিওলজিক্যাল ফ্লুইডিটি ও ফ্লেক্সিবিলিটির দরকার তা এই ‘ক’ ও ‘খ’ গ্রুপের মধ্যে বহু বছর আগেই রিজিড বা সলিড হয়ে গেছে।

গণসম্পৃক্ততার মতো একটা বৈপ্লবিক পরিস্থিতি:

তাই আমার ধারণায়, আগামী দিনের প্লুরালিস্টিক ইসলামিক মুভমেন্টের কাজে যারা নেতৃত্ব দিবেন তাদের ১নং টার্গেট গ্রুপ হওয়া উচিত সমাজের সাধারণ মানুষ তথা ‘গ’ গ্রুপ। সোশ্যাল মিডিয়ার পাশাপাশি সেমিনার ইত্যাদির মাধ্যমে কনসেপ্ট গ্রুপ হিসাবে অর্গানাইজ হয়ে মেইনস্ট্রিম থেকে যদি ৫% লোককে নিয়ে আসা যায় তাহলে ‘খ’ ও ‘ক’ গ্রুপ থেকে আরও ৫% লোক অনেকটা বিনা চেষ্টাতেই এই নতুন ধারায় চলে আসবে। ৭২ বছর কাজ করেও যদি ‘ক’ গ্রুপ এখনো গড়পরতা ১০% হিসাবে থাকে সেক্ষেত্রে এই নতুন ধারা আগামী ১০ বছরের মধ্যে যদি দেশের জনগণের অন্তত ১৫% শক্তি হতে পারে, তাহলে আশা করা যায়, পরবর্তী ৫ বছরের মধ্যে গণসম্পৃক্ততার মতো একটা বৈপ্লবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

বিশেষ ধরনে সংগঠন কায়েম:

নতুন ধারায় ইসলামপন্থী কার্যক্রমের নেতৃত্ব যারা দিবেন তাদেরকে নমনীয় ও বিকেন্দ্রেীকৃত কাঠামোতে যৌথ ও আদর্শিক নেতৃত্বের এক বিশেষ ধরনে ‘সংগঠন’ কায়েম করতে হবে। মানুষ পরিচয় পেতে ও দিতে ভালোবাসে। মানুষ একবার যে নাম ও পতাকাকে ভালোবাসে, নিজের মায়ের মতো সেটিকেই তাঁর কাছে সবসময় সবচেয়ে বেশি বা অন্ধভাবে ভালো লাগে। তাই ইসলামিস্ট হিসাবে যারা এখনো বিশেষ কোনো পতাকা ও শ্লোগানধারী নয়, তেমন লোকজন নতুন কাঠামোতে অধিকতর স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে।

সর্বদাই পূর্ণমাত্রায় সক্রিয় থাকা:

এমতাবস্থায়, বিগত ক’বছরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নির্ভর হয়ে ভেসে উঠা কনসেপ্ট গ্রুপ একটা কার্যকর সংগঠনে রূপলাভ করার আগ পর্যন্ত পূর্বতন সংগঠনে যে যেখানে আছেন তিনি সেখানেই থাকুন। সকল ভালো কাজে পূর্ণ অংশগ্রহণ করুন, নেতৃত্ব দিন। মনে রাখতে হবে, আমরা কেবল তাত্ত্বিক নই, সমভাবে কর্মীও বটে। যদি আপনি গন্তব্যকেই প্রাধান্য দেন তাহলে আপনার বর্তমান ভেহিক্যালটি ঠিকমত চলছে না বলে আপনি রাস্তার পাশে বসে থাকতে পারেন না। তাই না?

***

ফেসবুকে প্রথম প্রকাশিত এই লেখাটিতে মন্তব্যপ্রতিমন্তব্য:

আশরাফ আজীজ ইশরাক ফাহিম: জামায়াতের ইতিহাস অধ্যয়ন করে আমার ছোট মাথার ছোট বুদ্ধিতে যা বুঝেছি, সংস্কারপন্থীদের কাজ খুব একটা সহজ হবে না।

Mohammad Mozammel Hoque: Jamat, tabligh, hizbut tahrir and other Islamic organizations will not evolve in the minimum expected level compare to the ideal or standard. This is my personal conviction. So, the future Islamic movement has to truely pluralistic, accomodative and flexible. ‘Reform from within’ in jamaat-e-Islami is not possible at all. I can bate with anyone else on this. This note is personally an excuse for me and a well thought proposal for the JI reform expectants. Thanks.

Mushfiqul Islam: প্রিয় লেখক, আপনার কথায় কোনো সমাধানই আসেনি। কারণ আপনি কোরআন হাদিসের আলোকে জামায়াতের সমস্যাগুলো তুলনামুলক আলোচনা করেননি। আপনি যে সমাধান দিয়েছেন তাও কোরআন সুন্নাহর আলোকে তুলনা করে দেখাননি।

জামায়াতের কর্মসূচি, কর্মপদ্ধতি, গঠনতন্ত্র নির্ধারণে কোরআন সুন্নাহর তোয়াক্কা না করে নাসারাদের সন্তুষ্টি প্রাধান্য দিতে গিয়ে কাগজে কলমে তাগূত দলগুলোর সাথে কোনো পার্থক্য রাখেনি। অবশ্য তাদের সেই মানের আলেমও নেই যারা তাদের ভুলগুলো কোরআন সুন্নাহর আলোকে সুধরিয়ে দিবে। আর জামায়াত শিবির যেভাবে চলছে অদূর ভবিষ্যতে কোনো আলেম জামায়াতের নীতিনির্ধারক হবার সম্ভাবনা নেই। আবার কোনো আলেম তাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে ভুল ধরিয়ে দিলেই তারা সংশোধন হবেন বিষটা তা নয়। কারণ তারা এর নজির রেখেছেন। মওলানা আবদুর রহিমের কপালে কী ঘটেছিল তা হয়তবা আপনারা জানেন।

নিজের অস্তিত্ব রক্ষার্থে আল্লাহর দীনের সামর্থের চেয়ে দলীয় স্বার্থকে বড় করে দেখা, পাশ্চাত্যের অতি অনুকরণ, এবং এমন নেতৃত্বে যাদের দীনি ইলমের দৈনতার দরুন হালাল হারামের পার্থক্য করতে অক্ষমতাই জামায়াতের আদর্শিক পতনের মূল কারণ বলে আমি মনে করি।

Mohammad Mozammel Hoque: ১. আমি ধরে নিয়েছি, এই দীর্ঘ নোটের বোদ্ধা পাঠকগণ কোরআন হাদীসের সংশ্লিষ্ট রেফারেন্সগুলো সম্পর্কে ইতোমধ্যেই ব্যক্তিগতভাবে অবহিত।

২. প্লুরালিস্টিক ইসলামিজম, সংস্কার কার্যক্রমের প্রধান টার্গেট গ্রুপ নির্ধারণ, সংস্কারের গাণিতিক ধাঁ ধাঁ, ইডিওলজিক্যাল ফ্লুইডিটি, গণসম্পৃক্ততা, বিশেষ ধরনে সংগঠন কায়েম ও সার্বক্ষণিক সক্রিয়তা – এসব হলো এই নোটের মূল পয়েন্ট। বক্ষমান লিখাটা ‘জামায়াত নিরীক্ষণ’ টাইপের কিছু নয়। লিডিং ইসলামিক সংগঠন হিসাবে প্রসঙ্গক্রমে ও অনিবার্যভাবে এখানে জামায়াতের নাম এসেছে। জামায়াত বা কারো গায়ে বা কাপড়ে কতটুকু দূর্গন্ধ বা ময়লা আছে তা বের করার কোশেশ বা চর্চাকে মূল লক্ষ্য বানালে ইসলামী আন্দোলনের বাঞ্ছিত সংস্কার কার্যক্রম কখনো ন্যূনতম মানে সফল হবে না।

৩. ইসলামী আন্দোলনের সামগ্রিক কার্যক্রমে জামায়াত লিডিং পার্টে থাকা সত্ত্বেও ‘জামায়াতে ইসলামী = ইসলামী আন্দোলন’ – এমনটা মনে করা বা দাবি করা ঠিক হবে না।

৪. খেদমতে ইসলাম বনাম ইকামতে দ্বীনের পৃথকীকরণটা আংশিক সত্য। অতএব, সাদা-কালোর বাইনারিতে ফেলে ইসলামী আন্দোলন বলতে জামায়াতে ইসলামীকেই বোঝানো এবং এর ফলশ্রুতিতে জামায়াতকে অন্ধভাবে সমর্থন বা ঘায়েল করার উভয়বিধ প্রচেষ্টাই একদেশদর্শীতা দুষ্ট ও অগ্রহণযোগ্য।

৫. বাতাসের ঘাটতি না হলে যেমন আমরা সচারাচরভাবে বায়ুর অস্তিত্বকে টের পাই না তেমনি এদেশের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় ভাবধারার সামাজিক ইসলামের ব্যাকগ্রাউন্ডেই জামায়াতের ইসলামী আন্দোলন চর্চা – এটি জামায়াতের লোকজনেরা সাধারণত অনুভব করেন না। যার কারণে বিভিন্ন দেশজ বিষয় ও ব্যক্তিত্বকে তারা ‘ওউন’ করার চেয়ে ‘ডিজ-ওউন’ করেন বেশি।

৬. সুতরাং, আগামী দিনের ইসলামী আন্দোলনের রূপরেখায় জামায়াতের কার্যক্রমের ধারাবাহিকতার অনিবার্যতা সত্ত্বেও একে ‘জামায়াতে ইসলামীর সংস্কার’ মনে করাকে ভুল মনে করি।

বিষয়গুলোকে পরিষ্কার করার জন্য পয়েন্ট আকারে বললাম। ধন্যবাদ।

Mushfiqul Islam: ধন্যবাদ, স্যার।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *