মানবিক মর্যাদা সংক্রান্ত তিনটি নিয়ম

১। মানুষ মাত্রই সর্বোচ্চ পরিমাণে ও সমানভাবে মর্যাদা সম্পন্ন।

২। এই মৌলিক সূত্রকে সমুন্নত রাখার প্রয়োজন ছাড়া কোনোভাবেই এর ব্যত্যয় করা যাবে না।

৩। ১ম ও ২য় নিয়মের লংঘন না হওয়া সাপেক্ষে মানুষ, পরিবেশ ও বিশ্বের জন্য কাজ করবে।

 

I Robot সিনেমাতে যেমন করে আছে রোবটের ৩টা নিয়ম:

১। রোবট মানুষের আদেশ মেনে চলবে।

২। রোবট মানুষের ক্ষতি করবে না।

৩। ১ম ও ২য় নিয়মের ব্যত্যয় না ঘটা সাপেক্ষে রোবট আত্মরক্ষা করবে।

পবিত্র কোরআনে মানবিক মর্যাদা সম্পর্কে বলা হয়েছে: “ওয়া লাক্বাদ কাররামনা বানি আ-দম।” মানে, “আমি আদম সন্তানকে মর্যাদাসম্পন্ন করেছি।”

দুঃখজনক হলেও সত্য, অধিকাংশ ইসলাম-অনুসারীরা অধিনস্ত, ‘অপর’ ও বিরোধীপক্ষের অধিকার ও মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন নন। স্বেচ্ছাকৃতভাবে গাফিল। তারা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চান সমাজ ও রাষ্ট্রে। কিন্তু নিজের ঘরে, অফিসে ও আওতাধীন পরিমণ্ডলে অধীনস্তদের ন্যূনতম মানবিক অধিকার ও মর্যাদা প্রদানে তাদের প্রবল অনীহা।

মানবিক মর্যাদা প্রদানের দৃষ্টিতে সকল ইসলামাইজেশান প্রকল্প ওভারঅল এন্ড ইন ট্রু সেন্স, ব্যর্থ। হ্যাঁ, সবাই সমান সুযোগ ও সুবিধা পাবে না। এটি সত্য। হাতের সব আংগুল যেমন সমান হয় না। তাই বলে রিসোর্সের আকাশ পাতাল পার্থক্য থাকা? এটি তো ন্যায়-নীতির সুস্পষ্ট লংঘন।

এত সুন্দর করে বোরকা-হিজাব-পর্দা করা, মিহি সুরে কথা বলা মেয়েগুলো যখন ‘কাজের মেয়েদের’ সাথে রূঢ় আচরণ করে, স্বামী গৃহের নিকটাত্মীয়দের অবহেলা করে, গরীব বস্ত্র-বালিকাদরে ব্যাপারে কোনো দায়িত্ববোধ ফিল করে না, তখন খুব খারাপ লাগে।

এত সুন্দর সুন্দর লম্বা চওড়া আদর্শের বুলি আওড়ানো লোকটা যখন নিজ স্ত্রীকে উপার্জন না করার জন্য খোঁটা দেয়, স্ত্রী নামক মানুষটিরও যে সামাজিক দায়বদ্ধতা আছে তা বেমালুম ভুলে যান, সামাজিক দায়িত্বপালনে তাকে কার্যত বাধাগ্রস্ত করেন, তখন খুব খারাপ লাগে। ‘দ্বীন হচ্ছে জীবনের উদ্দেশ্য’ এমন দাবী করে যখন তারা অফিসের গরিব কর্মচারীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, অমানবিকভাবে খাটায়, তখন খারাপ লাগে।

মসজিদের হুজুর, মাদ্রাসার শিক্ষক, ইসলামী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, তারা যখন মানুষকে ‘নির্ঘাৎ জাহান্নামগামী’ মনে করে তাদেরকে ছলে-বলে-কৌশলে ‘উদ্ধার’ করার জন্য উঠে-পড়ে লাগেন, তখন খারাপ লাগে। বাস্তবতা হলো, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার কারণে প্রত্যেকেই আমরা জাহান্নামের কিনারায় উপনীত। অপরকে সেবা দেয়ার মাধ্যমেই প্রত্যক্ষভাবে আমরা নিছক নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করছি। মৌলিক মানবিক অধিকারগুলোর ন্যূনতম নিশ্চয়তা প্রদানের ব্যবস্থা করা যে, ঈমানী দাওয়াতের ভিত্তি, এবং এ অর্থে এই ‘দুনিয়াবী’ বিষয়গুলো যে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ, তা আমাদের ইসলামী জনগোষ্ঠী ও আলেম সমাজ মনে করে না।

হাশরের ময়দানে অনেক মর্যাদাবানের মর্যাদা অবনমিত হবে। এর বিপরীতে, এখনকার হত-দরিদ্র ও হীন মর্যাদার অনেকেরই মর্যাদা উচ্চস্তরে প্রতিষ্ঠিত হবে। এ ধরনের ব্যাপক মর্যাদাগত রিশাফলিং হবে মানুষের প্রতি মানবিক দায়িত্বপালন ও তাদেরকে যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকার ওপর ভিত্তি করে, মূলত:।

যেই ঈমানের সাথে সামঞ্জস্যশীল কর্মের সম্পর্ক দুর্বল, সেই ঈমান, নিছক বিশ্বাস। অনুরূপ কর্মপ্রচেষ্টা ব্যতিরেকে কোনো ‘ঈমান’ সত্যিকারের ঈমান হয়ে উঠে না। ঈমান ও স্ববিরোধিতা, সহাবস্থান করতে পারে না।

২.
যেসব মানুষ নানা দিক থেকে অমর্যাদাকর জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে, সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণী হিসাবে আমাদের উচিত তাদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার জন্য চেষ্টা করা। তার আগে,আমাদের আশপাশে ও অধিনস্ত হিসাবে যারা আমাদের ‘হাতে আছে’, তাদের যেসব নৈতিক প্রাপ্যতা আমাদের হাতে অনাদায়ী রয়ে গেছে, সেসব অধিকার ও মর্যাদাকে অবিলম্বে ফিরিয়ে দেয়া।

জগতের মহত্তম ব্যক্তি, হযরত মুহাম্মদ (সা) বলেছেন, ‘সাবধান, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। প্রত্যেকককেই নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”

আদর্শ, ইসলাম ও ধর্মকে যারা নিছকই আইনি দৃষ্টিকোণ হতে দেখেন, তারা আমার এসব বুঝতে পারবেন না। তাদের ব্যাপারে আমাদের পলিসি হওয়া উচিত, এসব লোকদের হিপোক্রেসির জায়গাগুলো দেখিয়ে দিয়ে তাদেরকে যথাসম্ভব চাপে রাখা। তাদেরকে যথাসম্ভব কোণঠাসা করে রাখা। অন্যায়ের ব্যাাপাসে সব সময়ে আপোষহীন ও প্রতিবাদী থাকা। আদর্শ, ধর্ম ও ইসলামকে যারা নৈতিক দৃষ্টিকোণ হতে দেখেন, যাদের জীবনবোধ গভীর, স্বচ্ছ ও সংবেদনশীল, তাদের জন্যই আমার এই কথাগুলো।

খোলামনে ও জীবনবোধের দৃষ্টিতে যদি দেখেন, তাহলে দেখবেন, সব মানুষই মূলত সমান। আমাকে আপনাকে পরীক্ষা করার জন্যই আল্লাহ তায়ালা কাউকে কাউকে কারো কারো অধিনস্ত করেছেন। যাতে করে তিনি পরষ্পরকে পরষ্পর দ্বারা পরীক্ষা করতে পারেন। এই ধরনের পরীক্ষা পদ্ধতির কারণেই সৃষ্টি হয়েছে আমাদের সফল হওয়ার লোভনীয় সম্ভাবনা। পরীক্ষা না থাকলে পুরস্কারের সুযোগও থাকতো না। সে ক্ষেত্রে আমরা হতাম নিছকই বস্তু। বস্তুর মতো নিঃশেষে নিশ্চিহ্ন হওয়ার মতো কিছু।

মানুষের চেয়ে মর্যাদাবান কিছু নাই। মানবিকতার উর্দ্ধে কোনো ধর্ম নাই। সাম্যের উর্দ্ধে কোনো আদর্শ নাই। আদর্শ ও নীতির উর্দ্ধে যে ভোগবাদী জীবন, ধর্ম ও আদর্শের সব চটকদার পোষাকের আড়ালে তা ব্যর্থ জীবন। সে জীবন নয় সত্যিকারের কোনো মানবিক জীবন। মানুষকে যারা ন্যূনতম মানবিক মর্যাদা দিতে অপারগ, তাদের দ্বীন, ধর্ম, আদর্শ ও সামাজিক মর্যাদা, সব মূল্যহীন।

আসুন, মানবিক মর্যাদার এই তিনটা সূত্রকে সব সময়ে মেনে চলি। এতেই রয়েছে আমাদের মানব জীবন যাপনের প্রকৃত সফলতা ও স্বার্থকতা।

লেখাটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *