আন্দোলন-ইসলামের টিকে থাকা কিম্বা বিজয়ী হওয়া …

ইসলামের কাজ নিম্নোক্ত ৭ ধরনের ব্যক্তির মাধ্যমে হতে পারে –

১. দায়ী বা মুবাল্লিগ

২. গবেষক

৩. সংগঠক

৪. সমাজকর্মী

৫. রাজনৈতিক নেতা

৬. মুজাহিদ

৭. লিবারেল আর্টিস্ট

এই সাত ধরনের কাজের একটি আরেকটি হতে ভিন্ন প্রকৃতির। কোরআন ও হাদীসে প্রত্যেক ধরনের কাজের ব্যাপারেই আলাদাভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। লিবারেল আর্টস বলতে বোঝায় সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সুকুমার বৃত্তি চর্চা। নবী-রাসূলদের ব্যাপারে লিবারেল আর্টিস্ট ব্যতিরেকে উপরোক্ত সব পরিচয়ই পূর্ণমাত্রায় প্রযোজ্য। ওহীধারণ তথা নবুয়তের দায়িত্ব পালনের কারণে তাঁদের পক্ষে প্রচলিত অর্থে কলা ও মানববিদ্যা চর্চা করা সম্ভব ছিলো না। তাই বলে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সুকুমার বৃত্তি চর্চাকে সুন্নাহ বহির্ভূত বলা যাবে না। রাসূল মুহাম্মদ (সা) এ বিষয়ে অনুমোদন ও উৎসাহ দিয়েছেন, আমরা জানি।  ইসলামী আন্দোলনের কর্মী হিসাবে আমরা উপরোক্ত সব দায়িত্বই যথাসম্ভব পালনের চেষ্টা করবো কি না – এটি হলো প্রসঙ্গ।

যারা দাওয়াতে ইলাল্লাহ বা মুবাল্লিগের দায়িত্ব পালন করবেন, তাঁদের স্কলার বা গবেষক হওয়াটা জরুরি কি না? যারা গবেষক হবেন তাঁদের সংগঠক হতেই হবে কি না? যদি না হন, সেটিকে তাঁদের ত্রুটি বা দুর্বলতা মনে করা সঙ্গত কি না? যারা সংগঠক হিসাবে কাজ করবেন তাঁরা মারামারিতেও চালু হওয়াটা জরুরি কি না? সমাজসেবামূলক কাজে যারা নিয়োজিত আছেন বা থাকবেন তাঁদেরকে রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনে বাধ্য করা সঙ্গত কি না?

ধারণা করছি, এইসব এবং এ ধরনের সম্ভাব্য সব প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচক হিসাবে দেয়া হবে। কাণ্ডজ্ঞান তাই বলে। সমস্যা হলো – বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনের মূলধারায় সম্পৃক্ত থেকে বিগত দুই যুগেরও বেশি সময়ে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতে দেখেছি, এক একজন ‘দায়িত্বশীল’কে ৭ নম্বর পয়েন্ট বাদে বাদবাকি সব পয়েন্টেরই নকীব বনতে হয়!!! এটি মানবচরিত্রের সাথে ভীষণ বেমানান। রাসূলের (সা) সাহাবীদের মধ্যে খুব কম সংখ্যক সাহাবী এ ধরনের নবীসুলভ (প্রায়) সর্বগুণে গুণান্বিত ছিলেন।

ইসলাম মানুষের স্বভাব-সংশ্লিষ্ট জীবনব্যবস্থা হওয়ার কারণে থানা, জেলা, মহানগরী ও কেন্দ্রে একই দায়িত্বশীলবৃন্দের সব সেক্টরে দায়িত্ব পালনের এই তরিকা ব্যর্থ হতে বাধ্য। ফলত একটি দিকে কিছুটা কাজ হলেও অন্যান্য দিক উপক্ষিত হচ্ছে। হচ্ছে মূলত একটাই, তা হলো – রাজনীতি। তাও সেটির হক আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, রাজনীতিকে রাজনীতির রসায়ন অনুসারে না করে দায়িত্ব পালন তথা ‘ঠেলুনি’ হিসাবে, অন্যান্য গঠনমূলক কাজ না করার অজুহাত হিসাবে আঞ্জাম দেয়া হচ্ছে!?

যারা দাওয়াতী কাজ করবেন তাঁরা স্কলার হবেন না, গবেষণা করবেন না – আমি এটি বলছি না। যারা সংগঠক হিসাবে কাজ করবেন তাঁরা সমাজসেবক হবেন না বা হতে পারবেন না – আমি এমন কথা বলছি না। যারা লড়াকু চরিত্রের তাঁদেরকে দিয়ে অন্যকিছু হবে না – আমি এটিও বলছি না। আমি যা বলছি, তা হলো – এসব গুণাবলীর কোনো একটা একজন ব্যক্তির মধ্যে প্রবল হবে। মেধাবী হলে, তিনি পরিস্থিতিগত কারণে অন্যান্য ফিল্ডে কাজ করেও ভালো করতে পারবেন। যদিও সচারচর এটি ঘটে না এবং স্থায়ীভাবে তা করা সম্ভব বা ফলপ্রসূ হয় না।

এই আলোচনার সারমর্ম হলো যোগ্যতার ভিত্তিতে দায়িত্ব বন্টন ও পালন। একবিংশ শতাব্দীর সেন্টিমেন্ট হলো বিকেন্দ্রীকরণ ও বিশেষায়ন। ‘জ্যাক অফ অল ট্রেডস, মাস্টার অফ নান’ আপ্তবাক্যটি মনে রাখা অতীব জরুরি। কাজ ও দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে একেক ধরনের জনশক্তিকে একেক পরিমণ্ডলে রাখতে হবে। আদর্শগত সাযুজ্যতা ছাড়া সবাইকে একক সংগঠনকাঠামোর অধীনস্থ করা সঠিক নয়।

মাদ্রাসা ছাত্রদের কাজকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের কাজ হতে পৃথক রাখতে হবে – আমি যদি এ কথা বলি আপনারা অনেকে প্রবলভাবে আপত্তি জানাবেন, জানি। আচ্ছা বলুন তো, মাদ্রাসার ছাত্র ও মেডিকেলের ছাত্রদের যদি এক ইউনিটে কাজ করতে বলা হয়, সেটি কতটুকু (বাস্তবতা তথা হিকমাহর দৃষ্টিতে) ঠিক হবে? শিথিল পর্দাচেতনা, প্রশ্ন করার অভ্যাসসহ বিভিন্ন কারণে মাদ্রাসা পড়ুয়া দায়িত্বশীলের অধীনে মেডিকেল পড়ুয়াদের মানোন্নয়ন অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। নয় কি?

সকল পেশাজীবীদের আলাদা সংগঠন আছে। কেবলমাত্র (ইসলামিস্ট) বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরাই মূল সংগঠনের নামে কাজ করেন! আওয়ামী লীগের শিক্ষকরা বঙ্গবন্ধু পরিষদের ব্যানারে কাজ করেন। জিয়া পরিষদের নামে বিএনপির শিক্ষকরা কাজ করেন। মানুষের প্রত্যাশা, শিক্ষকরা প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে জড়াবেন না। অথচ, ইসলামী আন্দোলনপন্থী শিক্ষকগণকে এমন একটা মূল সংগঠনের প্রত্যক্ষ পরিচয়ে কাজ করতে হয় যেটি আপাদমস্তক একটা রাজনৈতিক দল হিসাবে পরিচিত!

ব্যক্তিক এবং পেশাগত বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে সংগঠন গড়া ও দায়িত্ববন্টন করা না হলে বাংলাদেশে আন্দোলন- ইসলামের নিছক টিকে থাকা ছাড়া বিজয়ী বা আধিপত্যশীল হওয়ার কোনো ভবিষ্যত দেখছি না। লেখাটা অগোছালো হলেও বিষয়ের প্রতি সংশ্লিষ্টতা বোধ করলে, মতামত দিন। ভালো থাকুন।

মূল পোস্টের ব্যাকআপ লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *