অতঃপর কী করণীয়?

যারা চান ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হোক, জামায়াতে ইসলামীর সাথে বা এর কোনো অঙ্গসংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত আছেন, ব্লগের কিছু পোস্টে দেখা যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর অনেক সমস্যা আছে বলা হচ্ছে; জামায়াতের নিয়মতান্ত্রিক সংশোধনের আশা সুদূর পরাহত – কেউ এমন মনে করলে তাদের জন্য অতঃপর কী করণীয়?

সন্ধ্যায় জামায়াত সংক্রান্ত একটা পোস্ট দেয়ার পরে একজন অপরিচিত ভাই ফোন করে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘আপনার লেখাগুলো তো জামায়াত বিরোধী। কেউ আপনার বক্তব্যের সাথে একমত হলে, আপনার মতে, তার কী করা উচিত?’’ আমি বললাম, তিনি আমার মতো করবেন। আমি এখান জামায়াতের অ্যাক্টিভ কর্মী। নিষ্ক্রিয়তা আমার জীবনে অনুপস্থিত। আর আমার লেখায় জামায়াত সংগঠনের সমালোচনা থাকায় এটা মনে করা ঠিক হবে না যে আমি জামায়াত বিরোধী।

এটি জামায়াতেরই একটা কৃতিত্ব যে, জামায়াতের অ্যাক্টিভ লোকজনও জামায়াতের ওপেন বিরোধিতা করে। এখানে আপনাকে জামায়াতের লালিত ও ঘোষিত আদর্শ (অর্থাৎ, ইসলাম) এবং জামায়াতের সাংগঠনিক পলিসি ও কার্যক্রমের পার্থক্যকে বুঝতে হবে। দুটো আলাদা। যদিও একটি আরেকটির অনুসরণ করে। তত্ত্ব হলো, ইসলাম কায়েম করতে ইচ্ছুক যে কোনো সংগঠনকে খেয়াল রাখতে হবে যাতে আদর্শ ও সংগঠন সমার্থক হয়ে না দাঁড়ায়। সংগঠনকে আদর্শের সাথে সামঞ্জস্যশীল করে গড়ে তুলতে হবে, যতটা সম্ভব।

জামায়াত তো ইসলামের পথ হতে সরে যায়নি, ইসলাম কায়েমের পথ হতেও সরে যায়নি, জামায়াতের আকীদায় অ-ইসলামী কিছু ঢুকে পড়েনি। জামায়াতই সবচেয়ে অধিক বুদ্ধিবৃত্তিক ইসলামপন্থী দল। এসবই ঠিক। কিন্তু এসব সত্য থেকে জামায়াত যা অতিরিক্ত দাবি করছে, তা ভুল। অর্থাৎ – গণতান্ত্রিক পন্থায় বিপ্লব, অন্তত বাংলাদেশে। শরয়ী দৃষ্টিতে ‘আল-জামায়াত’ জাতীয় মনোভাব পোষণ ইত্যাদি। যারা জামায়াতের সংগঠনে সম্পৃক্ত নন, তাদেরকে আদতে দুর্বল ঈমানদার বা বিচ্যুত মনে করা ইত্যাদি।

জামায়াতের প্রতি বিদ্বেষপ্রবণতা কারো ইসলামী আন্দোলনের কমিটমেন্টের বা বুঝের ঘাটতিকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে। কিন্তু তাই বলে জামায়াতের নেতৃবৃন্দ যদি মনে করেন, অন্যদের কাজগুলো কিছু নয়, বিগ জিরো, সত্যিকারের ইসলামী নয় – তাহলে আমি অকপটে বলবো, জামায়াতের এ ধরনের চিন্তা অগ্রহণযোগ্য।

জামায়াতের আদর্শ নিয়ে আপত্তি নাই, অন্তত আমার নাই; কিন্তু নেতাদের বাস্তব কর্মধারা স্পষ্টতই ত্রুটিপূর্ণ। ‘ইসলামী আন্দোলনে সাফল্যের শর্তাবলী’, ‘বিপ্লবের পথ’ এসব বইয়ে মাওলানা মাওদূদী এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

হতাশাবাদীদের বলছি, আমি হতাশ নই। ঈমানদাররা হলেন খেজুর গাছের ডালের মতো। হাদীসে আছে। সবসময় সতেজ ও সবুজ থাকে। যতক্ষণ গাছের সাথে থাকে। তাহলে যতদিন আমরা বেঁচে আছি, ততদিন পর্যন্ত আমাদের প্রাণান্ত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কারো আপত্তি নাই। সমস্যা হলো চেষ্টার পথ নিয়ে, চলার বাহন নিয়ে, কৌশল নিয়ে।

আপনারা ভাবুন। আমাকে মন্দ বলুন, আপত্তি নাই। কিন্তু ভাবতে থাকুন। গভীরভাবে। তার মানে এই নয় যে, আগে ভাবনাচিন্তা সব শেষ হোক, পথ ঠিক হোক, তারপর চলা শুরু করবেন। দেখুন, ভেবেছেন বলেই মুহাম্মদ (সা) নবী হতে পেরেছেন, ইব্রাহীমকে (আ) তাঁর ভাবনা মুশরিক বানিয়েছে, পরদিনই তিনি শিরকের মেঘমুক্ত হয়ে তাওহীদের আলো গ্রহণ করে নবী হতে পেরেছেন। অ্যারিস্টটল বলেছেন, We have to learn to do and we learn by doing. সুতরাং চলতে থাকুন। কাজ করতে থাকুন। যত ভালো আছে, সবগুলোতে কন্ট্রিবিউট করার প্রতিযোগিতায় লেগে যান।

কর্মবাদী অন্যদের সাথে আমার পার্থক্য হলো আমি কর্মের পাশাপাশি চিন্তনকেও পূর্ণ সক্রিয় রাখতে চাই। আমার অফিস কক্ষের দরজায় একটা কথা লেখা আছে, বড় বড় হরফে – ‘আসুন, আপন আলোয় পথ চলি…’ আমি যখন দায়িত্বশীলের নির্দেশে কাজ করি তখনও আমি শুধু আনুগত্য করি না, বরং ‘দায়িত্বশীলের কথা মানা উচিত’ এ কথা ভাবার কারণেই আনুগত্য করি। এমনকি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও…।

দেখুন, আমাদের এক মরহুম দায়িত্বশীল বলেছেন, ‘আমরা এমন এক সংগঠনের কর্মী যারা ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীলদের হুকুম মানে, আবার তাদের হুকুমও অন্যরা (আনুগত্যশীলগণ) মানেন…। রাসূল (সা) বলেছেন, সাবধান, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল…’

আমি নতুন ধারা গড়ে উঠার কথা বলেছি ও বলছি। নতুন সংগঠন করার কথা কখনো বলিনি। ডিক্লারেশান দিলেই সংগঠন হয় না, যদিও সংগঠন করতে হলে ঘোষণা লাগে। একটা পূর্ণতার ফসল হলো ঘোষণা। সে পূর্ণতাও আবার একদিনে হয় না। এটির একটা পর্যায় লাগে। তবে পর্যায়েরও একটা টাইমলাইন থাকে, থাকতে হয়। যেটিকে বলে পরিকল্পনা। যে বিয়েই করেনি সে তো সন্তানের প্যারেন্ট হতে পারবে না।

যেভাবে সন্তান জন্মগ্রহণ করে, যেভাবে শষ্যবীজ ফসল ফলায়, যেভাবে বৃক্ষে ফল আসে সেভাবে বিপ্লব, বিপ্লবী সংগঠন হয়, হতে হয়। চাইলেই সবকিছু হয় না। আবার যেভাবে চাইতে হবে তা না করে শুধু চাইলে, অন্যভাবে ফলানোর বা ঘটানোর চেষ্টা করলে হবে না। এজন্য সমাজ অধ্যয়নকে সমাজবিজ্ঞান বলা হয়।

আমার দৃষ্টিতে, জামায়াতের বর্তমান কর্মধারায় বাংলাদেশে ইসলামী সমাজ কায়েম হওয়াটা দুরূহ। কারণ গণতন্ত্রনির্ভরতা। মার্কিন কূটনীতিকরা জামায়াতকে যখন সার্টিফিকেট দেয়, তখন জামায়াতের তত্ত্বানুসারেই জামায়াতের ভাবার অবকাশ থাকে বৈকি…!

আমার সকল কথার মূল কথা হলো জামায়াত মক্কী যুগকে এগজস্ট না করে মাদানী যুগের স্বপ্নে বিভোর…!

সম্ভবত অধ্যাপক গোলাম আযমের ভুল চিন্তার ফলশ্রুতি এসব। আমি কয়েকবার উনার কাছ হতে সামনাসামনি শুনেছি, তিনি বলছেন, দেশের মানুষ ইসলাম চায়, সমস্যা হলো নেতৃত্বের…। অথচ বাস্তবতা হলো, মানুষ ইসলাম বোঝেই না, চাওয়া তো দূরের কথা। মানুষ চায় ধর্মীয় ইসলাম, যেটি হলো পপুলার এন্ড সিরিয়াস মিসটেক। জামায়াত যদি এসব ইলেকশনের পিছনে কোটি কোটি টাকা না ঢেলে মানুষকে ইসলাম বোঝানোর জন্য কাজ করতো, জামায়াতও লাভবান হতো, দেশও বাঁচতো…! গোলাম আযম সাহেবের ফর্মূলা মোতাবেক তাবলীগের লোকজন ব্যাপক হারে জামায়াতে জয়েন করার কথা। বাস্তবে তা হচ্ছে না এবং হওয়ারও নয়। ৩০০ আসনে নির্বাচন করার কথা নাইবা বললাম।

সংগঠনবাদিতার যত রকমের বিপদ, সব জামায়াতকে পেয়ে বসেছে। আমার ধারণায়, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় (ইহতেসাব ইত্যাদির মাধ্যমে) জামায়াতের কাঙ্খিত সংশোধন হবে না। আর আল্লাহ যদি কোনো ব্যবস্থা করেন, তাহলে সেটি ভিন্ন কথা!

আপনারা বলতে পারেন, আপনি কেমন কর্মী হলেন, সংগঠনের সমালোচনা ব্লগে করেন? আমি তো আর সামহোয়্যার বা অন্য ব্লগে লিখছি না। ছদ্মনামেও লিখছি না। আমার টেলিফোন নাম্বার ইত্যাদি লিখে দিচ্ছি। আমি চাচ্ছি, বিষয়টা নিয়ে আপনারা ভাবুন। আপনি হয়তো নিজেকে আনুগত্যশীল মনে করে নিরাপদ ভাবছেন। এটি আপনার স্বনির্মিত সান্তনা মাত্র। যদিও ব্লগিং অনেক পুরনো প্রযুক্তি, কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের পশ্চাৎপদশীল লোকদের মধ্যে আপনি ব্যতিক্রম ও উন্নতদের অন্তর্ভুক্ত। আমাদের লোকজন যখন মাত্র ইমেইল শিখছে, ততদিনে আপনি একজন ব্লগার…! তাই, আপনার যোগ্যতা দিয়ে আপনি সংগঠনকে কতটুকু হেফাজত করছেন তা ভাবুন। আপনি যদি বিদেশে থাকেন তাহলে ভাবুন তো আপনার পছন্দের টার্কিশ এডাপ্ট্যাশন বাংলাদেশের জামায়াতে আসছে না কেন? রিপোর্ট রাখা, বায়তুলমাল দেয়া, প্রোগ্রামে যাওয়া – এসব নৈমত্তিক কাজের বাহিরে আপনার করণীয় কিছু আছে কি?

মানুষ আপত্তি করে তাঁর ব্যাপারে, যার সাথে সে নিজেকে সংশ্লিষ্ট ভাবে, যার মঙ্গল কামনা করে। সংগঠনের দোষত্রুটি চেপে যাওয়াটা কর্মী বা দায়িত্বশীল হিসাবে আপনার স্বাভাবিক দায়িত্বানুভূতির খেলাপ নয় কি?

আপনি বলুন, আমার বিরুদ্ধেও বলুন, তবুও বলতে থাকুন। থামবেন না। মুখ বুজে পড়ে থাকা আর মুখ বুজে চলা একই কথা। আপনি যতটা উচ্চশিক্ষিত, এই আন্দোলনের অনেকেই ততটা নন। কোরআনে বলা হয়েছে, একদল থাকতে হবে যারা জ্ঞান-গবেষণা করবে আর জিহাদ হতে প্রত্যাবর্তনকারীদের সতর্ক করবে তথা নির্দেশনা দিবে। এ দায়িত্ব যাদের উপর অর্পিত, আপনি তাদের একজন। হোক আপনার মান রুকন, কর্মী অথবা সমর্থক।

সংগঠনের মালিক কেউ নন, আল্লাহ ছাড়া। আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল (সা) ছাড়া সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন কেউই। তাই না?

আবার সমালোচনা করার সময়ে আনুগত্য প্রত্যাহার বা স্থগিত রাখার কোনো অফিসিয়ালিটি ইসলামী আন্দোলনে নাই। কাজ ও প্রশ্ন একসাথে চলতে হবে। আর ফোরামে যাদের একসেস নাই, ফোরামের লোকজন যাদের কথা শোনে না, শুনলেও আইডেল কনসেন্টের বাহিরে কিছু করে না, বা করার ক্যাপাসিটি রাখে না – তারা তো স্বীয় পাবলিক প্লেসে সমালোচনা করবেনই। এটি নিতান্ত স্বাভাবিক। ইসলামের সমালোচনা নীতি নিয়ে বিশেষ করে পাবলিক ক্রিটিসিজম ও জন-জবাবদিহিতার বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য থাকবে এমন পোস্ট আশা করছি।

আসুন, অন্ধ আনুগত্য ও অলস সমালোচনার প্রান্তিকতাসহ যে কোনো প্রান্তসীমাকে এড়িয়ে আমরা মুমিনের উপযুক্ত মধ্যপন্থানুসারী হয়ে প্রত্যেকেই নিজ নিজ খিলাফতের দায়িত্ব পালনে ব্রতী হই।

মূল পোস্টের ব্যাকআপ লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *