বেশি ভাইবোন থাকার কী সুবিধা…

selfie-with-seju

এই সেলফি যিনি তুলেছেন তিনি মাহবুব-কুসুম দম্পতির ৬নং সন্তান, বয়স ৫০। পারিবারিক পরিমণ্ডলে ছোট-বড় সবাই তাকে ‘সেজু’ নামেই ডাকে। পাশের জন ‘খইলদা ঝাড়া’। চট্টগ্রামের ভাষায় ‘খইলদা’ মানে থইলা, যাকে তথাকথিত শুদ্ধ ভাষায় থলে বা ব্যাগ বলে। তো, ‘খইলদা ঝাড়া’ মানে থলে ঝেড়ে-ঝুড়ে অবশিষ্ট হিসাবে যা পাওয়া যায় তা। পরিবারের শেষ সন্তানকে লোকাল কালচারে আদর করে ‘খইলদা ঝাড়া’ও বলে। যাহোক, সিরিয়ালে ১০ নম্বরে থাকা মোহাম্মদ এরশাদুল হক এশুর বয়স ৪০।

দেখুন, বেশি ভাই-বোন থাকার কী সুবিধা…। চুল-দাঁড়ি পেকে গেলেও সবার ছোট হওয়ার কারণে এশু সবার কাছে অলওয়েজ ‘গরবা’ স্ট্যাটাসের। মানে অতিথির মতো। তার কোনো পারিবারিক দায়িত্বপালন করতে হয় না। কারো জন্য কিছু না করলেও কেউ মাইন্ড করে না। সবার কাছেই সে এখনো ক-তো ছোট …।

বড় পরিবারে ছোটদের কতো মজা। তারপরও তারা আফসোস করে, সবাই তাদেরকে শাসন করে, তাই। কারো ওপর তারা ‘দঅদ্দারি’, মানে খবরদারি বা বড়গিরি ফলাতে পারে না। সিরিয়ালে আমি মাঝামাঝি অবস্থানে থাকলেও বড়দের কাছ হতে এটা ওটা গিফট পেতে পেতে এখনো আমার খালি পাইতে ইচ্ছা করে…। কাউকে দেয়ার বিষয়টা খুব একটা মনে থাকে না। চট্টগ্রামের যৌথ পরিবার ব্যবস্থায় মাত্র এক বছরের বড় জনও অ-নে-ক বড় ! বিপরীতে, মাত্র এক বছরের ছোটও ক-ত-তো ছোট !

ভাই-বোনদের ছেলে-মেয়েরা যেন নিজেরই সন্তান। আমাদের ছেলে-মেয়েরা বছরের কয়েকবার ফ্যামিলি গেট টুগেদারে এমনভাবে মেলামেশা করে, যেন আপন ভাই-বোন। আমার বোনেরা বাচ্চাদেরকে এমনভাবে বুকের দুধ খাওয়াইছে, ভবিষ্যতেও কারো সাথে কারো বিবাহ-শাদির কোনো স্কোপ নাই। কী মজা…! একা একা যারা দু’একটা বাচ্চা নিয়ে ‘সুখের সংসার’ করে তারা এই আধুনিক ফরমেটের যৌথ পরিবার ব্যবস্থার মজাটা কোনো দিনও বুঝতে পারবে না।

আমি জন্মনিয়ন্ত্রণের বিরোধী। কারণটা পরিষ্কার। আমার পিতা-মাতা জন্মনিয়ন্ত্রণ নীতি মেনে চললে আমি দুনিয়াতেই আসতাম না। কুলসুমা বেগম কুসুমের টিন-এজ সন্তান হলো বারডেম খ্যাত ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজে ফিজিওলজির বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ড. ফাতেমা খানম। আফসোস, আধুনিক নারীরা সন্তান ধারণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়ে অবিবাহিত থাকে। বৈবাহিক জীবনে সন্তান ধারণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়ে চেষ্টা করে আরো কিছু দিন নিজেরা নিজেরা থাকতে। পরে দু’ একটি সন্তানের মা হতে হতেই তাদের সক্ষমতায় ভাটার টান শুরু হয়ে যায়।

এক সন্তান হলে, তিনি হলেন সম্রাট। বাবা-মা যেন অধীনস্ত সামন্ত-রাজা। দুই সন্তান হলে তারা তারা রাজা রাজা। মা-বাবারা প্রজা। তিন সন্তান হলে তারা তারা রাজা-উজির। বাবা-মা প্রজা। চার সন্তান বা ততোধিক হলে বাবা-মা রাজা রানী। বাচ্চারা সব প্রজা।

সন্তানাদি বেশি হওয়া মানে তাদের মধ্যে পলিটিক্স করে, তাদেরকে শাসন করা, নিয়ন্ত্রণে রাখা। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, তোমরা অধিক সন্তান জন্মদানে সক্ষম এমন নারীকে বিয়ে করার ক্ষেত্রে অগ্রাধকার দাও। এসব ইনকনভেনিয়েন্ট হাদীস আমাদের ইসলামী নারীদের একচোখা নারীবাদী দৃষ্টিতে গুরুত্ব পায় না। এই দেখেন, আবার নারীবাদ নিয়ে কথা….! নাহ, নারীবাদ নিয়ে আজ কিছু লিখছি না।

অবশ্য, আমার মা নারীবাদী ছিলেন। যদিও তিনি নারীবাদের নামে মতলবিদের কট্টর বিরোধী ছিলেন। তিনি বলতেন, “মার্কেটে মার্কেটে ঘুরার জন্য পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশান পড়ার কী দরকার?” এটি উনার একজেক্ট কোটেশান। তিনি বাবুনগর গ্রামে বসে বেগম পত্রিকায় লেখতেন। উনার সাথে কথা বলে কেউ বুঝতো না, উনার প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা বেশি নয়।

পুরো বাড়ির বড় ছেলের বউ হিসাবে সব আত্মীয়-স্বজন সামাল দিয়েছেন। সেই সময়কার গ্রামীণ পরিবেশে থেকেও ছেলে-মেয়েদের উচ্চ শিক্ষা নিশ্চিত করেছেন। যথেষ্ট সমাজসেবাও করেছেন। ভাবলে অবাক লাগে….! তাঁর সব ছেলে মেয়েরাই চাকুরী করে। পাশ করার পরে এক বছরও কেউ বসে থাকে নি। সবাই আলহামদুলিল্লাহ সুখে আছে। ভালো আছে।

পাকিস্তান নৌবাহিনীর প্রাক্তন সৈনিক আমার বাবা তার অদম্য সাহসী স্ত্রীকে নিয়ে যে সংগ্রামমুখর জীবন যাপন করেছেন তার সাথে তুলনা করলে আমার পারিবারিক জীবনকে, সব সামাজিক প্রতিষ্ঠা সত্বেও ব্যর্থই বলতে হবে। এই শীতকালে আমরা গ্রামের বিলে না-ড়া (ধানের গোড়া) কেটেছি…। অথচ, আমার মেয়েরা ভাত খেয়ে কষ্ট করে হাতটা ধোয়…! ঘরের কাজ করার কথা তারা ভাবতেও পারে না…। অথচ, আমার বোনেরা….।

এশু আম্মার জরায়ুতে ছিলো অনধিক ছয় মাস। এরপরে আম্মাসহ হসপিটালে ছিলো নয় মাস। ২০০৯ সালে আম্মার ইন্তেকালের কয়েক বছর আগে উনার জরায়ু কেটে ফেলে দেয়া হয়। ওই ঘটনা প্রসংগে বড় আপা বলছিলেন, “দেখ, জরায়ু হলো এতটুকুন একটা ছোট থলে। অপারেশানের পরে আম্মার জরায়ুটা হাতে নিয়ে আমি ভাবলাম, এর ভিতরেই আমরা দশ ভাই-বোন জন্ম নিয়েছি, বেড়ে উঠেছি ….!”

শ্রদ্ধা করি তাদের যারা সংগ্রামমুখর জীবন চলাকে পছন্দ করেছেন। স্বার্থপরের মতো শুধু আমার আমার (অধিকার….) করে জীবন কাটান নাই। কষ্ট করে তারা এতগুলো ছেলে-মেয়ে হয়াইছেন বলে আজ আমরা এতো মজা করতে পারতেছি…! আমাদের ফ্যামিলি গেট-টুগেদারে নিজেরা নিজেরা গপ মারা হলো প্রধান আকর্ষণ, আসল মজা।

আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের কোনো ভাই-বোন এ পর্যন্ত একা একা কোনো ঈদ-কোরবানি করে নাই। ফ্যামিলির নানা ঝামেলা-সংকটে বড়দের অবদানও বেশি, নিয়ন্ত্রণও বেশি। এশুসহ চার ভাইবোন ঢাকায় সেটেলড। অনেকদিন পর এশু আমাদের ক্যাম্পাসের বাসায় এসেছে। গতকাল দিনটা তাই ভালোই কেটেছে। অনেক ছবি তুলছি। আরো কতো মজা করছি। ওর বউ আজ রান্না করে খাওয়াবে। আপনাদের ভার্চুয়াল দাওয়াত।

ফেসবুকে প্রথম  প্রকাশিত

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

বেশি ভাইবোন থাকার কী সুবিধা…” শীর্ষক পোস্টে ৩টি মন্তব্য

  1. আসসালাম….. বারাকাতুহ
    আমরা এখন বেঁচে আছি আট ভাই-বোন! আমি সবার বড়!
    আপনি যথার্থই বলেছেন- ফ্যামিলির নানা ঝামেলা-সংকটে বড়দের অবদানও বেশি, নিয়ন্ত্রণও বেশি।

    “শ্রদ্ধা করি তাদের যারা সংগ্রামমুখর জীবন চলাকে পছন্দ করেছেন। স্বার্থপরের মতো শুধু আমার আমার (অধিকার….) করে জীবন কাটান নাই। কষ্ট করে তারা এতগুলো ছেলে-মেয়ে হয়াইছেন বলে আজ আমরা এতো মজা করতে পারতেছি…! আমাদের ফ্যামিলি গেট-টুগেদারে নিজেরা নিজেরা গপ মারা হলো প্রধান আকর্ষণ, আসল মজা।”

    আল্লাহুম্মাগইর লি আবায়িনা ওয়া লি উম্মাহাতিনা …
    রব্বিরহামহুমা কামা রব্বাইয়ানী সগীরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *