উচ্চশিক্ষিত আধুনিক নারীদের ক্ষমতার বিকার

ক্ষমতা হলো এমন ব্যাপার যা থেকে উপকার লাভ করতে হলে একে হজম করার ক্ষমতাও থাকা চাই। এর থেকে প্রয়োজনীয় ‘পুষ্টিলাভের ক্ষমতা’ না থাকলে যে কোনো সময়ে এই অপরিণামদর্শী ক্ষমতায়নের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সুস্থ, স্বাবলম্বী ও উন্নয়নশীল না হয়ে ক্ষমতার বিকারজনিত বদহজমের শিকার হতে পারে। যোগ্যতাবহির্ভুত ক্ষমতায়নের প্রভাবে ভিকটিম-পরিস্থিতি হতে একজন নিরীহ ব্যক্তি রাতারাতি নির্যাতনকারীর ভূমিকায়ও অবতীর্ণ হতে পারে। ক্ষমতার তাপ সহ্য করার ক্ষমতা না থাকলে ‘তরকারী’ রান্না হওয়ার পরিবর্তে পাতিলসহ পুড়ে ছাইও হয়ে যেতে পারে।

একতরফাভাবে পাশ্চাত্য হতে আমদানী করা নারীর ক্ষমতায়নের এই যুগে আধুনিক নারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হারে ক্ষমতার বিকার লক্ষ করা যাচ্ছে। গার্মেন্টেসে চাকুরী করা প্রায়-অশিক্ষিত নারী হতে শুরু করে লোভনীয় সরকারী-বেসরকারী চাকুরী করা উচ্চশিক্ষিত আধুনিক নারী, কেউই ক্ষমতার বিকারগ্রস্ততা হতে আজ মুক্ত নন। অবশ্য কেউ কেউ এর ব্যতিক্রম। এই ব্যতিক্রমী মহিয়সীদের ব্যাপারে খোঁজ করলে দেখবেন, তারা ঐতিহ্যসম্পন্ন পারিবারিক সুশিক্ষার সুরক্ষার মধ্যে থাকার কারণে ক্ষমতায়নের এই প্রলয়ংকরী বিষবাষ্প হতে নিজেদেরকে কোনোমতে (marginally) বাঁচাতে পেরেছেন।

সবার ব্যাপারে না বলে নিজের চেনাজানা উচ্চশিক্ষিত সমাজ হিসাবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সম্পর্কেই বলি। আজ তেইশ বছর হলো বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে একজন চাকুরিজীবী হিসাবে নারীর একদেশদর্শী ক্ষমতায়নের নানা মাত্রায় বিকারগ্রস্ততা দেখছি। অতি সংক্ষেপে য়ুনিভার্সিটির ছাত্রীদের কথা দিয়ে শুরু করি।

আমাদের এক প্রাক্তন ছাত্রী কাজী তহুরা এখন খাগড়াছড়ি সরকারী কলেজের শিক্ষক। এমফিল করছে। বছরখানেক আগে আমার অফিস রুমে আসলো। অনেক কথা হলো। কথায় কথায় জানালো, তাদের সাথে যেসব মেয়েরা পড়তো তারমধ্যে সে সহ মাত্র ৫ জন মেয়ে চাকুরী করে। তাহলে ভাবুন তো, এই যে পড়ালেখা নিয়ে এত ব্যস্ত সব নারীরা, সার্টিফিকেট লাভের মাধ্যমে আসলে কী অর্জন করতে চাচ্ছে? যদি তারা চাকুরী না করে? উপযুক্ত পাত্রকে বর হিসাবে পাওয়া। এই তো? দুঃখজনক বলুন আর যাই বলুন না কেন, একটা উচ্চশিক্ষিত ছেলের সাথে বিয়ে হওয়াটাই কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ নারীর উচ্চশিক্ষা অর্জনের মূল উদ্দেশ্য। ভাবুন তো, এরা দেশ ও জাতির কত সম্পদের অপচয় ঘটাচ্ছে। কীভাবে এরা জাতিকে বঞ্চিত করছে, ভাবুন তো…!

প্রতিটা মানুষেরই শিক্ষা লাভের অধিকার আছে। এবং তা হলো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা। উচ্চ শিক্ষা সবার অধিকার নয়। এটি ব্যক্তির যোগ্যতা, অবকাঠামো ও রিসোর্সগত সুবিধা এবং দেশ ও জাতির চাহিদা থাকার ব্যাপার। অর্জিত শিক্ষাকে কাজে লাগানোর দৃঢ় ইচ্ছা না থাকাটাও এক ধরনের অযোগ্যতা বটে। জামাই মরে গেলে বা স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে চাকরী করা লাগবে, সেজন্য সার্টিফিকটটা হাতে নিয়ে রাখা – এই যুক্তি নিতান্ত হ্যাংলামোপূর্ণ, অচল, হাস্যকর ও স্ববিরোধি-কপটতাপূর্ণ নয় কি?

আর উচ্চশিক্ষিত মেয়েদের মধ্যে যারা চাকুরী করে তারা কোনোমতে চাকুরী রক্ষার্থে যা করা দরকার তাই করে। মাসের শেষে বেতনের টাকা উত্তোলনই হলো প্রতিষ্ঠানের সাথে তাদের মূল সম্পর্ক। এ যেন, মার্ক্সের ভাষায়, ‘উৎপাদন সম্পর্কের ব্যাপার’। প্রতিষ্ঠানের ভালো-মন্দ নিয়ে তারা ভাবে না। ‘সাদা’কে সাদা, ‘কালো’কে কালো বলে তারা শক্তিশালী কোনো পক্ষের বিরাগভাজন হতে চান না। ওসব যেন ‘ছেলেদের কাজ’। স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানে ডমিন্যান্ট রোল প্লে করে, উচ্চ শিক্ষিত কর্মজীবী নারীদের মধ্যে এমন উদাহরণ বিরল। আমার কর্মজীবী ৫ বোনের মধ্যে ৪ জনই, আলহামদুলিল্লাহ, এ ধরনের ব্যতিক্রমীদের অন্যতম।

বিশেষ করে সমকালীন বাংলাদেশে নারীদের কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ এখনো মোটেরওপরে নারীস্বার্থবিরোধী। লক্ষ করেছি, অধিকাংশ পুরুষ, নারী সহকর্মীদের প্রতি অবজ্ঞাসুলভ সেক্সিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। আমার পর্যবেক্ষণে, এর পিছনে আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের সাথে সাথে কর্মজীবী নারীদের ব্যক্তিত্বহীনতা ও নারী হিসাবে কিছু বাড়তি সুবিধা নেয়ার প্রবণতাও কম দায়ী নয়। যেসব নারী ব্যক্তিত্ব বজায় রাখেন, কোয়ালিটি দিয়ে সারভাইভ করতে চান, কিছু মনে করবেন না, ‘লটর-ফটর’ করে না, তাদেরকে সবাই শ্রদ্ধা করে। এমন আত্মমর্যাদাশীলদেরকে দুষ্ট লোকেরাও ঘাটানোর সাহস করে না। সমস্যা হলো, নিজেদের ‘কারো ঘাড়ে সওয়ার হয়ে চলার অন্তর্গত মানসিকতার’ কারণে অধিকাংশ নারী কর্মজীবীরাই এমন উচ্চ নৈতিক মনোবল ধারণ করতে ব্যর্থ হন। আজকের আলোচনাটা যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার অভিজ্ঞতা নিয়ে, বিশেষ করে ক্যাম্পাসের শক্তিমান বউদের নিয়ে, তাই, এ বিষয়ে এখন কথা বাড়াতে চাচ্ছি না।

লেডিস হলের কর্মচারী, হাউস টিউটর ও প্রভোস্টরা অনেকের চেয়ে বেশি জানেন, এসব উচ্চ শিক্ষাঙ্গনের মেয়েদের আসল চেহারা কেমন। বাহিরে পুরুষ, বিশেষ করে ছেলেদের সামনে, তারা যতটা সো-বার তথা কমনীয়, লেডিস হলের গেইট পার হওয়ার সাথে সাথেই তাদের এই নম্রতা আর ততটা থাকে না। পরস্পরের সাথে তো বটেই, সেখানকার দোকানদার ও কর্মচারীদের সাথেও তারা ভালো ব্যবহার করে না। মেয়েদের হলে দোকান করে এমন এক কর্মচারী-দম্পতির কাছ হতে শোনা এসব কথা শোনা। যাহোক, এসব শোনা কথা নিয়ে আজ আর বেশি কিছু না বলি।

ক্যাম্পাসের মহিলা শিক্ষকদের কথা তো বলাই মুশকিল। এ নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে আমার সুবিধা হলো আমার স্ত্রীও শিক্ষক। সেটাই আবার আমার জন্য বিরাট অসুবিধার কারণও বটে। না জানি কী কথায় আমার ম্যাডাম কিংবা ম্যাডাম-পক্ষ আবার ক্ষেপে যান, বুঝতেছি না। তবুও সত্য কথা বলার জন্য কিছু তো বলা দরকার। তাছাড়া কিছু ব্যতিক্রমীদের কথা বলে একটা ওয়ে-আউট তো প্রথমেই দিয়ে রাখছি…।

যেসব ম্যাডামের হাজবেন্ড শিক্ষক নন, সেসব গোবেচারাদের দেখেছি, ক্ষমতাসম্পন্ন বউদের হাতে তারা নানাভাবে অপমানিত। শারীরিকভাবে শুধু পুরুষ হলে হয় না, পুরুষসুলভ ব্যক্তিত্ব তথা পৌরুষও থাকতে হয়। স্ত্রীর চেয়ে নিম্নতর সামাজিক মর্যাদাসম্পন্ন স্বামীদের এই মর্যাদা সচরাচর থাকে না। ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়েই তাদের সংসার করে যেতে হয়। কারো অভিজ্ঞতা এর ব্যতিক্রম হলে তিনি ভাগ্যবান বর, নিঃসন্দেহে।

আর হ্যাঁ, মাঝখানে একটা কথা বলে রাখি। যারা মনে করেন– যার যার কামাই সে করবে। পাক্কা সমানাধিকারের ভিত্তিতে নারী-পুরুষ একসাথে পরিবারভুক্ত থাকবে। চাইলে সন্তান উৎপাদন করবে, অথবা করবে না। সন্তান উৎপাদন করলে পিতা-মাতা উভয়েই পালাক্রমে সমান-সমান দায়দায়িত্ব নিয়ে বাচ্চা পালবে। নারীরা রান্নাবান্না করতে বাধ্য থাকবে না। করলেও জামাই-বউ অল্টারনেটিভলি ভাগাভাগি করে করবে। জামাইয়ের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করার জন্য স্ত্রী ‘চাহিবামাত্র বাধ্য থাকিবে না’, স্ত্রী কখন সাড়া দিবে এটি তার মর্জি-রুচির ব্যাপার। স্ত্রীর টাকা-পয়সার ব্যাপারে স্বামীর কোনো ‘কথা’ থাকবে না। স্ত্রী তার পেশাগত কারণে যে কোনো জায়গায় ঘুরে বেড়াবে, স্বামী বাধা দিতে পারবে না।

আর যা-ই হোক, ইসলামের পারিবারিক জীবনের সাথে এ ধরনের নারীবাদী সংসারজীবনের কোনো সম্পর্ক নাই।

ইসলামের দৃষ্টিতে আর দশটা প্রতিষ্ঠানের মতো, পরিবারও একটা প্রতিষ্ঠান। যত অযোগ্যই হোক, পুরুষ এর কর্তা বা পরিচালক। অবশ্য সে জন্য কুফু বা সমতা দেখে বিয়ে করার ওপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ‘কাউয়ামু-না’ শব্দের যত নারীবাদী লিবারেল ব্যাখ্যাই করা হোক না কেন, পরিবার যদি আদি ও সরলতম প্রাকৃতিক প্রতিষ্ঠান হয়, তবে স্বামী হলো সে প্রতিষ্ঠানের পয়লা নম্বর ব্যক্তি। তারমানে, প্রধান হিসাবে তিনি যাচ্ছেতাই করবেন, স্বৈরাচার চালাবেন, এমন নয়। এর বিপরীতে, যতই সহনশীলতা ইত্যাদি সহকারে তিনি চলুন না কেন, যত সহমর্মিতা নিয়েই তিনি পরিবার চালান না কেন, ক্ষমতার দিক থেকে বলুন আর দায়-দায়িত্বের দিক থেকে বলুন, স্বামী হিসাবে তিনিই এই পারিবার নামক প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা কাঠামোতে থাকা এক নম্বর ব্যক্তি।

কর্তৃত্ব-নেতৃত্বের এই গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতার জন্যই মুসলিম পুরুষদের জন্য (আহলে কিতাবভুক্ত) অমুসলিম মেয়ে বিয়ে করা বৈধ করা হলেও মুসলিম নারীদের জন্য কোনো অমুসলিম পুরুষকে বিয়ে করার অনুমোদন দেয়া হয় নাই। নেতৃত্ব ও আনুগত্য সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টার কারণেই দাসীদেরকে স্ত্রী হিসাবে নেয়ার অধিকার পুরুষকে দেয়া হলেও অধীনস্ত দাসদের সাথে যৌন সম্পর্ক করার ব্যাপারে নারীদের নিষেধ করা হয়েছে।

আমার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী কথাগুলোকে ইসলামের এই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পারিবারিক ব্যবস্থাপনার আলোকে বিবেচনা করতে হবে। কেননা, আমি মুসলিম। তাই ইসলামের কোনো সুস্পষ্ট বিষয়ে আমি কোনো আপস করবো না। হতে পারে, ইসলামের সংশ্লিষ্ট বিষয়টা বুঝার ক্ষেত্রে আমার সমস্যা আছে। হতে পারে, আমি ভুল বুঝছি। সেটা দেখিয়ে দেয়া আপনাদের দায়িত্ব। আমি কেন ইসলামকে সঠিক মনে করি, সেটি অবশ্য আলাদাভাবে আলোচনার ব্যাপার। অন্য প্রসঙ্গ।

দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে ক্যাম্পাসে থেকে নিজ চোখে যা দেখেছি, তার ভিত্তিতে এ কথাগুলো বলছি। প্রমাণ হিসাবে স্পেসিফিক কারো নাম বলতে চাচ্ছি না। বুঝতেই পারছেন, কাউকে বিব্রত ও হেয় প্রতিপন্ন করে লাভ নাই। আবার বিষয়গুলোকে চাপা দিয়েও লাভ নাই। অপ্রিয় মনে করে কিছু সত্যকে চাপা দিয়ে রাখলে এক সময়ে তাতে বিস্ফোরণ ঘটে। এই সব আলাপ-আলোচনা হলো আসলে এই ধরনের বিস্ফোরণ যাতে না ঘটে তার ব্যবস্থা। চাপা ক্ষোভ নিঃসরণ ও উপেক্ষিত হতাশার বাষ্প নিষ্কাশনের জন্য  এক ধরনের ভেন্টিলেশান। আমার নন-একাডেমিক প্রপজিশনগুলোর একটা হলো, ventilation prevents explosion।

ফেসবুকে প্রদত্ত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

ফুয়াদ সাদাত: আচ্ছা, একটি প্রশ্ন: অনার্স মাস্টার্স পাশ করলে কি চাকুরী করতেই হবে?

Mohammad Mozammel Hoque: শিক্ষাকে কাজে না লাগালে শিক্ষা কেন? বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা? এক একজনকে মাস্টার বানাতে দেশ ও জাতির cost কত, ভেবেছেন কি?

Nayeem Ahmad: এই কথাটা বলতে গেলেই নারী বিদ্বেষী ট্যাগ চলে আসবে!

Mohammad Mozammel Hoque: জামাই মরে গেলে বা স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে চাকরী করা লাগবে, সেজন্য সার্টিফিকটটা হাতে নিয়ে রাখা – এই যুক্তি নিতান্ত হ্যাংলামোপূর্ণ, অচল, হাস্যকর ও স্ববিরোধি-কপটতাপূর্ণ নয় কি?

প্রতিটা মানুষেরই শিক্ষার অধিকার আছে। এবং তা হলো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা। উচ্চ শিক্ষা সবার অধিকার নয়। এটি যোগ্যতা ও চাহিদার ব্যাপার।

কথাটা নিজের যোগ্যতা, অবস্থান ও অভিজ্ঞতার আলোকে পরিষ্কার করে বলা দায়িত্ব মনে করে পষ্ট করে বললাম। no confusion, please..!

Mahmudur Rahman: স্যার, আমি আমার বেশ কিছু ইঞ্জিনিয়ারিং বন্ধুকে ব্যাংকে, প্রশাসনে বা পুলিশে চাকরি করতে দেখেছি। এক অর্থে তাদের অনার্সে অর্জিত জ্ঞানের কোনই ব্যবহার দেখছি না। এরকম প্রচুর আছে। কে কি পড়ছে আর কে কি করছে তার অসংখ্য অমিল পাওয়া যাওয়ার কথা। কিন্তু এ জ্ঞান কাজে লাগছে না বলাটা মনে হয় না ঠিক হচ্ছে।

Mohammad Mozammel Hoque: ইঞ্জিনিয়ার যখন ব‍্যাংকে হিসাব কষে তখন তার প্রকৌশল বিদ‍্যা কী কাজে লাগে, আমার বুঝে আসছে না।

Mahmudur Rahman তার প্রকৌশল বিদ্যা কাজে লাগছে না। কিন্তু তার জ্ঞান কাজে লাগছে যেটা সে প্রকৌশল বিদ্যা থেকে অর্জন করেছে। আইনস্টাইনের একটা কোট হচ্ছে এ রকম–

“Pure logical thinking can not yield us any knowledge of the empirical world; all knowledge starts from experience and ends in it. propositions arrived at by purely logical means are completely empty as regards reality”

একজন যখন চার বছরের অনার্স কোর্সে (যদিও এক্সপিরিয়েন্সের জন্য এটা তেমন কিছু না) প্রকৌশলবিদ্যা জানছে সে অনেক রিয়েল লাইফ স্টাফ এক্সপিরিয়েন্স করছে যা দিয়ে তার জ্ঞান অর্জন হচ্ছে।

কোন একটা বিদ্যা থেকে যদি চার বছর বা তারও বেশি স্টাডি করার পরও কাজে লাগানোর মত কোন জ্ঞান একজন ব্যক্তি অর্জন না করে তবে ধরে নেয়া উচিত যে সেই ডিসিপ্লিন কোন এক্সপিরিয়েন্স শেখায় নাই, তাঁরা বেইজলেস থিউরিটিক্যাল স্টাফ নিয়েই ছিলো।

Umme Salma: একটি অসাধারণ লেখা, একটি দারুণ আলোচনা। আমার ভাবনার কারণ হয়েছে কয়েকটা কারণে– ১. নারীর অসহায়ত্বের আলোচনার পাশাপাশি উচ্চশিক্ষিত নারীদের ডমিনেট করার মানসিকতার ভয়াবহতা ২. কেন একজন সফল মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নিলেন তা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা। ৩. ইসলামী অনৈসলামী সব নারীদের গৃহকর্মীর সাথে আচরণ। কিছু ঘটনা আমিও জানি যেহেতু পরবর্তী প্রজন্ম শিক্ষক পত্নী আর নিজে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে ক্যাম্পাসে আমি বহুবছর ছিলাম।

অনেক প্রশ্ন জাগছে, কিভাবে জিজ্ঞেস করবো, বলবেন কি? এখানে কি লিখবো?

Mohammad Mozammel Hoque: মেসেইজের মাধ্যমে কনফার্ম হয়ে ফোনে অথবা মেসেঞ্জারে। সবচেয়ে ভালো হয়, লিখিতভাবে পাঠালে। আমার লেখার নিচে অথবা মেইলে। mozammel.philosophy@gmail.com, +8801928672405

Md. Azad Uddin: স্যার, আপনার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির লেখাগুলোর তুলনায় সামাজিক বিশ্লেষণমূলক লেখাগুলো অত্যন্ত যৌক্তিক! অসাধারণ সরলতা লেখার মাঝে কিন্তু ভাবে গুরুগম্ভীর

Mohammad Mozammel Hoque সামাজিক বিশ্লেষণমূলক লেখাগুলোর আবেদন বৃহত্তর। তাই হয়তো বেশি ভালো লাগে। আমাদের এই দেশের ঐতিহাসিক ও সমকালীন প্রেক্ষাপটে জামায়াত-শিবিরকে নির্মূল করে নয়, বরং পাশ কাটিয়ে দেশের মূলধারাকে নিয়ে বৃহত্তর অংগনে ইসলামকে কীভাবে একটা আইডেন্টিটি হিসাবে গ্রহণ করা যায়, তা নিয়ে কাজ করা আমার আগ্রহের বিষয়। আমি একে দায়িত্বও মনে করি। সে জন্য জামায়াত-শিবির প্রসংগ আমার লেখায় মাঝে মধ্যে চলে আসে। এটা অনিবার্য। বাস্তবতা। এর বাইরে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির লেখা এ মুহূর্তে প্রেফার করছি না। ধন্যবাদ।

পর্বটির ফেসবুক লিংক

*****

২.

ক্যাম্পাসে থাকেন। স্বামী-স্ত্রী ফুল প্রফেসর। শুনেছি, একদিন স্যার রান্না করেন, অন্যদিন ম্যাডাম। এই ধরনের এলিট পরিবারের সব চাকুরীজীবী উচ্চশিক্ষিত আধুনিক নারীদের দেখি, তারা কেবল সেবা পেতেই চান। তারমানে আমি এটি বলতে চাচ্ছি না, নারীরা কেবল সেবা দিয়েই যাবে। হ্যাঁ, মানুষ হিসাবে তাদেরও সেবা পাওয়ার অধিকার আছে। ফলকথা হলো, যারা সেবা দেন তারা সেবা পানও, অভিজ্ঞতায় দেখেছি। তাই বলে ‘স্বাভাবিক অবস্থায় নারীরা হচ্ছে সেবাধর্মী’ এই প্রাকৃতিক সত্যটাকে কীভাবে উপেক্ষা করা যাবে? কেউ আক্রান্ত হলে কাছে থাকা নারীরা সেবায় এগিয়ে আসে, পুরুষেরা মোকাবিলায়। এটিই প্রাকৃতিক। এটিই সত্য।

সুষম ভারসাম্যের কথা যদি বলেন, নারী ও পুরুষের এই পার্থক্যকে স্বীকার করতেই হবে। অধিকাংশ উচ্চশিক্ষিত আধুনিক নারীদের দেখি, মাঝেমধ্যে মন চাইলে তারা স্বামীর সেবা করেন। যেন এটা একটা শখের ব্যাপার। তাদের সব মনযোগ হলো নিজের ক্যারিয়ার আর বাচ্চাদের ব্যাপারে। জামাই-বউয়ে যদি সব সমান সমান ভাগ করে চলেন তাহলে বিয়েরই বা দরকার কী? উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে তো, প্রয়োজনে সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব রাষ্ট্র বহন করে। আমাদের মতো এত সামাজিক সুরক্ষারও প্রয়োজন পড়ে না। তাহলে এহেন পাশ্চাত্য লিভিং টুগেদার কিংবা বয়ফ্রেন্ড-গার্লফেন্ড ব্যবস্থার সমস্যা কী?

মানবজীবনের এইসব সূক্ষ্ম ও বৃহত্তর বিবেচনার বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করে যত্রতত্র নারীর ক্ষমতায়নের কথা যারা বলেন, তারা আদৌ সচেতন কিনা জানি না। এইসব ভারসাম্যহীন ক্ষমতায়ন হলো প্রকারান্তরে আমাদের ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক ব্যবস্থা উচ্ছেদের লক্ষ্যে পরিচালিত পাশ্চাত্য বস্তুবাদী-ভোগবাদী আগ্রাসন। কেউ কেউ এসব ফালতু ক্ষমতায়নের পক্ষে ইসলামকেও অযথা টেনে আনেন। সে প্রসংগে শেষের দিকে বলবো। এখন বাংলাদেশের অন্যতম অভিজাত আবাসিক এলাকা চবি দক্ষিণ ক্যাম্পাসে নিজের চোখে দেখা ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ নিয়ে কিছু বলি।

এক নামকরা প্রফেসর দম্পত্তি সম্পর্কে তাদের এক নিকটতম প্রতিবেশির কাছ হতে শুনেছি– স্যার বাসায় থাকা অবস্থাতেই স্যারের এক বন্ধুর সাথে ম্যাডাম রাত্রিযাপন করতেন। প্রথিতযশা সেই বিজ্ঞানী আত্মহত্যা না করলেও উনার ছেলেরাও শুনেছি বাবার মৃত্যুর জন্য নারী অধিকার নেত্রী অধ্যাপিকা মাকেই দায়ী করতো। আমাদের মতো যারা ইসলামপন্থী তাদের পরিবারের লোকেরা অবৈধ মেলামেশা করা হতে বিরত থাকেন। কিন্তু ইসলামিস্ট দম্পতির সংশ্লিষ্ট নারী সদস্যটি তার কনজুগাল পার্টনারকে একজন আদর্শ মুসলিম নারীর মতো সার্ভ করেছে, এমন কখনো দেখি নাই। এমন আদর্শ মুসলিম নারীর সন্ধান এই অভিজাত এলাকায় পাই নাই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চাকুরীজীবী স্ত্রীর স্বামীরা সহ্য করে কোনোমতে সংসার টিকিয়ে রাখেন। ‘স্বামীর অত্যাচারে দিশাহারা চাকুরীজীবী নিরীহ স্ত্রী’ – এটি হলো নাটক-সিনেমার টিপিক্যাল প্লট। বাস্তবতা, যা এই অর্ধশতাব্দীর জীবনে দেখলাম, তা ভিন্ন। কিছু ব্যতিক্রমী নারী যে নাই, তা নয়।

পাশ্চাত্যে নারী-পুরুষ দুজনই চাকুরী করে কীভাবে সুখে চলছেন তা এখানে বিবেচ্য নয়। কারণ পরিষ্কার। এটা পাশ্চাত্য নয়। পাশ্চাত্যের সামাজিক গঠন ভিন্ন। পরিবেশ ভিন্ন। মাইনরিটি হিসাবে সেখানকার মুসলিমদের আইডেন্টি ক্রাইসিস এখানে নাই। নানা কারণে তাদের মনমানসিকতাও ভিন্ন। এখানকার আধুনিকতাপন্থীরা পাশ্চাত্য হতে বল্গাহীন ক্ষমতায়নকে আমদানি করার ব্যাপারে যতটা উদগ্রীব, সেখানকার ব্যক্তি-অধিকার সংক্রান্ত ইতিবাচক মূল্যবোধগুলো নেয়া এবং পরিবারপ্রথাবিরোধী নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলোকে বর্জন করার ব্যাপারে ততটা আগ্রহী নন। ইসলাম, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের একটা কিম্ভূতকিমাকার ককটেল তারা জোর করে গেলানোর চেষ্টা করছেন।

প্রাচ্য সমাজে নারী নির্যাতন ও অবদমন আছে। এটি যেমন ঠিক, তেমনি পাশ্চাত্য সমাজে নারীকে পণ্য হিসাবে উপস্থাপন, নারীদের পক্ষ হতে ভোগকেই জীবনের সফলতা হিসাবে গ্রহণ করার ডমিন্যান্ট টেনডেন্সি আছে, সেটাও ঠিক। পাশ্চাত্যের উচ্ছৃংখলাকে বাদ দিয়ে পরিবার সংক্রান্ত পাশ্চাত্য মূল্যবোধকে গ্রহণ করা অসম্ভব। নারীর চাপিয়ে দেয়া ক্ষমতায়ন তাই এখানে স্বাস্থ্যের পরিবর্তে বিকারের উদ্ভব ঘটিয়েছে। পুরো বিষয়টাকে আমাদের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও কাঠামোর আলোকে পুনর্বিন্যাস করার আশু উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে এই বিকার বাড়তেই থাকবে।

এই কাজের জন্য ইসলামের মতো ধর্ম ও আদর্শকে যারা কাজে লাগানোর কথা বলেন, তাও ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। ইসলামী মূল্যবোধ চিরন্তন হলেও এক একটা সমাজ ও এলাকাভেদে এর প্র্যাকটিসের মধ্যে কিছু তাৎপর্যপূর্ণ রকমফের থাকতে হবে। না হয় এই আদর্শ টিকবে না। কেবল কল্পআদর্শ বা ইউটোপিয়া হয়েই থাকবে।

অনেকেই হয়তো জানেন, চবি ক্যাম্পাসে সম্প্রতি এক শিক্ষক দম্পতির বয়োজেষ্ঠ পুরুষ সদস্য জীবনের সব এস্টাবলিশমেন্টকে ছুড়ে ফেলে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। ঘটনার বাহ্যিক দিকটাকে তুলে ধরে এবং স্মৃতিচারণ করে আমি এ ব্যাপারে ফেসবুকে স্ট্যাটাসও দিয়েছি। উনাদের খুব কাছ হতে দেখেছি। স্যার সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। বাহ্যত এটিই আত্মহত্যার কারণ। কথা হলো, তিনি মানসিক রোগের এই শেষ পর্যায়ে কখন, কীভাবে এবং কেন পৌঁছলেন? উনার সাথে কারো জায়গা-জমি নিয়ে গণ্ডগোল ছিলো না। উনার কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ও এ নিয়ে কারো সাথে বিরোধও ছিলো না। উনি খুবই ধার্মিক ছিলেন। দুইয়ে দুইয়ে চার মিলানোর অংকের মতো এটি পরিষ্কার, পারিবারিক অশান্তির কারণেই উনার এহেন পরিণতি। কারণগুলো উনার স্ত্রী-পুত্র-কন্যার কাছে হয়তো তুচ্ছ। কিন্তু সেসব অপমান সহ্য করার ক্ষমতা উনার ছিল না, তা তিনি জীবন দিয়ে বলে গেছেন। উনি ডিপ্রেশনে ভুগছিলেন। উনার প্রপার ট্রিটমেন্ট হয় নাই। উনার শরীরের চিকিৎসা তারা করিয়েছেন ঠিকই। কিন্তু উনার মনের খবর নেয়ার ফুরসত কারো ছিলো না।

তিনি বাসায় একা ছিলেন। কেন? উনার এতবড় নিজস্ব বাড়িতে উনার কোনো আত্মীয়-পোষ্যকে রেখে তো পড়াতে পারতেন। স্যারের কোনো আত্মীয় স্বজনকে উনাদের বাসায় দীর্ঘদিন থাকতে দেখি নাই। উনার কি গরীব আত্মীয়-স্বজন নাই? এই যে, একা থাকা, নিজের মতো করে সুখে থাকা, সংসার করা– এটি কি স্যার চাইতেন? মনে হয় না। আমি কারো দাম্পত্যজীবনের ভেতরকার কথা বলতে পারবো না। তবে দেখেছি, যারা নিজেদের ফ্যামিলিতে নির্ভরশীল আত্মীয়স্বজনকে রেখেছেন, কষ্ট করে চলেছেন, তাদের ছেলেমেয়েরা উদারমনা হয়েছে, সামাজিক চরিত্রের হয়েছে। লেখাপড়া করে ভালো রেজাল্ট করে একটা ‘বড়’ চাকুরী ধরতে পারা আর কলিগদের সাথে ‘ভালো’ ব্যবহার করার মানে লোকটা সামাজিক, এমন নয়। ঘরে আত্মীয়-স্বজনদের আসা-যাওয়া থাকলে কেউ হতাশায় ভোগার সময়ও পাবেন না। নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করা, কিংবা ডিপ্রেশনে ভোগার সময় কোথায়? ঘরে এতগুলো মানুষ। তাদের জন্য যোগাড়যন্ত্র করতে হবে। প্রত্যেকের সবকিছু আলাদা আলাদা থাকতে হবে, এমন তো নয়। এভাবে যৌথপরিবার ব্যবস্থায় জীবনযাপনের মাধ্যমে পরস্পর কেয়ারিং ও শেয়ারিংয়ের যে মনমানসিকতা গড়ে উঠে, একা একা যারা থাকে তারা সেই সামাজিক গুণ অর্জন করার কথা ভাবতেও পারে না।

এবার আসুন অধ্যাপক সাহেবদের গৃহবধূ ম্যাডামদের কথা বলি।

শুনলে আশ্চর্য হয়ে যাবেন, স্যারদের তুলনায় এখানকার অধিকাংশ ম্যাডাম ঘরে ও বাইরে অধীনস্তদের ওপর অনেক বেশি এগ্রেসিভ ও রূঢ়। স্যারেরা যতটা নমনীয় ম্যাডামেরা ততটাই কঠোর। দায়িত্ব নিয়ে অন্তত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কথা বলতে পারবো। এখানে স্বামী কর্তৃক স্ত্রী নির্যাতন যা হয় বা হয়েছে তার দশগুণ বেশি হয় বা হয়েছে গৃহবধূ স্ত্রী কর্তৃক অধ্যাপক স্বামীর ওপর অত্যাচার ও নির্যাতনের ঘটনা। এসব বরং এখানে স্বাভাবিক। এর মধ্যে শারীরিক মারধরও আছে। বউ পিটায় বা পিটাইছে এমন ঘটনা যদি দুইটা পান, জামাই পিটায় বা পিটাইছে এমন ঘটনা পাবেন অন্তত বিশটা। শুনতে খুব খারাপ লাগছে। তাই না? আমারও এসব বলতে যে খুব ভালো লাগছে, তা নয়। কিন্তু কোনো কিছুর অভাব না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষকরা কেন হতাশায় ভোগেন, এমনকি আত্মহত্যাও করেন তার সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করতে গেলে এসব অপ্রীতিকর সত্যকে আপনার মোকাবিলা করতেই হবে। অন্তত এসব যে ঘটেছে ও ঘটছে, তাতো জানতে হবে এবং জানাতে হবে।

নারীরা কেন যেন ক্ষমতা সহ্য করতে পারে না। বউ-শাশুড়ির দ্বন্দ্ব নিয়ে বুঝতে গিয়ে দেখেছি, ছেলে যেখানে মায়ের পক্ষে সেখানে শাশুড়ি নির্যাতক। এর বিপরীতে যে পরিবারে ছেলে তার বউয়ের পক্ষে সেখানে সেদিনকার ‘পুঁচকে’ বউয়ের হাতে মা নির্যাতিত। কথায় বলে, দুর্বলের অত্যাচার সীমা ছাড়িয়ে যায়। অনেক সময়ে এরা ভুলে যায়, স্বামীরা শুধু শয্যাসঙ্গীই নয়, প্রয়োজনে পরিবারের লোকদেরকে নিয়ন্ত্রণ ও শাসন করাও স্বামীদের দায়িত্ব ও অধিকার। সমস্যা হলো, আধুনিক নারীরা শাসনমাত্রকেই নির্যাতন মনে করে। সদুপদেশকে ‘ওয়াজ’ ও নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়াকে ‘স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ’ এবং তিক্ত কিন্তু সত্য কথা বলাকে ‘অন্যদের সাথে ভালো ব্যবহার করে বউয়ের সাথে খারাপ ব্যবহার’ হিসাবে মনে করে। কী করবেন, বলেন?

ফেসবুক প্রদত্ত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Sourav Abdullah: পুরো লেখাটি গতকাল-ই পড়েছিলাম, অবস্থা খারাপ জানতাম, খারাপও লাগতো। তবে এতটা খারাপ ভাবিনি, সত্যি গা শিউরে ওঠার মত! 🙁

Nadim Hossain: স্যার, প্রথমত ধন্যবাদ। আমি আপনার পর পর দুইটি লেখাই পড়েছি।
সেই অনুসারে মনের কিছু অব্যক্ত কথা প্রকাশ করি। বেশ কিছুদিন থেকে আমিও ভাবছি এই সব বিষয় গুলো নিয়ে, আমাদের আসলে সমস্যা কোথায়? কেন আমরা দিন দিন আকৃতির মানুষ থেকে মান সম্পন্ন হুঁশ হারিয়ে ফেলছি? কেন আমরা একা? হতাশাগ্রস্খ কেন? আমাদের মধ্যে নিজেকে মেরে ফেলার প্রবণতা কেন দিন দিন বাড়ছে?

এই সব ভাবতে ভাবতে আমার কাছে যা ঠেকেছে, এবং প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে – আমাদের প্রাচীন পারিবারিক অবস্থা ছিল একান্নবর্তী পরিবার। যেখানে অনেক মানুষের বন্ধন। এই পারিবারিক অবস্থার জন্য এবং অনেক মানুষের অংশগ্রহণের কারণে এখানকার সন্তান পিতামাতার মধ্যে এবং সন্তানদের মধ্যে এক ধরনের উচ্চতর মানুষিকতা তৈরী হত। কারণ ছোট থেকেই তারা এমন একটি পরিবারে বেড়ে উঠছে, যেখানে বিভিন্ন ধরনের-রকমের মানুষের বাস। উদাহরণ দিয়ে যদি বলি, ধরি একটি একান্নবর্তী পরিবারের সদস্য সংখ্যা ২০ জন। এবং আমিও সেখানকার একজন সদস্য। আমার বেড়ে উঠার সাথে সাথে আমি আরও ১৯ জন মানুষকে বুঝতে পারি, চিনতে পারি, সবার চাহিদা ধরতে পারি। এবং এটাও শিখি যে কীভাবে এই ১৯ জন মানুষের সাথে নিজেকে টিকিয়ে রাখা যায়!

কিন্তু যখনই আমাদের আমাদের সেই একান্নবর্তী পরিবার বিলুপ্ত হয়ে একা টিকে থাকার বাসনা এবং চেষ্টা শুরু হয়েছে তখন থেকেই হুঁশের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। আমরা একা থাকার বাসনাকে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে এসেছি যে আসল ভালো–আসল মন্দ বুঝতে কষ্ট হয়।

স্যার, আপনি উল্লেখ করেছেন যে, পরিবারের মধ্যে আত্মীয়-স্বজন আসা যাওয়া করলে একা ভোগা হয় না। ডিপ্রেশনের সময় কোথায়! এটা সত্য।

কিন্তু প্রশ্ন হল একান্নবর্তী শব্দটি ভেঙ্গে এককে আসার মূল কারণ কী? এটার সাথে কি সামাজিক-অর্থনৈতিক সমস্যা জড়িত? সামাজিক, অর্থনৈতিক সমস্যা কি একান্নবর্তীর পূর্ব সমস্যা নাকি পরবর্তী সমস্যা?

Mohammad Mozammel Hoque: একান্নবর্তী সংসার বেটার হলেও অর্থনৈতিক কারণে এখন ততটা একসাথে থাকা ডিফিকাল্ট। এমনকি একান্নবর্তী পরিবার প্রথাও অর্থনৈতিক কারণে গড়ে উঠে। ইসলাম পরিবারকে শক্তিশালী করতে চায়। পরিবারই সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তি। তাই। সে জন্য ইসলামে উত্তরাধিকার বণ্টনের নীতিমালা যৌথ পরিবারের প্রতি ইসলামের প্রেফারেন্সের প্রমাণ। প্রয়োজনে একক পরিবারও অনুমোদিত। যারা এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলিতে বড় হ্য় নাই, তারা কখনো কল্পনাও করতে পারবে না, যৌথ পরিবারের সুবিধা ও মজাগুলো কতটা অনির্বচনীয়। আল্লাহর রহমতে আমাদের চট্টগ্রামের অনেক খারাপ বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি যেসব অনন্য সাধারণ ভালো বৈশিষ্ট্য আছে তার মধ্যে এর যৌথ পরিবার প্রথা অন্যতম। যৌথ পরিবার প্রথা এক ধরনের ট্রাইবাল সিস্টেম। ইসলাম গোত্রপ্রথাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। শুধু তাই নয়, একে শক্তিশালীও করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, আমি মানুষকে গোত্র ও জাতিগত পরিচয় সহকারে পাঠিয়েছি বা সৃষ্টি করেছি।

পর্বটির ফেসবুক লিংক

*****

৩.

কারো নাম ধরে কিছু বলে আমি মানহানির মামলার সম্মুখীন হতে চাই না। বড় বড় স্যারেরা নিয়মিত বউয়ের পিটুনি খান– এসব চোখে দেখা, সাক্ষাৎ কানে শোনা। অন্য এক ক্যাটাগরির কথা এবার বলি। বউয়ের পিটুনি খান না, অথচ বউকে ভয় করেন। তারা বেতনের টাকা বউয়ের হাতে তুলে দিয়ে সন্ধি করেন, জান বাঁচান। পরীক্ষার বিল ইত্যাদি অতিরিক্ত ইনকামের কথা বেমালুম চেপে গিয়ে আগুন নিভানো সিগারেটে ‘সুখটান দেয়ার’ মতো ‘মহাসুখে’ থাকার ভান করেন– এমন গোবেচারা স্বামীও এখানে আছে। এমনকি কোনো কোনো সহকর্মী, বিভাগে ছাত্র-শিক্ষকদের সাথে কীভাবে কী করবেন, কোনো বিষয়ে কী ভূমিকা রাখবেন– সে ব্যাপারেও তার স্ত্রী প্রভাব খাটান। আপনারা হয়তো ভাবেন, রাজনীতিক আর আমলাদের বউয়েরাই শুধু এমন অবৈধ প্রভাব খাটান। শোনেন, অধ্যাপকরাও অনেক সময়ে পেশাগত বিষয়ে বউয়ের আবদার রক্ষা করে চলেন।  না হলে ঘরে যে ‘শান্তি’ বজায় থাকে না!

মাঝখানে আবদুল কাইউম প্রামাণিক ভাইয়ের কথা বলে নেই। তিনি সম্ভবত ১৯৯৬-৯৭ সালে মারা গেছেন। উনার স্ত্রী কোথায় আছে জানি না। তার এটি পড়ার সম্ভাবনাও খুব কম। তাই নাম ধরেই বলছি। অন্তত মামলার ভয় নাই। অত্যন্ত সংক্ষেপে বলছি। কাইউম ভাই ১৯৯৩ সালের শুরুর দিকে ব্যবস্থাপনা বিভাগে জয়েন করেছেন। এক পর্যায়ে বিয়েশাদী করেন। আমরা একই বিল্ডিংয়ে থাকতাম। উনার হার্টের সমস্যা ধরা পড়ে। বাসা হতে ফ্যাকাল্টি যাওয়ার সময়ে তিনি স্ত্রীকে লিখে দিয়ে যেতেন, কয়টার সময়ে তিনি কোথায় থাকবেন। বউয়ের বাচ্চা হবে, তাই যাতে ফার্স্ট চান্সে উনাকে খুঁজে পাওয়া যায় সে জন্য এই ব্যবস্থা। বউয়ের বাচ্চা হবে, এ জন্য তিনি মরে মরেও ভর্তি পরীক্ষার কাজ করছেন। টাকা জমাচ্ছেন।

পাশের বাসার স্কুল শিক্ষিকা ভদ্রমহিলাও একদিন উনাকে বললেন, ‘ভাইজান, আপনার মনে হয় বড় ধরনের সমস্যা হইছে। আপনি ভালো করে ডাক্তার দেখান।’ উনি আমাকে ডেকে এ কথা বলছেন, আর উনার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। বললেন, মোজাম্মেল ভাই, আপনার ভাবীকে একটু বুঝান। ওতো আমাকে (চিকিৎসার জন্য) ছাড়তে চাচ্ছে না।’ বাসায় তখন উনার শাশুড়িও ছিলো। আমি উনার বউকে ডেকে বসিয়ে বললাম, ‘ভাবী, বাচ্চা হওয়ার কষ্টটা আল্লাহর রহমতে মেয়েরা কোনোভাবে সামলাতে পারেন। আমরা সবাই আছি। এ নিয়ে টেনশনে ভুগবেন না। আমি কাইউম ভাইকে নিয়ে ঢাকা যাবো। আমার ওয়াইফ এরা আছে। আপনার দেখাশোনা করবে।’

সেদিন কিংবা তারপর দিন কাইউম ভাই যখন ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্য খুব আস্তে আস্তে হেঁটে বাসা হতে বের হয়ে গাড়িতে উঠছিলেন, তখনো উনার ওয়াইফ উনাকে এগিয়ে দিতে বের হন নাই। শহরে হার্টের ডাক্তার উনাকে তাৎক্ষণিকভাবে হসপিটালাইজড করেন। সেদিন ভোররাতেই তিনি ইন্তেকাল করেন। এ ঘটনা মনে পড়লে এখনো আমার কলিজা মোচড় দিয়ে উঠে। এমন নয় যে, উনার স্ত্রীর সাথে কারো সম্পর্ক ছিলো। এমন নয় যে, তিনি স্বামীকে ভালোবাসতেন না। বরং নিজের আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থচিন্তা তাকে এ রকম অন্ধ করে ফেলেছিলো। অধিকাংশ আধুনিক নারীদেরই দেখেছি এমন সেলফ-সেন্টারড।

ক্যাম্পাসে যত টিচার মারা গেছে তাদের একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বউদের কাছ হতে, যতটুকু দেখেছি, উপযুক্ত টেককেয়ার পায় নাই। যে দিক থেকেই হোক না কেন, পরষ্পরের ওপর নির্ভরশীলতা না থাকলে তেমন ধরনের আস্থা ও আন্তরিকতা গড়ে উঠে না। কেউ বলতে পারে, এটি এলিট সমাজের একান্ত সমস্যা। এ কথার সাথে আমি একমত। হ্যাঁ, এখনো পর্যন্ত এটি এলিট সমাজেরই সমস্যা। তবে যে হারে ক্ষমতায়ন চলছে অচিরেই সবাই যার যার চিন্তার বাইরে নিয়ার এন্ড ডিয়ার ওয়ানসের জন্য খাটাখাঁটুনি করার পথে আর তেমন করে এগুবে না। নিকটাত্মীয় কেউ মৃত্যুবরণ করলে সেলফি দিবে, নিদেনপক্ষে তাৎক্ষণিক স্ট্যাটাস তো আছেই। এক পর্যায়ে পাশ্চাত্যের মতো শবযাত্রায় সামিল হয়ে এক গোছা ফুলের সাথে দু’ফোটা অশ্রু বিসর্জন দিয়ে কনডোলেন্স গ্রহণে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। এখন শুনতে অসম্ভব মনে হলেও সমাজের একটা অংশ এমন হয়ে যেতে খুব বেশিদিন আর বাকি নাই।

বুঝতেই পারছেন, প্রায় সারাজীবন দেশের অন্যতম প্রধান জ্ঞানচর্চাকেন্দ্রে বসবাস করেও কোনো কোনো দিক থেকে এখানকার জীবনধারাকে মানতে পারি নাই। দেখি, অধ্যাপক মহাশয় আর তার স্ত্রীকে যদি একই পাল্লায় মাপা হয় তাহলে যোগ্যতার বিচারে ওই মহিলা কোনো পয়েন্টই পাবেন না। অথবা খুব কম পয়েন্টই পাবেন। উনার বিশেষ কিংবা একমাত্র যোগ্যতা, তিনি অধ্যাপক মহাশয়ের স্ত্রী, তার সন্তানদের মা। শুধু এটুকু ‘যোগ্যতার’ বলে তিনি ওই লোককে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরান। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন। হেয় প্রতিপন্ন করেন। যেন তিনিই অধ্যাপক, আর অই লোক হলো তার অপদার্থ কর্মচারী। আমাকে ভালো জানেন এমন নারীরা মনক্ষুণ্ন হওয়ার আশংকা সত্ত্বেও এ কথা বলতেই হচ্ছে, অধ্যাপক সাহেবদেরকে যতটা আন্তরিক, নম্র ও ভদ্র দেখেছি, উনাদের স্ত্রীদেরকে ততটা ভালো পাই নাই।

অবশ্য নারীরা বাহিরের লোকদের কাছে নিজেকে ভালো দেখানোর ব্যাপারে যথেষ্ট পারঙ্গম। ভেতরে ভেতরে যদিও তাদের অনেকেই এক একজন লেডি হিটলার। কিছু ব্যতিক্রম বাদে। উচ্চশিক্ষিত অভিজাত সমাজেও দেখি, নারীরাই হলো নারীদের শত্রু। নারীদের ওপর অত্যাচারে কোনো না কোনো নারীই দেখবেন নেতৃত্ব দিচ্ছে। কোনো অফিসে নারী প্রশাসক অধিকতর নম্রভাবে শাসন করছেন– এমন তো শুনি নাই, দেখি নাই। অগত্যা পরিস্থিতিতে অবশ্য উনারা সারেন্ডার করেন, এটা দেখেছি।

নারীরা যদি নারী অধিকারের ব্যাপারে সত্যিই আন্তরিক হতেন তাহলে তাদের অধীনে থাকা নারী গৃহকর্মীদেরকে সেই অধিকার প্রথমেই দিতেন। ইসলামী-অনৈসলামী নির্বিশেষে ‘মাশাআল্লাহ’ ‘কাজের লোকদের’ ওপর অত্যাচার করার ব্যাপারে দেখি তলে তলে সবাই খালতো বোন। সেক্যুলারিজমের ‘মহান’ আদর্শ কিংবা সমাজতন্ত্রী ‘সাম্য’ কিংবা গণমুক্তির ‘খেলাফত’ তারা দেশে ও বিশ্বে কায়েম করবেন, যেমনটা আদর্শের ধ্বজাধারীরা বলে থাকেন, কিন্তু বাসাবাড়ির পারিবারিক পরিমণ্ডলে সেক্যুলারিজম, সাম্য অথবা দ্বীন-ইসলাম কায়েমে তাদের প্রবল অনীহা। কাজের লোকদের ওপর নির্যাতন করা যেন তাদের ‘অধিকার’। আসলে কাজের লোকদের ওপর নির্যাতনকারীরা ধর্ষকামী চরিত্রের মানুষ, হোক তারা পুরুষ কিংবা নারী। বাসায় কাজ করা বুয়া ও কাজের মেয়েদেরকে পরিবারের সদস্য হিসাবে সমানাধিকার দেয়া হইছে, এইটা কোনো পরিবারেই আজ পর্যন্ত দেখি নাই। অধীনস্ত গৃহকর্মী নারী-শিশু ও নারীদের নানা মাত্রায় নির্যাতনের ব্যাপারে নারী শিক্ষক বলুন, শিক্ষকদের স্ত্রী বলুন, দলমত নির্বিশেষে সব কর্ত্রীদেরকে মানবাধিকার হরণকারী নিপীড়ক হিসাবেই দেখেছি। ইনাদের মধ্যে ভালো হচ্ছে তারা যারা কম নির্যাতন করেন।

বিশ্বাস করেন, কোনো বাসাতেই দেখি নাই, কাজের লোকদেরকে স্যার-ম্যাডামরা নিজেদের সাথে খাওয়াচ্ছেন, একই রকমের পোশাক পরাচ্ছেন, বা একই মানের বিছানায় রেখেছেন। কখনো দেখি নাই কাজের লোকদের তারা পড়ালেখা, অন্ততপক্ষে অক্ষরজ্ঞান শিখাচ্ছেন। কারো কাছে ফ্রি জ্ঞান বিতরণ করার কথা তারা ভাবতেই পারেন না। আসল কথা হলো, যেসব জ্ঞান অর্জন করেছেন, সেগুলোকে সুবিধা হাতানোর হাতিয়ার হিসাবেই তারা ব্যবহার করেন। জ্ঞানবিজ্ঞান ও নীতি-আদর্শকে যদি তারা সত্যি সত্যিই আপন মনে করতেন, own করতেন, তাহলে অন্তত নিজেদের পারিবারিক পরিমণ্ডলে তারা নিজেদের জ্ঞান ও মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটাতেন, যে জ্ঞান ও মূল্যবোধ তারা ফেরি করে বেড়ান।

আমি এসব কথা বলি, সেজন্য আমি পরিচিত মহলে খানিকটা নিন্দিত। আমি নাকি এসব ‘তুচ্ছ বিষয়’ নিয়ে বাড়াবাড়ি করি। ভাবছি, কোথায় ন্যায়, নীতি ও মূল্যবোধ, কোথায় ইসলাম…? অধীনস্তদের ন্যায্য অধিকার দেয়ার ক্ষেত্রে তো কারো মধ্যে ইসলামের ন্যূনতম মানও আজ পর্যন্ত দেখলাম না। বলাবাহুল্য, অন্তত জীবনমানের দিক থেকে অধীনস্তদের সমানাধিকার দেয়াটা হলো, ইসলামের দৃষ্টিতে ন্যূনতম মান। ‘আফজল’ বা উত্তম হচ্ছে যথাসম্ভব বেশি দেয়া।

একবার ক্যাম্পাস ক্লাবে আমরা বেশ কয়েকজন তরুণ শিক্ষক বউদের প্রশংসা করছিলাম। সেখানে উপস্থিত প্রবীণ কয়েকজন শিক্ষক আমাদের উচ্ছ্বাসের আগুনে পানি ঢেলে দিয়ে বললেন, “শোনো, তোমাদের তো এখন যৌবনকাল। আমাদের মতো বৃদ্ধ বয়সেও যদি বউয়েরা তোমাদের অনুগত থাকে, কথা শোনে, তোমাদের সেবাযত্ম করে, তখন বুঝবা তারা সত্যিই তোমাদের ভালোবাসে।” আমার চোখে পরিষ্কার ভাসছে, সামনের সোফায় বসে কোন কোন স্যার আমাদেরকে এসব কথা বলছিলেন।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে পরিবারে নারীদের ক্ষমতা ক্রমান্বয়ে বাড়ে। পরিবারের উপর পুরুষের নিয়ন্ত্রণ ক্রমান্বয়ে কমে। তখন দেখা যায়, কথার বাইরে না যাওয়া সুবোধ বউটা তার নির্দোষ স্বামীকে আর ততটা পাত্তা দিচ্ছে না। অধিকাংশ পুরুষেরাই চোখের সামনে সংসারে এতদিনকার আচরিত নিয়মের চাকা উল্টা ঘুরতে দেখে কিছু একটা বলে অথবা চুপচাপ কেটে পড়ে। আল্লাহ-বিল্লাহ করে সময় কাটায়। পরিণত বয়সে নারীরা ক্ষমতার উত্তাপে যেন যৌবন ফিরে পায়। আর অসহায় পুরুষেরা পাওয়ারফুল বউদের অযৌক্তিক জেদের কাছে আত্মসমর্পণ করে মান-ইজ্জত বাঁচায়।

যুক্তি, নীতি ও মানবিক অনুভূতির তোয়াক্কা না করে সর্বক্ষেত্রে ‘সমতা প্রাপ্ত’ নারীরা সাধারণত কারো শাসন মানতে চান না, হোক তিনি পিতা বা স্বামী বা অন‍্য কোনো ন‍্যায় ও আইনসঙ্গত অভিভাবক। তাদের কাছে স্বামী মানেই শুধুই ভালোবাসার মানুষ যার মূল কর্তব্য হচ্ছে টেককেয়ার করা। স্ত্রীর সামনে কোনো অপ্রিয় সত্য কথা বলা কিংবা স্ত্রীকে কোনো মানবিক মর্যাদাপরিপন্থী তৎপরতা হতে বিরত রাখার চেষ্টা করা রীতিমত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। প্রায়শই তারা শাসনকে নির্যাতন হিসাবে মনে করে। স্বার্থপরতা বাধাগ্রস্ত হলে ‘বিপন্ন’ বোধ করে এক পর্যায়ে তারা ‘বাধ‍্য’ হয়ে নারী অধিকারের অমোঘ অস্ত্র প্রয়োগ করে।

ফেসবুকে প্রদত্ত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Kamrul Hasnat: স্যার, অসাধারণ!!! মাঝে মাঝে অবচেতন মনে ভাবি– কালের সাথে তাল মিলিয়ে একজন পুরুষের হিম্মত কিভাবে অস্তনিমিত হয় 🙁 । চেয়ে দেখে সহ্য করা ছাড়া তেমন কিছুই করার থাকে না (পরিপার্শ্বিকতা গ্রাস করে বসে)। সারাজীবন নিজ হাতে সবকিছু পরিচালনা করে শেষ বেলায় যাদের ভরণ-পোষণের পেছনে জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের আধিপত্য/রীতিনীতি চোখ বুঝে সহ্য করা কঠিন। এজন্য আমি আমাদের গ্রামের এক মুরব্বিকে দেখেছিলাম, যিনি ৯৭ বছর বয়সেও সিন্দুকের চাবির গুচ্ছ বালিশের নিচে রেখে ঘুমাইত 😛
কারণ, এতে করেই অন্য সদস্যরা তার নিকট ধরা ছিল :v

Rezaul Karim: উপর তলার মানুষের ভেতরের কথাগুলো এভাবে কাউকে প্রকাশ করতে দেখিনি। সত্য হলো বৌকে ভয় বা সমীহ করে না এমন পুরুষ বিরল। জেনে বুঝেও বৌয়ের অযৌক্তিক, অন্যায়, অনাত্নীয়সুলভ, এমনকি অসামাজিক কাজ শুধু ইজ্জতের দিকে চেয়ে অনেকেই করে থাকেন, কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারেন না।

Nazia Binte Farhad Urmi: Kichu exceptional case k tenen generalization kra hoise. Emn xmple dle sikkhito chakrijibir meyer xmple deya jabe j bonus er tk sosur barite dte hoy nahole ottyachar suru. Somossa holo apnara valo bisoye valo likhen kintu generalize kre felen. Eta acceptable na. Apni koyta family chinen se hiseb krle gune gune oi songkhok familyte educated job holder meyera kivabe tortured hcche xmple deya kono bisoy e na

Sabina Yesmin: Nazia kosto peo na. Uni onar nijer familyke chenen. shei experience theke likhechhen, no doubt.

Nazia Binte Farhad Urmi: Thank you mam 🙂

Mohammad Mozammel Hoque: আমি তো মাঠ জরিপ করে লেখি নাই। তেমন দাবীও করি নাই। দুইটা ঘটনা নামে ও কয়েকটা বেনামে উদারহরণ হিসাবে বলেছি। ব্যক্তিগতভাবে জানি অন্তত বিশটা। খেয়াল রাখবেন, এটি দুই যুগে চোখে দেখা অভিজ্ঞতার বয়ান। ছাত্রজীবন হতে ধরলে তিন যুগের। এবং একটা নির্দিষ্ট এলাকার। আপনি যদি এখানকার হোন, অর্থাৎ চবি ক্যাম্পাসের তাহলে আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে সেই বিশটা উদাহরণের কথা বলতে পারবো। সংগত কারণেই যা পাবলিক স্ট্যাটাসে লেখা যায় নাই। বললেও আপনি তা মিলিয়ে নিতে পারবেন না।

তো, ম্যাম, এরপরও আপনার কীভাবে মনে হলো, এটি আমার ব্যক্তিগত সমস্যা? আমার সাথে কি আপনার পরিচয় আছে? এটি তো একটা ‘মেয়েলি সমস্যা’, নারীদের একটা কম্যুনিটি প্রবলেম, প্রাসংগিক সমালোচনাকে ব্যক্তিগতভাবে নিয়ে কাউকে ব্যক্তি আক্রমণ করা। এটা ঠিক না।

আমি তো আপনাকে চিনতে পারছি না। অচেনা কারো সম্পর্কে এ রকম আন্দাজি কথা বলা কি ঠিক? কিছু মনে করবেন না। অপরিচিত কোনো কোনো সম্মানিতা ইতোমধ্যে আমার টাইমলাইন ও সাইট হতে ফোন নম্বর নিয়ে আমার সাথে ফোনে দ্বিমতও জানিয়েছেন। আপনার মধ্যে দেখছি ততটুকু ভদ্রতাও নাই।

Masuk Pathan: যদি ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে মুসলিম কমিউনিটির সমাধান চান তবে যত খারাপই লাগুক না কেন সমস্যা সনাক্ত করে সমাধানের জন্য চেষ্টা চালাতেই হবে যেনো আমাদের হুঁশ ফিরে আর তার লক্ষ্যেই বলতে হয়েছে। সেখান থেকে এই লেখাটি যথার্থ।

আর যদি মনে করেন কেবল সেসব ম্যাডামদের নেতিবাচক দিকই বলা হয়েছে তবে বোধকরি ভুল করছেন। কেননা মায়েদের, বোনেদের সমাজ পরিবর্তনকারী সাহসী, সুন্দর, ইসলামিক ভূমিকা নিয়েও আগে পোস্ট দেয়া হয়েছে। যদি তা না দেখে কেবল এ পোস্টের দিকে তাকিয়ে সৌজন্যহীন কথা বলেন তবে আপনারা ভুল করছেন।

আর যদি আপনারা মধ্যমপন্থি মুসলিম না হওয়ার বদলে তথাকথিত নারিবাদী লিবারেল সেক্যুলার/পশ্চিমা লিবারেল ইসলামিস্ট হন, তবে এ পোস্ট আপনাদের উদ্দ্যেশ্যেই লেখা।

দীর্ঘ সাত বছর আমি সে ক্যাম্পাসে ছিলাম, তাই কিছুটা জানি। দক্ষিণ ক্যাম্পাস মসজিদে মাগরিবের পরের কুরআনিক দারসে খতিব সাহেব পারিবারিক বিষয়াবলীর ইসলামী আলোচনায় যখন কাছের উদাহরণ টানতেন, যেসব কথা বলতেন উপস্থিত স্যার এবং ম্যাডামদের ব্যাপার নিয়ে এবং যেভাবে সাবধান করতে বলতেন; এ পোস্ট আমাকে সে কথাগুলো আবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

ক্লাসে এসে স্যারদের কেউ কেউ যখন বলতেন ছাত্রছাত্রীরাও কথা শোনে না, ঘরেও শান্তি নাই; তখন হাসতাম। কিন্তু আজ বুঝে গেলাম কী হতো সেখানে!

মনের সীমানা বড় না হলে মহানবীর (সা) জীবনাদর্শ বোঝা সম্ভব নয়, সমস্যার সমাধান তো বহু দূরে।

কষ্ট দেয়ার জন্য শেয়ার করছি না। আবার ভেবে মন্তব্য করবেন সেজন্য বলছি।

Ashique Rahman: মোজাম্মেল ভাই, যেসব অধ্যাপকরা বেতনের টাকা বৌকে দিয়ে সন্ধি করেন তাদের কথা তো বললেন। সত্যিই মজা পাইলাম। এবার সেই সকল অধ্যাপকদের কথা একটু বলুন যারা তাদের অধ্যাপক বৌদের বেতনের টাকায় হাতও দিতে দেয় না। আপনি তো লিখেন ভালো তাই আপনাকে লিখতে বললাম। কারো নাম ধরে কিছু বলে আমিও মানহানির মামলার সম্মুখীন হতে চাই না।

Mohammad Mozammel Hoque: বউয়ের টাকা যারা আত্মসাৎ করে তাদের এ কাজ তো এক ধরনের আত্মসাৎই বটে।

তবে এই ‘ফতোয়া’ দেয়ার আগে শিউর হতে হবে ‘আত্মসাৎ’ বলতে যা বুঝায় এটি সে ধরনের ব্যাপার কিনা।

আপনার টাকা যেমন আপনার, আমার টাকা আমার, বউয়ের টাকা ঠিক সেভাবে বউয়ের না। তাই বলে তা জামাইরও না। যেমন ছেলের টাকাপয়সা ও সম্পদ ছেলেরই। মা-বাবার নয়। তাই বলে আমার বনাম আপনার টাকাপয়সা ও সম্পদের যে মাসয়ালা তা সন্তান ও পিতামাতার মধ্যে হুবহু খাটবে না। ব্যাপারটা quasi বলতে ইংরেজীতে যা বলে, তা।

যদি তা না হয়, অর্থাৎ টাকাপয়সা ও সম্পদের ব্যাপারে সামাজিক লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য একক মালিকানা যদি পারিবারিক পরিমণ্ডলেও সমানে সমান প্রযোজ্য মনে করা হয়, তাহলে একটা গুরুতর প্রশ্ন উঠে আসে। তাহলো, ওই টাকাপয়সা ও সম্পদ বিনিয়োগ ও পরিচালনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির, যেমন স্ত্রীর বিশেষ করে মুভমেন্ট ও ইন্টারেকশানের যে অবাধ স্বাধীনতা থাকা দরকার তা ইসলামের পারিবারিক কাঠামোতে অনুমোদিত কিনা? অর্থাৎ স্ত্রীর মুভমেন্ট ও ইন্টারেকশানে স্বামীর অনুমতি থাকার বিষয়টাকে আপনি কীভাবে দেখছেন, তার ওপর নির্ভর করবে, স্ত্রী কর্তৃক সম্পদ পরিচালনার আইনগত সুযোগ-সুবিধা কতটুকু, বা বিষয়টাকে আপনি কীভাবে দেখছেন।

খেয়াল রাখতে হবে এখানে আইনের কথা বলা হচ্ছে, পারস্পরিক সম্মতির কথা ফরমাল আলোচনার বিষয় নয়।

ইসলাম সব বিষয়ে ক্লিয়ারকাট বলে দেয় নাই। বরং কিছু সীমানা ও বাধ্যবাধকতা দিয়ে কিছু কিছু বিষয়ে গাইড করে। সেগুলো তাই সব সময়ে আইন দিয়ে সমাধান করা যায় না। সে জন্য নৈতিকতা ও মূল্যবোধের দরকার হয়।

এ বিষয়ে আপনি জানতে না চাইলেও আমার ব্যক্তিগত অবস্থানটা আপনার কিংবা সাধারণ পাঠকদের জন্য পরিষ্কার করা জরুরী মনে করছি।

১৯৯৪ সালের শুরু হতে আমরা দুজনেই বেতন পাচ্ছি। শুরুতে আমরা ওয়ারড্রোবের একটা ড্রয়ারে একসাথে টাকা রাখতাম। যার যা প্রয়োজন নিয়ে খরচ করতাম। পরবর্তীতে আমার স্ত্রীকে এককভাবে টাকাপয়সা লেনদেনের দায়িত্ব দিই। দীর্ঘদিন সে একাই চালিয়েছে। তখন আপনারা ইউনিভার্সিটিতে আসেন নাই।

একপর্যায়ে এসব সামলানো ঝামেলাবোধ করে সে আমাকে এই দায়িত্ব পালনের জন্য বলে। এরপর দীর্ঘদিন আমিই সব টাকাপয়সা লেনদেন করতাম। আমার স্ত্রী চেক বইয়ে শুধু সাইন করতো আর গৃহবধূর মতো দৈনন্দিন খরচ আমার থেকে চেয়ে নিতো। যা আপনারা দেখে থাকবেন।

এরপর বিগত কয়েক বছর হতে ওর চেকবই ওর কাছে থাকে। ওর টাকা হতে ছোট মেয়েটার পড়ার খরচসহ সংসারের বাজার খরচ, ইউলিটিজ, গৃহকর্মীর বেতন ইত্যাদি মেটানো হয়। আর আমার বেতন দিয়ে সিএসসিএস পরিচালনা এবং বড় মেয়েটার পড়ালেখার খরচ মেটানো হয়। এ নিয়ে কখনো সালিশ-দরবার বা মতবিরোধ হয় নাই।

এর বাইরে আমাদের সাথে পারিবারিক ঘনিষ্ট সম্পর্ক সূত্রে কিছু জানলে আপনি নির্দ্বিধায় বলতে পারেন। কথাটা পরিষ্কার, আমি বউয়ের টাকা খাই না। যদিও আমার বউয়ের উপার্জনের কারণেই আমি ২৮৫০/= টাকা বেতন পাওয়ার সময়েও ৭০,০০০/= টাকা লোন করে (১৯৯৮ সালে) কম্পিউটার ক্রয় করা হতে শুরু করে এ পর্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তির সর্বশেষ গেজেটের ব্যবহারকারী হতে সক্ষম হয়েছি। এর বাইরে আমার কোনো খরচের খাত নাই। কখনো ছিলোও না। ভালো থাকুন।

Ashique Rahman: সময় নিয়ে দীর্ঘ লেখার জন্য ধন্যবাদ। তবে মন্তব্যটি সাধারণ (general), আপনাকে বা কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে নয়। “আপনার টাকা যেমন আপনার, আমার টাকা আমার, বউয়ের টাকা ঠিক সেভাবে বউয়ের না।” বেপারটা আরেকটু বাখ্যা করে বলবেন কি?

Mohammad Mozammel Hoque: এখানে একটা টুইস্ট আছে। আমার ধারণায় শরীয়ত প্রণেতা তথা আল্লাহ সুবহানু তায়ালা চান যে স্বামী-স্ত্রী সমঝোতা করে চলুক। একটা বৃহত্তর পরিধির মধ্যে নিজেরা নিজেরা মানিয়ে চলুক। নচেৎ সম্পদের মালিকানা দিয়ে সেটা মবিলাইজ করার জন্য প্রয়োজনীয় স্বাধীনতাকে delimit করে দিলেন কেন?

এর একটা উদারহণ পাবেন, পুত্রবধূ কর্তৃক শ্বশুর-শাশুড়ির দেখাশোনার ব্যাপারটাতে। প্রত্যেকে তার মা-বাবার দেখাশোনা করতে বাধ্য। তাই তো? তো, বলেন, স্বামীর ঘরে থাকা কন্যাটা কীভাবে তার মা-বাবার দেখাশোনা করবে? হ্যাঁ, সে যদি স্বামীর মা-বাবার দেখাশোনা করে তাহলে কাণ্ডজ্ঞান বলে স্বামীও তাকে নিজের মা-বাবার দেখাশোনা করাতে বাধা দিবে না। এবং নিজেও সে বউয়ের মা-বাবাকে টেককেয়ার করবে। টাকা-পয়সার ব্যাপারটাকেও আমার এ রকমের মনে হয়।

আর একটা উদাহরণ আপনার মতো সমঝদারকে বলা যায়। অন্যরা ভুল বুঝতে পারে। দাসীর মহরানার টাকা মালিক পাবে, নাকি দাসীই সেই মহরানার মালিক হবে তা নিয়ে ফকীহদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। দাস-দাসীর সম্পদের মালিকানা তাদের হলেও সেই সম্পদ বিনিয়োগ ও পরিচালনার ক্ষেত্রে সে তো স্বাধীন নয়। মালিকানা দিলে স্বাধীনতাও দিতে হয়। এবং তা হতে হবে প্রয়োজনীয় পূর্ণ স্বাধীনতা। এ ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা কোয়াজি। অর্থাৎ এক ধরনের সমঝোতার ব্যাপার।

Ashique Rahman: ধন্যবাদ। আমি যে বিষয়টির উপর আলোকপাত করতে চেয়েছিলাম তা হলো– উচ্চশিক্ষিত আধুনিক নারীদের ক্ষমতার বিকার মুদ্রার একপিঠ। অন্য পিঠে এই সংখ্যাটাও কম নয়, যারা উচ্চশিক্ষিত আধুনিক নারী কিন্তু সব ক্ষেত্রে পরাধীন এবং অবহেলার শিকার তাদেরই উচ্চশিক্ষিত স্বামীদের কাছে। উদাহরণস্বরুপ বিশ্ববিদ্দালয়ের অধ্যাপক স্ত্রীদের তাদের নিজ বেতনের উপরও স্বামীদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বেপারটি বলেছি।

Mohammad Mozammel Hoque: কারো উপার্জনের উপর তারই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। এটি সাধারণ নিয়ম। তবে পারিবারিক পরিমণ্ডলে তা কিছুটা সমঝোতাযোগ‍্য ব‍্যাপার।

Mohammad Aminul Islam: সিরিজ লেখাগুলি হচ্ছে ক্ষমতায়নের বিকার সম্পর্কিত, কাহিনী বা ব্যক্তিতে মনযোগী হয়ে মজা লুটা ভুল।

Mohammad Mozammel Hoque: সেটাই। যখন কেউ চাঁদের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে কিছু বলে, তখন কিছু বেকুব লোক এতবড় চাঁদের দিকে না তাকিয়ে ওই ব্যক্তির অঙ্গুলির দিকে তাকায়। এবং কেন সে আঙ্গুল তুলেছে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

Md. Azad Uddin: গরীবের শাসন ভয়ংকর! আর এ কারণে শাসন নির্যাতনের পর্যায়ে চলে যায়। আসলে স্যার আপনিই একদিন বলেছিলেন– গরীবের ঘরে বিরিয়ানি আসলে টানাটানি-গন্ডগোলের পর্যায়ে চলে যায়। তেমনি যার যতটুকু ক্ষমতা এরচেয়ে বেশি পাওয়া ইনসাফের পর্যায়ে থাকে না। আমরা পড়েছি, যার যা প্রাপ্য সে তাই পাওয়ার অধিকারকে সমানাধিকার বলে, কম বা বেশি নয়। এখানে আমরা একটু বেশিই…।

Tohur Ahmad Hilali: পুরোটাই পাঠ করলাম। ভালো লাগলো। সমাজের বহুবিধ সমস্যার মধ্যে একটি দৃষ্টিতে আনা হয়েছে। অনেক ধন্যবাদ।

পর্বটির ফেসবুক লিংক

*****

৪.

ব্যতিক্রম বাদে, জামাইয়ের সাথে ‘গণ্ডগোল’ আছে এমন বউয়েরা মায়ের ওপর বাচ্চাদের নির্ভরতার সুযোগ নিয়ে বাচ্চাদেরকে বাপের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলে। ফলে পিতার সাথে তাদের কমবেশি মানসিক দূরত্ব তৈরী হয়। কিছুটা বড় হয়ে তারা বুঝতে পারে, বাবাকে যতখানি খারাপ বলা হইছে আসলে তিনি ততটা খারাপ নন। অথবা, ওসব ভুল বুঝাবুঝির জন্য বাবা যতটা দোষী, মা-ও কম দায়ী নন। একপর্যায়ে ওভাররিয়েক্ট করার জন্য মাকে তারা অবচেতনে অত্যাচারী হিসাবে ভাবতে থাকে। স্বাভাবিকভাবে মায়ের বিরুদ্ধেও তারা কিছু করতে পারে না। বাপের পক্ষে বললে মায়ের পাগলামো বেড়ে যাবে, এই ভয়ও কাজ করে। ফাঁকতালে তারা নিজেদের একটা আলাদা জগত তৈরী করে নেয়। আলাদা রুম সব সুযোগ-সুবিধা তো আছেই।

এমনিতেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর সমাজে মূল্যবোধের প্রবল সংকট, তার সাথে যুক্ত হয় এ ধরনের সুস্থ পারিবারিক পরিবেশের সংকট। পরিণতিতে অভিজাত পরিবারের বাচ্চারা এক পর্যায়ে ভীষণ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। যেসব পরিবারে আত্মীয়-স্বজনরা সবসময়ে আসা-যাওয়া করে, থাকে, এবং ছেলেমেয়েরা সহজেই ঘনিষ্ট আত্মীয়-স্বজনদের কাছে যেতে পারে; সেখানে এই ধরনের সমস্যা ততটা জট পাকাতে পারে না। অথচ, উচ্চশিক্ষিত পরিবারের নারীরা মর্যাদাগত সামাজিকতা রক্ষায় যতটা ‘আন্তরিক’, বিশেষ করে গরীব আত্মীয়-স্বজনদের সাথে আসা-যাওয়া করা, মর্যাদা সহকারে তাদেরকে স্বীকৃতি দেয়া ও প্রয়োজনীয় দেখাশোনা করার ব্যাপারে তারা সাধারণত ততটাই অনাগ্রহী।

প্রত্যেক সন্তানই চায় তাদের বাবা-মা যেন পরষ্পরকে ভালোবাসে। পিতা-মাতার সুসম্পর্ক সন্তানের বেড়ে উঠার জন্য বিরাট সহায়ক। বাহিরে সুখী অথচ ভিতরে ভিতরে দিন-রাত কুরুক্ষেত্র, এমন পারিবারিক পরিবেশকে সন্তানেরা মেনে নিতে পারে না। এর কোনো সমাধানও তাদের হাতে থাকে না। অধূমপায়ী নিকটজনদের (passive smoker) মতো এসব টানাপড়েনের ফলে তারাই অথচ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। শারীরিক ক্ষতি দেখা যায়। তাই সহজে এর ট্রিটমেন্টও করা যায়। মানসিক ক্ষতি ও ত্রুটি সহজে নজরে পড়ে না। বড় ধরনের একটা কিছু হয়ে যাওয়ার পরে আমরা অবাক হয়ে যাই। হতবুদ্ধি হয়ে বলি, কীভাবে এমন হলো?

স্বামীর অভিযোগ, স্ত্রী তাকে পাত্তা দেয় না। আগের মতো তেমন আর দেখে না। স্ত্রীর অভিযোগ, স্বামী তার প্রতি ততটা মনোযোগী নন। তাই তিনি আসলেই স্বামীকে অনেক ভালোবাসেন। কিন্তু লোকটার ‘আচরণের’ কারণে তা দেখাতে পারছেন না। আসলে ভালোবাসাবাসি এসব ফাউ কথা। দাম্পত্যজীবন হলো দেয়া-নেয়ার ব্যাপার, হিসাব-নিকাশের ব্যাপার। ভালোবাসাটা বাড়তি কিছু। থাকলে ভালো। না থাকলেও সমস্যা নাই, যদি প্রত্যেকে নিজের অধিকারের চেয়ে দায়িত্বকে বেশি গুরুত্ব দেন। চাইলেই কেউ কাউকে ভালোবাসতে পারে না। আর সব মানবিক ঝোঁক-প্রবণতার (human passion) মতো ভালোবাসার চুক্তি করে ভালোবাসা হয় না। এটি ভেতর থেকে গড়ে উঠে। গর্ভধারণের মতো হয়ে যাওয়ার পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এক পর্যায়ে তা টের পায়। এমনকি সে নিজে চাইলেও তা অস্বীকার করতে পারে না। তাই, ভালোবাসা থাকলে তা দেখাতে না পারার যুক্তি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।

কথা হলো, love grows, it cannot be made। (হ্যাঁ, এইটাও আমার একটা প্রবচন। ভালো লাগলে মনে রাইখেন।) ভালোভাবে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য i+1 (আই প্লাস ওয়ান) ফর্মূলা মেনে চলতে হয়। এরমানে হলো, অপর পক্ষের কাছে যা আছে, আপনার কাছে তার অতিরিক্ত অন্তত একটা বিশেষ কিছু থাকতে হবে। তাহলেই কেবল প্রতিপক্ষ আপনাকে ভালোবাসবে, সমীহ করবে। দাম্পত্য সম্পর্কসহ সব ধরনের সম্পর্কের বেলাতেই এটি সমপরিমাণে সত্য।

পারিবারিক পরিবেশকে সুন্দর ও সুস্থ রাখার দায়িত্ব ঊভয়ের হলেও খেয়াল করলে দেখবেন এ ব্যাপারে নারীদের দায়িত্বই বেশি। স্বামী হিসাবে আমাদের এশীয় স্বামীরা না হয় স্বেচ্ছাচারী ও অসহিষ্ণু। আপনারা তো এটা জানেন, নবী মুহাম্মদের (সা) মতো মানুষকেও তাঁর স্ত্রীরা নানা প্রকারে কষ্ট দিয়েছেন। বউদের ‘ঘ্যানঘ্যানানির চোটে’ তিনি এক মাস তাদেরকে বর্জন করেছিলেন। আলাদা ছিলেন। এরপর কোরআনের আয়াত নাযিল করে আল্লাহ তায়ালা উম্মুল মুমিনীনদের রীতিমতো ধমকাইছেন। সে মোতাবেক রাসূল (সা) সব স্ত্রীদেরকে ডেকে জিজ্ঞাসা করেছেন, তোমরা কি সুখের সংসার করতে চাও, নাকি আমার সাথে কষ্ট করে থাকতে রাজি? বলাবাহুল্য, তাঁরা সবাই তওবা করে এ ধরনের ‘ফ্যামিলি পলিটিক্স’ হতে বিরত হয়েছিলেন। কি বিশ্বাস হচ্ছে না? হুজুরদের জিজ্ঞাসা করে দেখুন। অথবা, সূরা তাহরীম পড়ে দেখুন। মাত্র ১২ আয়াতের ছোট্ট সুরা। উদ্ধৃতি দিয়ে সম্মানিতাদেরকে বিব্রত করতে চাচ্ছি না।

সে যাই হোক, প্রত্যেক জাতি, গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের কিছু ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য থাকে, একইসাথে কিছু নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যও থাকে। each (human) community has its own kind of pros and cons, merits and demerits, good and evil, potentialities and limitations. এইটাকে যদি মানেন তাহলে আপনি নিশ্চয়ই বলবেন, প্রত্যেক নারীর উচিত নারীসুলভ খারাপ বৈশিষ্ট্যগুলো হতে নিজেকে পরহেজ করা এবং স্বীয় কম্যুনিটির ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলোর যথাসম্ভব উৎকর্ষতা সাধনের চেষ্টা করা। একই কথা পুরুষদের জন্যও সমভাবে সত্য। সমস্যা হলো, পুরুষরা যখন ‘পুরুষসুলভ’ খারাপ বিষয়গুলোকে নির্লজ্জভাবে ‘আমল’ করে তখন সেগুলোকে যতটা ধর্তব্য হিসাবে বিবেচনা করা হয় ও সেসব জুলুমকে যতটা ফোকাস করা হয়, ক্ষমতাসম্পন্ন নারীরা কিংবা ক্ষমতা পাইলে যে কোনো নারীই যখন একই ধরনের বদ-আমল ও জুলুমবাজিতে লিপ্ত হন তখন কিন্তু সেসব নীরব-অত্যাচারকে ততটা ধর্তব্য হিসাবে মনে করা হয় না। এ যেন এক অদ্ভূত স্থবির (stereotype) মনমানসিকতা।

নারীদেরকে সব সময়ে অবলা-অসহায় হিসাবে দেখা কিংবা সবক্ষেত্রে নির্যাতিতা হিসাবে দেখিয়ে তাদেরকে একতরফাভাবে ক্ষমতাসম্পন্ন করতে চাওয়া– দুটোই ভুল ও প্রান্তিকতা। এই উভয় ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিই পুরুষতান্ত্রিক। পুরুষতন্ত্র যদি নির্যাতনতন্ত্রের সমার্থক হয়, ক্ষমতাসম্পন্ন নারীরাও আসলে ভেতরে ভেতরে পুরুষবাদী (misogynist), যদিও তারা নারীবাদের পক্ষে উচ্চকণ্ঠ। আগেই বলেছি, এর অবশ্যই কিছু কিছু ব্যতিক্রম আমাদের সমাজে আছে লক্ষ করা যায়।

পাশ্চাত্য ধারায় নারীর ক্ষমতায়ন যে একতরফা একটা ব্যাপার, তা সুস্পষ্ট। তাই, এখানে প্রাচ্য সমাজের পারিবারিক ব্যবস্থা তথা সামাজিক ক্ষমতা-কাঠামোর ভিত্তিকে ভেংগে দিয়ে তদস্থলে পাশ্চাত্য ধরনে সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার দৃশ্যমান চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হবে না। বরং পাশ্চাত্য ধরনে বাছবিচারহীন ক্ষমতায়নের মাধ্যমে এখানকার ঐতিহ্যবাহী পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থায় একটা বিশৃংখলা (chaos) তৈরী হবে। যার পরিণতি কারো জন্যই ভালো নয়। প্রাচ্য সমাজ ব্যবস্থার ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলোকে স্বকীয় মূল্যবোধ ব্যবস্থা দিয়ে এর ভিতর থেকেই সংশোধন করতে হবে। মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার মতো অবিমৃষ্যকারিতা কেউ করতে চাইলে কী করা যায়…!

নাস্তিক-বামপন্থী-কম্যুনিস্টরা আমাদের ঐতিহ্যবাহী প্রাচ্য সমাজ ব্যবস্থা ভেংগে দেয়ার অপচেষ্টা করছে। সম্ভাব্য সব রকমে, সকল অস্ত্র ব্যবহার করে। তারা পুঁজিবাদের বিরোধিতা করে তদস্থলে সমাজতন্ত্রী সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার কথা বলে। আদতে দুটোই পশ্চিমা প্রোডাক্ট। তারা উত্তরাধুনিকতাবাদের কথা বলে। নারী স্বাধীনতার কথা বলে। এসবই পাশ্চাত্য মাল-সামান। ইসলাম ঠেকানোর জন্য তারা বহুজাতিক কোম্পানীর মিডিয়া আগ্রাসনকে কাজে লাগায়। মুখে মুখে পুঁজিবাদের বিরোধিতা করলেও তলে তলে তারা পুঁজিবাদী-ভোগবাদী সংস্কৃতির প্রসার ঘটানোর চেষ্টায় নিয়োজিত। আমার মনে হয় এরা আদতে নৈরাজ্যবাদী (anarchist)। তারা ‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা’ তোলার ফর্মূলা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। সেজন্য দেখবেন, চিহ্নিত কিছু লোকেরাই নারীমুক্তির নামে নারীর ভারসাম্যহীন ক্ষমতায়ন, সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তির নামে চিন্তাগত দাসত্ব ও ঐতিহ্যের নামে পৌত্তলিক সংস্কৃতির কথা বলছে। এদেরকে চিনতে আর বাকী নাই। হাওয়া এখন পাল্টাইছে। বাতাসের গতি উল্টা দিকে বওয়া শুরু হইছে। কনজিউমারিজমের যুগ শেষ হয়ে এলো বলে…।

তলে তলে ভোগবাদী হওয়ার কারণে উঠতি ইসলামপন্থীদের একটা বিরাট অংশ এইসব সুশীল বাটপারদের খপ্পরে পড়েছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, বাচ্চাদের ক্যারিয়ার গঠনের জন্য এরা যত খরচ করে, যা কিছু করে; বাচ্চাদের মূল্যবোধ, জীবনবোধ ও মানবতা শিখানোর উদ্দেশ্যে তার অংশমাত্র সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করে না। নৈতিকতা ও আদব শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপের পরিবর্তে বাচ্চাদের ‘ক্যারিয়ারিজমের উনুনে’ সিদ্ধ করা হচ্ছে। এই কাজে মায়েরাই খুব সিরিয়াস। শিক্ষিত নারীরাও দেখি অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত বা মূর্খের মতো বাচ্চাদের শূন্যগর্ভ বড় বড় জিপিএর মান বাগিয়ে দেয়ার তালে হন্যে হয়ে ছুটছেন। জীবনের সত্যিকারের সফলতা যেন সার্টিফিকেটের পাতায় আর মার্কশীটের ঘরে…!

বাসায় হুজুর রেখে বাচ্চাদের মাথায় স্কার্ফ বা টুপি পরিয়ে নামাজের জন্য উঠবস করালেই ‘ইসলাম পালনের’ সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। ইসলাম একটা নিয়মের আঁটি বা আইনের সমষ্টিমাত্র নয়। ইসলাম একটা জীবনদৃষ্টি। তো, গ্রাম আর যৌথ পরিবারে বড় হওয়া অধিকাংশ উঠতি ইসলামিস্টদের লালিত আদর্শ ও জীবনবোধ তাদের বাচ্চাদের মধ্যে বিকাশের কোনো অবকাশ কি তারা রেখেছেন? ভালোবাসার মতো জীবনবোধও জোর করে গড়ে তোলা যায় না। বরং উপযুক্ত পরিবেশে তা ধীরে ধীরে গড়ে উঠে। যাদের নিজেদের জীবনবোধই ততটা শক্তিশালী নয়, বাচ্চাদের মধ্যে জীবনবোধ গড়ে উঠতে দেয়ার ধৈর্য্য তাদের তো না থাকারই কথা। আফসোস…!

মানুষের মুক্তি ও মর্যাদা নিয়ে প্রাচ্যবাসীরা যা ভেবেছে ও ইতোমধ্যে করে দেখিয়েছে; ইতিহাস তার স্বাক্ষী। এর ধারেকাছে যেতে হলেও পাশ্চাত্যওয়ালাদের আরো এক হাজার বছর এ রকম ডমিনেন্ট অবস্থায় টিকে থাকতে হবে। তাদের বেলা ফুরিয়ে এসেছে। পরবর্তী বিশ্ব সভ্যতায় প্রাচ্যবাসীরাই নেতৃত্ব দিবে। ইসলাম হলো প্রাচ্য সভ্যতার সবচেয়ে বড় অর্জন। এই সম্পদ আমাদের আছে। এরপরও আমরা হতাশা ও হীনমন্যতায় ভুগছি। আশ্চর্য…!

আমি বাড়িয়ে বলছি না। খতিয়ে দেখুন, দেখবেন, ইসলামই দিয়েছে মানুষকে উপযুক্ত মর্যাদা। নারীদের দিয়েছে মানবিক পরিচয়। এ দেশীয় ইসলামপন্থীদের মধ্যে যারা পাশ্চাত্য প্রভাবিত নারীবাদের অনুসারী, তাদেরকে দেখি, নারী অধিকারের কথাগুলোকে যতটা জোরেশোরে বলে, পুরুষের বিশেষ করে স্বামী হিসাবে পুরুষের অধিকারগুলো নিয়ে তারা কেমন যেন রাখঢাক করে ও লুকোচুরির আশ্রয় নেন। স্বামীদের বিশেষ কিছু ইসলামসম্মত অধিকারের কথা বললে তারা যেন অজ্ঞান হয়ে পড়বেন, এমন ভাব দেখান। ইসলামের নারীবাদী ব্যাখ্যার মতো স্ববিরোধী জগাখিচুড়ি বিষয় আর কিছু হতে পারে না। তাই বলে ইসলামের পুরুষবাদী ব্যাখ্যা বলে সঠিক কোনো জিনিস যে আছে, এমনও নয়। নবী মুহাম্মদ (সা) পুরুষ ছিলেন, এই ‘যুক্তিতে’ ইসলামকে ‘পুরুষবাদী ইসলাম’ বলাটাকে যদি কেউ সংগত মনে না করেন, তাহলে পুরুষ ফকীহ-মুফাসসির-মুজতাহিদদের ব্যাখ্যা-ভাষ্যকে কেন কেউ কেউ ‘পুরুষতান্ত্রিক ইসলাম’ বলতে চান, তা আমার বুঝে আসে না।

ইসলামই যখন সম্পর্কের বৈধতার ভিত্তি, তখন স্বামী ও স্ত্রী উভয়েরই শরীয়াহসম্মত অধিকারগুলো নিয়ে choose and pick fallacy বা cherry picking fallacy’র মতো একদেশদর্শিতা কেন? স্ত্রীদের ওপর স্বামীদের সেসব ‘অস্বস্তিকর’ অধিকারগুলো কী কী, তা নিয়ে বলার ইচ্ছাও নাই। দরকারও নাই। এইসব আধুনিকতাপন্থীদেরকে তাবৎ নীতি-নৈতিকতা ও ঐতিহ্য-মূল্যবোধ ‘বেঁটে খাওয়াইয়া দিলেও’ তাদের বোধোদয় ঘটবে না। আমার ধারণায়, স্বামীর অধিকার, নির্ভরশীল নিকটাত্মীয়দের অধিকার, অধীনস্ত গৃহকর্মীদের অধিকার ইত্যাদি বিষয়ে তাদেরকে কোরআন-হাদীসের সংশ্লিষ্ট হুকুম-আহকামগুলোকে টেবলেট বানাইয়া খাওয়াই দেয়ার পরেও তারা এসবকে অন্তর থেকে মেনে নিবে না। আপনি যা-ই বলুন না কেন, ‘প্রমাণ’ হিসাবে তারা নির্দিষ্ট কিছু মুখস্ত বুলি আওড়াতে থাকবে। আপনার সব তথ্য, তত্ত্ব ও প্রমাণের পরেও তারা তাদের ‘ইসলাম প্রদত্ত’ স্বাধীনতা চর্চায় যে কোনো উপায়ে অবিচল থাকবে। ইসলামের নামে এহেন ভোগবাদিতার মজা কে ছাড়তে চায়, বলুন!

ফেসবুকে প্রদত্ত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Saeed Hussain: স্যার, পুরো লেখাটা আপনার সাইটে আগেই পড়ছি। কথাগুলো সবই বাস্তব, তবে এর ব্যতিক্রমের সংখ্যাটা নগন্য নয়। আরেকটা বিষয় হলো, শুধু নারীদের ব্যাপারে বলায় নারীমহল এটা মানতে পারছেন না। সাথে পুরুষদের সমান অধিকারভুক্ত করে আলোচনা করলে লেখাটা উভয় মহলে সমাদৃত হত মনে হয়। 😀

তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে পুরুষদের সুচিন্তিত পদক্ষেপ জরুরী মনে হয়। কারণ, ‘অধিকার ছাড়িয়া দিয়া অধিকার পাওয়ার আশা করাটা বিড়ম্বনা বৈকি’। 🙂

Mohammad Mozammel Hoque: ঢাকার এক অপরিচিত নারী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক তো ফোনে ৩৯ মিনিট আমার সাথে ঝগড়া করেছেন। যাহোক, আগামীকাল শেষ পর্ব দিবো, ইনশাআল্লাহ। তার শেষাংশ হতে উদ্ধৃত করছি–

“নারী অধিকার নিয়ে আমার সব লেখালেখির প্রতিপাদ্য বিষয় তিনটা: (১) প্রাচ্য নারীস্বার্থবিরোধী পুরুষতান্ত্রিক অচলায়তনের বিরোধিতা করা, (২) পাশ্চাত্য ভোগবাদী ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী নারীবাদের বিরোধিতা করা, এবং (৩) নারীর মানবিক মর্যাদাকে নিশ্চিত করে এমন নারী অধিকার সংগ্রামকে সমর্থন করা। এই লেখাটা দ্বিতীয় পয়েন্টের ওপরে ফোকাস করা।”

Saeed Hussain: স্যার, যখন পুরুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় পতিত হয়, যেমন– কয়েকটা উদাহরণে আলোচনা করেছেন, সেই অবস্থা থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে পুরুষের তখন কঠোর অবস্থানে যাওয়াটা জরুরী মনে হয় অনেকের। আমার মনে হয় এই বিষয়ে আপনার কিছু সুচিন্তিত মতামত জরুরী। কঠিন অবস্থার সহজ উপায়ে সমাধানে আসার পথ কেমন হবে এই বিষয়ে।

Ruha Tasmi: আগের স্টাটাসগুলো আমি পড়িনি।তবে আজকের স্টাটাস যদি স্যার আমাকে গুলিয়ে ট্যাবলেটও বানিয়ে খাইয়ে দেয় তবুও আমি বিশ্বাস করবো না নারী সম্পর্কে এই মন্তব্যগুলো। স্যার পুরুষ বলে একতরফা কৌশলে পুরুষদের বিষয়গুলো অল্প বলে পাশ কাটিয়ে গিয়েছেন।

Mohammad Mozammel Hoque: আসলে কারো বিরুদ্ধে কারো কঠোর অবস্থানে যাওয়ার দরকার পড়ে না, যদি আমরা প্রত্যেকে যার যার সীমানার মধ্যে থাকি। বোগাস ভালোবাসার অদম্য আবেগে নারী ও পুরুষ পরষ্পরকে যা সাধ্যাতীত তাও দেয়ার চেষ্টা করে। মনে করে আবেগ দিয়ে সব কিছু করা যায়। শেষ পর্যন্ত জীবন বা সমতুল্য কোনো ক্ষতির বিনিময়ে তারা বুঝতে পারে পরষ্পরের প্রতি তাদের যে টান ছিলো তা আসলে আকর্ষণ। শুদ্ধ ভালবাসা নাই বলে বলছি না। শুধু এটুকুই বলছি, বিশেষ করে সংসার জীবনে সমাজ ও ধর্ম নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে থাকাই সবার জন্য সর্বাধিক কল্যাণের কারণ। তাই, দ্বিরুক্তি করে বললে, কারো বিরুদ্ধে কারো কঠোর অবস্থান নয়, বরং যার যার সীমানার বাইরে না যাওয়ার বিষয়ে কঠোর থাকাই বাঞ্ছনীয়।

Ruha Tasmi: জ্বী স্যার, এই অংশটুকু এবার ঠিক আছে।

Mohammad Mozammel Hoque: Ruha Tasmi, পিটুনি খাওয়া কিংবা নানাভাবে নির্যাতিত হওয়া এসব পুরুষরা তাদের এই পরিণতির কারণ অনুসন্ধান করলে, তাদের দিক থেকে ঘটনাগুলো দেখলে, স্পষ্টত তারাই এর জন্য দায়ী। কারণ, তারা নীতি ও আদর্শের কথা বাইরে বলুক বা না বলুক, তারা আদর্শবাদী কোনো দল করুক বা না করুক, আদতে তারা চাইছে, “আমি আমার বউ-বাচ্চা নিয়ে সুখে থাকবো। বাদবাকী যা কিছু তা আমার জন্য তেমন কিছু না।” এই ধরনের চরম স্বার্থবাদী চিন্তা থেকে তারা নিজেদের স্ত্রীদেরকে ব্ল্যাংক চেক দিয়েছে। আমার জানা ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে এমনটাই দেখেছি।

তো, কাউকে ব্ল্যাংক চেক দিলে সে এ ধরনের বেকুবকে একপর্যায়ে দেউলিয়া বানিয়ে ছাড়বে, তা তো স্বাভাবিক। কেউ ফ্লোর ক্রস করে ফাঁকা জায়গায় কেন স্টেপ করতে গেছে, সেটাই প্রশ্ন। ফাঁকা জায়গা হতে সে নিচে পড়েছে কেন, সেটা কোনো প্রশ্ন নয়। সেটা অবধারিত। আশা করি, কী বলতে চেয়েছি বুঝতে পারছেন।

S M Riaz আমার পারিপার্শ্বিক সমাজে পারিবারিক অশান্তির কারণ হিসেবে যা দেখি:

১) মায়ের পরোক্ষ সহযোগিতায় বউয়ের স্বামী-সংসারে ডমিনেট করার প্রবণতা।

২) বিয়ে হওয়ার পরও একজন মেয়ের বাবার বাড়ির বিভিন্ন ব্যাপারে, বিশেষ করে ভাইয়ের সংসারের বিভিন্ন ব্যাপারে, হস্তক্ষেপ করা।

৩) শাশুড়ি ও ননদ কর্তৃক বউকে দমিয়ে রেখে স্বামীকে তাদের হাতে রাখার প্রবণতা।

সমাজে নিউক্লিয়াস ফ্যামিলিগুলো তৈরি হচ্ছে ১ম কারণেই।

শাশুড়িদের মনোভাবের ব্যাপারে আদিব হুজুর (মাওলানা আবু তাহের মিছবাহ) একটা উক্তি করেছেন:
“আমার মেয়ের স্বামীটা খুব ভাল, সবসময় আমার মেয়ের কথায় চলে; আর আমার ছেলেটা হয়েছে বেয়াড়া, বউয়ের কথায় উঠে বসে।” নিজ দায়িত্বে বুঝে নিবেন।

Dilara Khan Sadia: প্রথম সমস্যাটা তৈরি হয় যখন এরেঞ্জেড ম্যারেজের নামে একটা অচেনা ছেলের সাথে অচেনা অন্য পরিবেশে বেড়ে ওঠা একটি মেয়ের বিয়ে হয়। বেশিরভাগ বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলের যোগ্যতা আর ভালো চাকরীকেই প্রাধান্য দেয়া হয়, ছেলের পরিবার ক্যামন সেটা খুব একটা দেখা হয় না। এভাবে সারাজীবন শহরে বড় হওয়া একটা মেয়ের যখন গ্রামে বড় হওয়া একটা ছেলের সাথে বিয়ে হয়, তখন মেয়েটা না মানিয়ে নিতে পারে তার স্বামীর সংগে, আর না পারে শ্বশুরবাড়ির সংগে। আর স্বামীর সাপোর্ট তো পায়ই না ওই সময়ে। গ্রামের শ্বশুরবাড়ির মনমানসিকতা আর দেবর-ননদদের বেয়াদবি দেখে মেয়েটা তখন শুধু ভাবে কোথায় এসে পড়লাম। আরো অনেক কষ্টের কথা আছে, বলতে গেলে উপন্যাস হয়ে যাবে

Mohammad Mozammel Hoque: অভিজ্ঞতা যা আশেপাশে দেখা যাচ্ছে, তাতে তো প্রতীয়মান হয় যে পারিবারিক পছন্দের বিয়ের তুলনায় ব্যক্তিগত পছন্দের বিয়েতে দাম্পত্য কলহ বেশি হয়। তাছাড়া বিয়ের ব্যাপারে হাজার কথার এক কথা বলে যদি কিছু কেউ নির্ণয় করতে চায় তাহলে তা হবে সেই কথা যার ওপর ইসলাম সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। তা হলো কুফু বা সমতা। ঊনিশ-বিশের বেশি অবস্থানগত তারতম্য হলে কনফ্লিক্ট ইজ আ মাস্ট। এখন কুফুর আওতায় কী কী বিষয়, তা নিয়ে অন্য সময়ে বিস্তারিত কথা হতে পারে। এ বিষয়ে এই মুভিটা আমার প্রিয়। দেখতে পারেন: Arranged [2016]

S M Riaz: এরেঞ্জ ম্যারেজের নামে পাত্র বা পাত্রীর অমতে বিয়ে দেয়া ঠিক না। আবার যে সকল বিয়ে বিয়েপূর্ব সম্পর্কের মাধ্যমে হয়, সেসব সম্পর্কও বেশিভাগই গড়ে উঠে “ইনফ্যাচুয়েশান”-এর উপর। তখন পরিবার বা বংশ খুব কমই দেখা হয়।

আবার, গ্রামের মেয়ে যদি শহরের ছেলেকে বিয়ে করে শহরে গিয়ে শহুরে পরিবেশে সেটেল হতে পারে, তাহলে শহরের মেয়ে কেন গ্রামে পারবে না। আর ব্যাপারটা খুব কমই হয়।

Dilara Khan Sadia: বিয়ের ব্যাপারে কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারবে না যে কোনটা রিলায়াবল। আর বিয়েটা এই যেমন আমার বিয়ের পর জানতে পারলাম আমার শ্বশুর শাশুড়ি কেন আমাকে পছন্দ করে না, তার কারণ তারা ভেবে রেখেছিলো তাদের ইঞ্জিনিয়ার ছেলেকে তারা অনেক টাকা যৌতুক নিয়ে গ্রামের কোনো মেয়েকে বিয়ে করাবে। আর সেখানে তার ছেলে তাদের সম্পূর্ণ অমতে শহরের একটা মেয়েকে বিয়ে করে, যেখানে যৌতুকের প্রচলনই নেই। তারা খুব বেশি কিছু বলতে পারেনি। কারণ, তারা ছেলের উপর ডিপেন্ডেন্ট। তবে বিয়ের পর থেকে আমাকে কটু কথা বলতে কেউ ছাড়েনি। স্বামীকে বললে শুধু বলতো সহ্য করো।

Mohammad Mozammel Hoque: কুফু বা সমপর্যায়ের কোনো কোনো দিক থেকে আপনাদের মধ্যে মিল হলেও অন্তত পারিবারিক সংস্কৃতির দিক থেকে আপনাদের দুই পরিবারের মধ্যে মিল ছিলো না। এটি বুঝা যাচ্ছে। আমার মা তো কোনো প্রকার যৌতুক না দেয়ার কথা স্পষ্ট বলে উনার ৫ মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন।

Dilara Khan Sadia: বিয়ের আগেও আমার স্বামীকে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছিলো, আমরা যৌতুক দিয়ে মেয়ে বিয়ে দেই না। আমার স্বামী বলেছিলো, এসব কথা বলে যেন তাকে লজ্জা দেয়া না হয়। আমার স্বামী আল্লাহ রহমতে খুব ভালো মানুষ। উনার জন্যেই আর আল্লাহর অশেষ রহমতেই আমাদের সম্পর্কটা এখনো টিকে আছে। কিন্তু আমার শশুড়বাড়ির লোকেরা এখনো কান্নাকাটি করে যে তারা নাকি কুসন্তান জন্ম দিয়েছেন। আমার স্বামী যৌতুক ছাড়া বিয়ে করায় এলাকায় নাকি উনাদের লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে। অনেকে তো আরো এডভান্সড, আমাকে জিজ্ঞেস করে আমি প্রেগন্যান্ট হইছিলাম কিনা বিয়ের আগে। আবার আমার শাশুড়িও কম নন। উনি সবাইকে বলেন, আমি নাকি উনার ছেলেকে তাবিজ করেছি। বিয়ের পর থেকেই ওরা শুধু চেষ্টা করছিলো কিভাবে বিয়েটা ভাংগা যায়। আমি শুধু আল্লাহকে ডেকেছি।

Mohammad Mozammel Hoque: ইন্না লিল্লাহ…! আল্লাহ আপনাকে সবর, রহমত ও বরকত দিয়ে পূর্ণ করুন। আ-মীন।

Dilara Khan Sadia: ধন্যবাদ দুয়া করবেন।

পর্বটির ফেসবুক লিংক

*****

৫.

