অতঃপর কী করণীয়? – ২

যিনি ছাত্রজীবনে সক্রিয়ভাবে ইসলামী আন্দোলনের দায়িত্ব পালন করেছেন, বৃহত্তর ইসলামী সংগঠনের বিভিন্ন বিষয়ে যার নীতিগত ও কৌশলগত আপত্তি আছে, ব্লগে যেসব সমালোচনামূলক লেখা আসে সেসব পড়ে মনে করেন ঠিকই লিখেছে; তিনি বা তাঁর মতো কেউ যখন জানতে চান ‘আমি এখন কোনদিকে যাবো? বা আমরা এখন কী করবো?’ তার বা তাদের জন্য এই লেখা। আজ দুপুরে এক ভাইকে মেইল করেছি এই বক্তব্য দিয়ে–

খেলাফতের দায়িত্ব:

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে প্রতিটি মানুষই আল্লাহর খলিফা। তাই ইসলামী হুকুমত কায়েম হবার আগে প্রত্যেকের উপর ইক্বামতে দ্বীনের দায়িত্ব ফরজে আইন আর হুকুমত প্রতিষ্ঠিত হবার পর ফরজে কেফায়াহ। তাহলে বুঝতে পারছেন, কোথায়ও যাবার দরকার নাই। কারণ, আপনি ঠিক পথেই আছেন।

প্রতিটি মুমিন ইসলামের এক একটি দূর্গ, এক একটি দল, এক একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান অজেয়, যতক্ষণ সেই ব্যক্তি ঈমানের উপর টিকে থাকেন। দল বা সংগঠন বলতে আমরা যা বুঝি তা হলো এই ব্যক্তিক দল বা প্রতিষ্ঠানগুলোর ফেডারেশন বা সমন্বয়। এই সমন্বয়ও আবার বৃহত্তর একাধিক দল বা প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বিত থাকে। যাকে বলে বৃহত্তর সংগঠন বা নেজাম। এভাবেই আরও বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ও এলাকার সমন্বয়ে গড়ে উঠে উম্মাহ। একজন খলিফা হচ্ছেন এই উম্মাহ নামক প্রতিষ্ঠানের প্রধান দায়িত্বশীল। এরই নাম খেলাফত। খলীফা হলেন সব খলিফার খলিফা। খেলাফতের এই ধারণা তা-ই, যা কোরআনে ‘ইন্নি জায়িলুন ফিল আরদ্বি খলিফাহ’ হিসাবে বর্ণিত। খেলাফতের এই দায়িত্ব একাধারে ব্যক্তিক (ইনডিভিজ্যুয়াল), এলাকাগত (টেরিটোরিয়্যাল) ও বহুজাতিক (মাল্টি ন্যাশনাল) বা বৈশ্বিক (গ্লোবাল)।

বিদ্যমান সংগঠনের ব্যাপারে আপত্তি এতায়াতের সম্পর্ক:

আমরা যখন নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে যাই, তখন নিশ্চয় এই ইমাম সাহেব পারফেক্ট কি না, তা ভাবি না। এমনকি তার কোনো দোষত্রুটি জানা থাকা সত্ত্বেও তাকে এক্তেদা করতে আমরা পিছপা হই না। আবার, ইমাম সাহেবের পিছনে নামাজ পড়ি বলে তার দোষত্রুটি সম্পর্কে তাকে বলতে আমরা দ্বিধা করি না। এবং তিনি সেটি না মানলে সেসব সম্ভাব্য আপত্তির বিষয়ে অন্যদের কাছে বলতেও আমরা কসুর করি না। তাই না?

সুতরাং প্রচলিত ইসলামী আন্দোলনে আপনাকে সম্পৃক্ত থাকতে হবে। যেসব কাজ নিঃসন্দেহে ভালো সেসবে সর্বোচ্চ পরিমাণে পারটিসিপেট করতে হবে। কথা আছে ‘পেটে দিলে পিঠে সয়’। আমি এতো কথা বলি, তৎসত্ত্বেও এখানকার সংগঠন আমাকে যথেষ্ট ভালোবাসে ও আপন মনে করে। আর আমিও সংগঠনের ক্ষুদ্র স্বার্থেও যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে কখনো দ্বিধা করিনি, করবো না, ইনশাআল্লাহ।

তাই, সর্বদা কাজে থাকতে হবে। কর্মবিমুখতা যেন কখনো আমাদের গ্রাস করে না ফেলে। সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড কালচারাল স্টাডিজ (সিএসসিএস) নামে গত ১০ বছর হতে আমি বিভিন্ন ধরনের কাজ করে যাচ্ছি। সংগঠন এমনকি আমাকে চলচ্চিত্র উৎসবের মতো অনুষ্ঠানে (ইরাক যুদ্ধের সময়) পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেছে। সংগঠনের মিনিমাম রিকোয়ারমেন্ট খুবই যৌক্তিক। তা হলো আপনি বিপরীত আদর্শের কোনো সংগঠনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। প্রচলিত ইসলামী সংগঠনের তাত্ত্বিক নীতি-আদর্শ তো খুবই ভালো। নেতৃবৃন্দের একাংশের কায়েমী স্বার্থবাদী মনোভাব ও অঘোষিত কিন্তু অতীব শক্তিশালী তথাকথিত কম্যুনিস্টিক সিস্টেম নিয়ে যত বিপত্তি। এটি আমাদের দুর্ভাগ্য। কিন্তু তাই বলে আমরা বসে থাকতে পারি না। তাই না?

ইক্বামতে দ্বীনের দায়িত্ব সম্ভবপরতার দিক থেকে সামষ্টিক, কিন্তু দায়বদ্ধতার দিক থেকে ব্যক্তিগত:

খেলাফত তথা ইক্বামতে দ্বীনের দায়িত্বকে নিজের ভাবতে হবে। মনে করুন, দুনিয়ার সব মানুষকে হেদায়াতের দিকে ডাকার, দ্বীনের উপরে রাখার দায়িত্ব সম্পূর্ণ আপনার! তাহলে অন্যদের ত্রুটিগুলোর জন্য মন খারাপ হলেও আপনি বসে থাকতে পারবেন না। প্রতিটা মুসলিম একটা ইসলামী দল, একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠান, বিপ্লবের এক একটি সম্ভাবনা। বিশেষ করে আপনার-আমার মতো শিক্ষিত ও আন্দোলনের অভিজ্ঞতার অধিকারীরা।

আমার সাথে সংগঠনবাদীদের পার্থক্য:

আমি শুধু কাজে বিশ্বাসী নই। বলার পরে না হলেও ‘বলেছি তো’ এই সান্তনা নিয়ে চুপ করে থাকার পক্ষপাতী নই। আমি ‘ওয়ামা আলাইনা ইল্লাল বালাগে’র সাথে সাথে ‘ইনিল হুকমু ইল্লা লিল্লাহ’তেও সমবিশ্বাসী।

সুতরাং কাজ করতে থাকুন। ভালো কাজের অভাব নাই । তাই বলে খেদমতে দ্বীনের পথ ধরলে হবে না। ইক্বামতে দ্বীনের উপরেই থাকতে হবে। সেজন্য সংগঠনবিশেষই একমাত্র বিকল্প নয়। আমি নিশ্চিত, কী করবেন যখন ভাবছেন, তখন করণীয় পেয়ে যাবেন। চলার উপরেই থাকুন, পথ পেয়ে যাবেন। আসলে আপনি পথের উপরেই আছেন! যদি আপনি অলরেডি পথের তথা হেদায়াতের উপর না থাকতেন, তাহলে আপনি কোনদিকে যাবেন কেন জানতে চাচ্ছেন? পথিকই পথ খোঁজে, ঘুমন্ত ব্যক্তি নয়। মুমিনই নেফাকের আশঙ্কায় ভোগে, মুনাফিক নয়।

এতায়াত সম্পর্কে ভুল ধারণা:

সংগঠনবাদীদের অন্যতম ভুল হলো এতায়াতের ব্যাপারে মনে করা ও দাবি করা যে, তাদের ধারায় যারা শপথ নেয়নি তারা এতায়াতের রিকোয়ারমেন্ট পূর্ণ করলো না। এটি এ জন্য ভুল যে, যখন ইসলামী হুকুমত কায়েম হয়ে যায় সে জনপদে তখন একজনই আমীর হবেন, যাকে বলা হবে আমীর বা খলিফা। তার বাইয়াতের বাহিরে থাকা হবে ইসলামের বাহিরে থাকা। তারা (সংগঠনবাদীরা) এটিকে হুকুমত কায়েমের প্রচেষ্টার সাথে গুলিয়ে ফেলেন। ইসলামী নেতৃত্ব এককেন্দ্রিক বটে, তবে তা হুকুমত কায়েম হওয়ার পরে। ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজ বা ধারা একটা জনপদে একাধিক হতে পারে। বরং হওয়াই উচিত। বিশেষ করে বিদ্যমান বিশ্ব বাস্তবতায়। এ নিয়ে বিস্তারিত কথা আপাতত আর নয়।

চিন্তা করবেন না। আপনি পথেই আছেন। সঠিক দিকেই চলছেন। সর্বদা হেদায়াতের জন্য দোয়া করুন। আর লেগে থাকুন আল্লাহর সাথে। আল্লাহ ওয়াদা করেছেন তিনি তাকে পথ দেখান যে তাঁর সাথে লেগে থাকে (মান আ-নাবা ইলাইয়্যা)।

মূল পোস্টের ব্যাকআপ লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *