চাই টেক্সট ও কনটেক্সটের সম্মিলন

ইন্টারনেট এসে দুনিয়াটাকে এত বেশি পরিবর্তন করে দিয়েছে, যা ইতিহাসে বিরল। দুনিয়াটা আর আগের মতো নাই। প্রযুক্তি-বিপ্লব মানব সভ্যতায় অভিনব এক যুগের সূচনা করেছে। কোনো পুঁজিপতি একশ’ বছর আগে ভাবে নাই, সফটওয়্যার বানিয়ে কেউ বিশ্বের শীর্ষ ধনী হবে। ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড নামে একটা প্যারালাল রিয়েলিটি দাঁড়িয়ে যাবে, এটি কেউ ভাবে নাই। যোগাযোগ মাধ্যমের এই বিপ্লব মানুষের সামাজিক সম্পর্কের ওপরও বিশেষ প্রভাব ফেলেছে। কোনো বিশেষ নীতি, আদর্শ বা ধর্মের দোহাই দিয়ে আধুনিকতা-পূর্ব অবস্থায় সমাজকে ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব হবে না।

এই নব্য বাস্তবতায় ইসলামের মতো কালোত্তীর্ণ জীবনাদর্শকে তাই নতুন করে বুঝতে হবে। ইসলামের চিরন্তন নীতিমালা ও মৌলিক করণীয়গুলোকে নতুন প্রেক্ষাপটের নিরিখে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। মতাদর্শগত এই চিরন্তনতা ও জাগতিক পরিবর্তনশীলতার এই দ্বৈততাকে সমন্বয় করা কঠিন কিছু নয়। পরিবর্তন যে হয়েছে, এবং তা মৌলিক ও ইতিবাচক, এটি সবার আগে ঠিক মতো বুঝতে হবে।

প্রতিক্রিয়াশীল ও নেতিবাচক মন-মানসিকতার ইসলামপন্থীরাই সমকালীন ইসলামপন্থার প্রধান সমস্যা।

এসব প্রতিক্রিয়াশীলগণ উদগ্র হয়ে পাশ্চাত্যে গিয়ে পশ্চিমাবিরোধী কড়া কড়া কথা বলে। যেন পাশ্চাত্য মানেই খারাপ। কোনো জাদুমন্ত্রবলে যেন ইসলামী সভ্যতা সেখানে কায়েম হয়ে যাবে। নিদেনপক্ষে, ওয়েস্ট যেন ধ্বসেই পড়লো বলে। এসব social justice worrier-দের (SJW) দৃশ্যমান প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র হলো কীবোর্ড বিপ্লবে দিনরাত ফানা হয়ে থাকা। দেশে এসে মাটি ও মানুষের সাথে মিশে কিছু একটা করার ব্যাপারে তাদের ভীষণ অনীহা।

দেশে থাকা এনালগ কিংবা ডিজিটাল বুদ্ধিজীবী তথা ছাপোষা বিপ্লববাদীরা দিনরাত স্বপ্ন দেখে, তারা এস্টাবলিশড হবে। তারা নিজেরা বা তাদের সন্তানেরা ‘মানুষ’ হবে; মানে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিসিএস হবে। দ্বীন ও দুনিয়াকে তারা একসাথেই পাবে। নিজে একা নয়, ফ্যামিলি শুদ্ধা। মানুষের পকেট কাটা পরজীবী আলেমে দ্বীন হিসাবে পরিচিতদের অবস্থা আরও খারাপ। ক্ষুধার্তের মতো পাতে থাকা প্রতিটা খাদ্য কণিকাকে তারা পরম আনন্দে উপভোগ করে। দেখবেন, ইনকাম ট্যাক্সের হিসাব, জায়গা-জমির হিসাবের বেলায় তারা আপনার-আমার চেয়ে বেশিই বুঝে। নিজের প্রাপ্যতার ব্যাপারে তারা সীমাহীন অনুদার। নিজেদের জন্য তারা রোখসত বা অগত্যার দোহাই দিবে। কিন্তু অন্যদের জন্য আযিমত বা সর্বোচ্চ মান দাবি করবে।

কাউকে কিছু সেক্রিফাইস করার কথা বলতে শুনলে আমি আঁৎকে উঠি। জীবনে সেক্রিফাইস করা লোক তো কম দেখলাম না। জান্তব ও বাস্তব জীবন ও জগতকে হুজুগে আবেগে অস্বীকার করতে চাওয়াদেরকে দেখেছি, সো কলড ক্যারিয়ার তাদের পূর্বতন নৈতিক সত্তাকে আস্ত গিলে হজম করে ফেলেছে। এখন তারা হালাল ক্যাপিটালিস্ট নীতির অনুসারী।

সেজন্য আমি পরিমিত মাত্রায় ভোগের পক্ষে। আইন ইত্যাদিকে যতটুকু মানা যায়। আমার মতে, জীবনকে উপভোগ করার চেয়ে সঠিক কাজ আর নাই। মানুষের ভোগ বা উপভোগের বৈচিত্রপূর্ণ আকাঙ্ক্ষাগুলোকে রেগুলেইট করার জন্য যতসব আইন, নৈতিকতা, সমাজ ও রাষ্ট্র। নীতিবাদীরা ভুলভাবে দাবি করে, আইন বা নৈতিকতাই প্রথম বিবেচ্য বিষয়। না, আইন বা নৈতিকতা মানুষের প্রথম বিবেচ্য বিষয় নয়। মানুষের প্রথম ও প্রধান বিবেচ্য বিষয় হলো তাদের অন্তর্গত নানামুখী ভোগপ্রবণতা। সংঘাত এড়ানো ও সুখকে যথাসম্ভব বাড়ানোর জন্য কিছু সামষ্টিক আচরণধারাকে সবাই গ্রহণ করে নেয়। যাকে আমরা নৈতিকতা বলে থাকি। আর নৈতিকতার সুনির্দিষ্ট প্রয়োগকে আমরা বলি আইন বা আইনের শাসন।

মানুষ কি স্বভাবতই খারাপ? নাকি মানুষ আসলেই ভালো? নীতিবাদী, বিশেষ করে ধর্মবাদীরা মনে করে, মানুষ আসলেই খারাপ। তাই তারা মানুষকে ভালো করার চেষ্টা করে। অথচ, তারা নিজেরাই স্বীয় আদর্শের মানদণ্ডে আদৌ ততটা ভালো মানুষ নন। অন্যদিকে গান্ধীবাদী বা ইউনুসবাদীরা মনে করে, মানুষ আসলেই ভালো। বাস্তবতা হলো, মহাত্মা গান্ধী ততটা মহাত্ম্য ছিলেন না। মুহাম্মদ ইউনুসরাও সুদী কারবার করেই মানবতার সেবক বনেছেন।

মানুষকে আসলে যতটা ভালো হিসাবে মটিভেশনাল স্পিকাররা দাবি করে, মানুষ ততটা ভালো নয়। আবার মানুষকে নীতিবাগিশ তাত্ত্বিকেরা যতটা খারাপ হিসাবে দাবি করে, মানুষ ততটা খারাপও নয়। মানুষ আসলে মানুষেরই মতো। ভালো-মন্দ মিলিয়ে সে এক বাস্তব জীবন্ত সত্তা।

মানুষকে এই বাস্তব জগতের জীবন্ত সত্তা হিসাবে বিবেচনা করার মাধ্যমেই মানুষকে জাগতিক হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব। ধর্মবাদীরা এই পর্যায়ে ক্ষেপে উঠবেন। কেননা, তারা চান মানুষকে পারলৌকিক কিছু হিসাবে গড়ে তুলতে। আমার দৃষ্টিতে জাগতিক বনাম অতিজাগতিকের এই বাইনারি তুলনাটা সব ভুলের উৎস। ইসলাম যতটুকু বুঝেছি, তাতে দেখেছি, অখণ্ড জীবনের শুদ্ধ পরিচয়ে যোগ্য জাগতিক পূর্ণ সত্তা হিসাবে নিজেকে গড়ে তোলার মাধ্যমেই মানুষের মানবিক পূর্ণতা অর্জন সম্ভব। জাগতিকতাকে বাদ দিয়ে বা অবহেলা করে কোনো ধরনের শুদ্ধ মানবিকতা হতে পারে না। সোজা কথায়, জগতকে সুন্দরতর করে গড়ে তোলার মাধ্যমে আসবে মানবমুক্তি। তাই, আমাদের মুক্ত হতে হবে অজ্ঞতা থেকে, কূপমণ্ডকতা থেকে ও দুনিয়া পরিচালনায় অযোগ্যতার অভিশাপ থেকে।

জীবন, জগত, মানুষ ও বিদ্যমান বাস্তবতাকে সম্যকভাবে বুঝতে হবে। একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতা অভিনব। এখনকার অর্থব্যবস্থা অভিনব। এখনকার যোগাযোগ ব্যবস্থা অভিনব। এখনকার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অভিনব। এর মানে এই নয় যে এখন মানুষ ফেরেশতা বা শয়তান হয়ে গেছে বা যাবে। বরং, নবতর এই বাস্তবতায় মানবীয় সৃজনশীলতার এক অভাবিতপূর্ব দিগন্তে আমরা উপনীত। ইসলামের মতো চিরন্তন আদর্শকে টিকিয়ে রাখা, বরং বিজয়ী আদর্শ হিসাবে একে প্রতিষ্ঠার জন্য বিদ্যমান বাস্তবতার যথাযথ উপলব্ধি, সংকট ও সম্ভাবনার অকপট স্বীকৃতি, বৈশ্বিক পরিস্থিতির নির্মোহ বিশ্লেষণ ও অনিবার্য সামাজিক পরিবর্তনকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা জরুরি।

এত তাত্ত্বিক ও সামগ্রিকভাবে বলা কথাকে বুঝার জন্য একটা অতি সংবেদনশীল বিষয়কে উদাহরণ হিসাবে সংক্ষেপে বলছি। আমরা জানি, সুদ ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। অথচ, আধুনিক অর্থব্যবস্থা ও ব্যাংক ব্যবস্থা সম্পর্কে ইসলামী শরীয়াহ কী বলে তা বের করা স্কেল দিয়ে ফুট-ইঞ্চি মাপার মতো যথেষ্ট সহজসাধ্যও নয়। কথাটা খেয়াল করবেন, আমি বলেছি, বর্তমান ব্যাংকিং সিস্টেম ও মনিটরি সিস্টেম অভিনব। সুন্নাহর গঠনপর্বে এগুলো বা এগুলোর কাছাকাছি কিছুর কোনো অস্তিত্বই ছিলো না। বেইজ মানি বনাম ফিয়াট মানি, ফ্রেকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং ও মানি মাল্টিপ্লায়িং সিস্টেম সম্পর্কে না জানলে কারো উচিত হবে না, এই ইস্যুতে কোথাও পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে তর্কে লিপ্ত হওয়া।

আমি বর্তমান ব্যবস্থাকে খারিজ করে দেয়া কিংবা একে সমর্থন করা, এর কোনোটাতেই এখানে এনগেইজ হতে চাচ্ছি না। যা চাচ্ছি তা হলো, দুনিয়াটা কীভাবে চলছে, আদর্শ কী বলে তা খোলামনে জানার গুরুত্বটা যাতে আমরা বুঝতে পারি। এর পাশাপাশি যথোচিত বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও যোগ্যতা নিয়ে বিদ্যমান বাস্তবতাকে মোকাবিলা করায় যাতে আমরা নিয়োজিত হই। যেসব আদর্শ মূলত ফ্যান্টাসি, সেসব ইউটোপিয়ান চিন্তাকে আমি এড়িয়ে চলি। যেমন, কম্যুনিজম। আবার বাস্তব কোনো আদর্শ নিয়ে কার্যকর পন্থা অবলম্বন না করে আদর্শের কষ্টকল্পনা বা ফ্যান্টাসি চর্চারও আমি বিরোধী। ড. তারেক রমাদান যেমনটা বলেছেন তা আমি সঠিক মনে করি। তার মতে, কোনো একক ব্যক্তি, তিনি যতবড় পণ্ডিতই হোন না কেন, তার একার পক্ষে কোনো যুগসংকটের সুরাহা করা অসম্ভব। সেজন্য চাই text ও context-এর সমন্বয় ও সহযোগিতা।

 

ফেসবুক পোস্টের লিংক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।