কেউ বলতেই পারেন, কিছু ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে’ আপনি ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বাড়িয়ে বলছেন। দেখুন, কিছু কিছু বিষয় এমন, যেগুলোর শতকরা এক ভাগ ইনসিডেন্টও অগ্রহণযোগ্য।  প্রতি এক হাজারে যদি এমন দুর্ঘটনা একটাও ঘটে, কোনো সুস্থ সামাজিক ব্যবস্থার জন্য তাও অগ্রহণযোগ্য। এমন সমস্যা প্রতি দশ হাজারে যদি একটাও ঘটে, ঘটনার গ্রেইভনেসের কারণে উক্ত ধরনের অপরাধের এমন অনুপাতও মারাত্মক হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। যেমন? কত যেমনকেই তো উদাহরণ হিসাবে বলা যায়। একটা বলি, চট্টগ্রামের গ্রামীণ সমাজে পরিণত বয়সে ঝগড়ার এক পর্যায়ে পুত্র কর্তৃক মাকে প্রহার করার কিছু কিছু ঘটনা শোনা যায়। অতীব গর্হিত হওয়া সত্ত্বেও এমন ঘটনা আমাদের ফটিকছড়িস্থ গ্রামের বাড়িতেই ঘটেছে। এটি যেহেতু একটা বিরল ঘটনা তাই ধর্তব্য নয়– এমন বলবেন কি?

এছাড়া কেউ এমনও বলতে পারেন, “এসব তো আপনি আপনার স্ত্রীর বিরুদ্ধেই বললেন। একটু জেনারালাইজ করে বলেছেন, এই আর কি”। কী বলবো? এমনটা যারা ভাববেন, তাদের নোংরা মনমানসিকতার কোনো দাওয়াই আমার কাছে নাই। অতএব, যে কোনো লেংথে যে কোনো মন্তব্য করার জন্য তারা ফ্রি। আমি তাদের নিয়ে ভাবি না। এ ধরনের “ঠাকুর ঘরে কে রে? আমি কলা খাই না” টাইপের আত্মপ্রতারাণামূলক সমালোচনার ধার আমি ধারি না। কিন্তু যারা সত্যিই এ ধরনের সামাজিক সমস্যা নিয়ে চিন্তিত তাদের সচেতনতার জন্য আমার এই লেখা। আমি যা লিখেছি তা আমার ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। আবার ব্যক্তিগতভাবে আমি এসব থেকে একেবারেই যে মুক্ত, তাও নয়। আমি এই তথাকথিত অভিজাত enlightened কমিউনিটিরই তো একজন। আজ আমি অনেকখানি মুক্ত থাকতে পারলেও, আগামীকাল বা পরশু যে আমিও এ ধরনের কোনো সমস্যায় পতিত হবো না, তার কোনো নিশ্চয়তা নাই। কথায় বলে, নগরে আগুন লাগলে দেবালয়ও রক্ষা পায় না।

আমরা জানি, কোনো সামাজিক সমস্যা রাতারাতি সৃষ্টি হয় না। আবার, কোনো সামাজিক সমস্যারই তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান নাই। সামাজিক সমস্যাগুলো মিটানোর যত পদ্ধতি হতে পারে তার একটা, সম্ভবত এক নম্বর উপায় হচ্ছে, সমস্যা যে আছে তা সর্বাগ্রে ও অকপটে স্বীকার করা। এরপর সেসব সমস্যা সংক্রান্ত আলোচনাকে ব্যক্তিগতভাবে না নিয়ে সামাজিক পরিমণ্ডলে সেগুলো নিয়ে খোলামনে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। এভাবে আলোচনা-পর্যালোচনা করতে করতে সেগুলো সমাধানেরও কোনো না কোনো পথ এক সময়ে বের হয়ে পড়বে। রোগজীবাণু কোনো পরিবাহী মাধ্যম যেমন শরীর ছাড়া বাঁচে না, সামাজিক বদঅভ্যাসগুলোও তেমনি কোনো না কোনো ধরনের সামাজিক স্বীকৃতি ছাড়া চালু থাকতে পারে না।

কোনো অপব্যবহার ও অপসংস্কৃতিকে নিন্দনীয় ও খারাপ হিসাবে প্রকাশ্যে চিহ্নিত না করলে তলে তলে এর আমলকারীরা উৎসাহিত হয়। খারাপকে খারাপ না বললে খারাপ ব্যাপারগুলো একপর্যায়ে ‘তেমন খারাপ নয়’ হওয়ার মর্যাদা বা এক ধরনের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যায়। যা কিছু অকল্যাণকর, মন্দ ও অনুচিত, তা যে সত্যিই অকল্যাণকর, মন্দ ও অনুচিত তা বারম্বার বলতে হয়, যাতে করে এক পর্যায়ে তা ‘ভালো’ হিসাবে অবস্থান সৃষ্টি করতে না পারে। এক কথায়, ব্যক্তির পক্ষ হতে এ ধরনের অপসংস্কৃতি ও মন্দকে প্রতিরোধ করার জন্য বলাবলি-লেখালেখি করা ছাড়া আপাতত তেমন কিছু করার নাই। কোদালকে তাই কোদালই বলতে হবে। গাঁ বাঁচিয়ে কৌশলের অংশ হিসাবে কোদালকে খন্তা বা নিড়ানী বললে তা দিয়ে কাজের কাজ তেমন কিছু হবে না।

সামাজিক সমস্যার ক্ষেত্রে সাধারণত ব্যক্তিমানুষ মনে করে, ‘এ তো ওদের সমস্যা। আমরা তো ভালো আছি।’ এ ধরনের আত্মস্বার্থবাদী চিন্তা দ্বারা ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নির্বিবাদী লোকেরাই দেখি সবার আগে বিপদে পড়ে। এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী আত্মকেন্দ্রিকতা হতে উত্তরণের উপায় কী?

এ নিয়ে আর একদিন আলাপ হবে। আজ এ পর্যন্ত। এই ‘বাজে লেখার’ বিরুদ্ধে কীবোর্ডে দায়দায়িত্বহীন বোতাম টেপাটিপি শুরুর আগে, আমাকে টিপিক্যাল পুরুষবাদী হিসাবে ট্যাগ দেয়ার আগে আপনার মনন ও জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে, যুক্তি ও ন্যায়ের আয়নাতে একবার নিজের চেহারাটা দেখুন। আত্মপর্যালোচনা করুন। বুঝার চেষ্টা করুন। সমাজটা একটা দেয়া-নেয়ার ব্যপার। এখানে হারজিতের কিছু নাই। যার যার সীমানার মধ্যে অবস্থান নিয়ে থাকলে দিনশেষে সবাই-ই আমরা জয়ী ও লাভবান হবো। প্রাকৃতিক সব সীমানাকে গুড়িয়ে দিয়ে নতুন করে পথ-ঘাট বের করে সামাজিক সম্পর্কের কৃত্রিম পাঁচিল তুলতে চাইলে, সবাইকে এক কাতারে আনতে চাইলে, হবসিয়ান সোসাইটির মতো দিনশেষে আমরা সবাই-ই ক্ষতিগ্রস্ত হবো। বাস্তবে ও বস্তুগতভাবে সবাই একতালে, সমানে সমান থাকে না। আর যার যা প্রাপ্য মর্যাদা তা নিয়ে তুষ্ট থাকার বাইরে স্বাধীনতার কোনো মানে হয় না।

এসব তত্ত্বকথার বাস্তব প্রতিফলন হিসাবে কী করা উচিত, তা এই আলোচনার বিষয়বস্তু নয়। তা বাস্তবের ব্যাপার। বাস্তবতার ব্যাপার। বাস্তবায়নের ব্যাপার। সেটি ভিন্ন প্রসংগ। কিছু কিছু বিষয়কে শুধু মনন ও চেতনার মধ্যে জাগরুক রাখতে হয়। মনে যা থাকে, কাজে তার প্রতিফলন কোনো না কোনোভাবে ঘটে। বাহ্যত মনে হয়, তত্ত্ব ঠিকই আছে, সমস্যা আমাদের কাজকর্মের; অথবা যা কিছু সমস্যা তার উৎস হলো আমাদের বিদ্যমান করাপ্ট সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা। না, আমার অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণে, সব বাহ্যিক সমস্যার শিকড় আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির বা প্যারাডাইমের গভীরে প্রোথিত। আমরা যখন কথা বলি তখন আমরা কী বলি, তারচেয়েও কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কথাটা বলছি তা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। টেকসই সমাধানের জন্য বিরাজমান সংকটের স্বরূপটা স্পষ্ট করে জানতে হয়। আদতে পাশ্চাত্য দৃষ্টিভঙ্গির যত নারীমুক্তি আন্দোলন ও তাদের অর্জিত যত সাফল্য তথা বিরাজমান নারীর ক্ষমতায়ন যতটা নারীমুক্তি ঘটিয়েছে, তারচেয়ে বেশি পরিমাণে নারীর মানবিক মর্যাদার অবনমন ঘটিয়েছে।

যে নারীটা রাস্তায় শ্রমিকের কাজ করে, সহশ্রমিকের তুলনায় তাকে কম দেয়াটা অবশ্যই অন্যায্য ও ঘোরতর অন্যায়। এ নিয়ে সন্দেহ নাই। কিন্তু একজন নারীকে কেন রাস্তায় শ্রমিকের কাজ করতে হচ্ছে তা নির্ণয় করা, তার ন্যায্য পারিশ্রমিকের নিশ্চয়তার চেয়েও গুরুতর বিষয়। যে সামাজিক অপব্যবস্থার কারণে শারীরিকভাবে দুর্বল নারীকে পুরুষের সাথে পাল্লা দিতে হচ্ছে, সেই গোড়ার কারণটাকে সামনে এনে সেটার টেকসই সমাধান বের করতে হবে। এসব বিষয়ে ‘মুক্ত আলোচনার’ নামে আমরা যে কর্পোরেট মিডিয়ার দাসত্ব করছি, তাও বুঝতে হবে। বাছবিচারহীনভাবে যত্রতত্র নারী-পুরুষের সমতা নয়, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীদেরকে পুরুষের অধীন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষের সাথে সমতা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষের ওপর প্রাধান্য দিয়ে তাদের ন্যায্য মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।

তাই, আসুন, পুরুষ বা নারী নয়, আমরা প্রত্যেকে সবকিছুর উর্ধ্বে সত্যিকারের মানুষ হওয়ার চেষ্টা করি। তাহলেই শুধু, পুরুষ বা নারী হিসাবে আমরা যার যার অবস্থান খুঁজে পাবো। নারীদেরকে পুরুষদের মতো ক্ষমতা দিলেই নারীমুক্তি ঘটে না। বরং মানুষ হিসাব আত্মমর্যাদাবোধ বিকাশের মাধ্যমেই নারী ও পুরুষ হিসাবে আমাদের মানবিক মুক্তি অর্জন সম্ভবপর হয়ে উঠে।

নারী অধিকার নিয়ে আমার সব লেখালেখির প্রতিপাদ্য বিষয় তিনটা: (১) প্রাচ্য নারীস্বার্থবিরোধী পুরুষতান্ত্রিক অচলায়তনের বিরোধিতা করা, (২) পাশ্চাত্য ভোগবাদী ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী নারীবাদের বিরোধিতা করা, এবং (৩) নারীর মানবিক মর্যাদাকে নিশ্চিত করে এমন নারী অধিকার সংগ্রামকে সমর্থন করা। এই লেখাটা দ্বিতীয় পয়েন্টের ওপরে ফোকাস করা। সমর্থন বিরোধিতা যা-ই করুন, আমি কী বলতে চেয়েছি তা আগে বুঝার চেষ্টা করবেন, অনুরোধ করছি। এরপর দ্বিমতের বিষয়গুলো নিয়ে আপনি আপনার মতো করে বলুন। ভালো থাকুন।

পর্বটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

উচ্চশিক্ষিত আধুনিক নারীদের ক্ষমতার বিকার” শীর্ষক পোস্টে ৬টি মন্তব্য

  1. খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়লাম।
    কিছু প্রশ্ন আছে,আপাতত জমা রাখলাম।
    ব্যাতিক্রমি চিন্তা।সবার পড়া উচিৎ।এটাও নিশ্চিত এটার অনেক ভুল ব্যাখ্যা হবে। একটা ভয়ো পাচ্ছি, যারা নির্যাতন কারী পুরুষ তাঁরা আরো নির্যাতনে উৎসাহিত হতে পারেন। লেখাটি যোক্তিক হলেও ভুল বোঝাটাই বিপদের।

    1. ভালো করে পড়ার জন্য ধন্যবাদ। হ্যাঁ, এর অপব্যাখ্যা করার আশংকা আছে। সেজন্য নারী অধিকারের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সবগুলো দিককে পাশাপাশি ফোকাস করা উচিত। অবশ্য প্রত্যেকটা লেখায় সবগুলো বিষয়কে আনতে গেলে তা সারসংক্ষেপ জাতীয় কিছু হতে পারে, বিশ্লেষণমূলক হবে না। ব্যক্তিগতভাবে প্রতিটা সুযোগেই প্রয়োজনীয় কথাটা বলে দিতে হবে। কেবল একপক্ষে বলতে থাকলে হবে না। নারী অধিকারের ওপর আরো একটা লেখা, সমন্বয়ধর্মী, কম-অর্ধেক লিখেছি। আশা করি শীঘ্রই আপ করতে পারবো। দোয়া করবেন। ভালো থাকেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *