মানবিক হতে পারা না পারা

কিছু মানুষ দেখবেন বেশ ভদ্র। সামাজিক। মেহমানদের যথেষ্ট সম্মান করে। কেননা, তারা উনার সম সামাজিক মর্যাদার। একই মানুষকে হয়তো দেখবেন নিজের অধীনস্তদের সাথে বেশ রূঢ়। বিশেষ করে চাকর-বাকর, বুয়া, রিক্সাওয়ালা লেভেলের নিম্ন সামাজিক মর্যাদার লোকদের সাথে। সত্যিকারের উদার মন-মানসিকতার অধিকারী বা মানবিক হওয়া এ ধরনের লোকদের জন্য দুরূহ ব্যাপার। রীতিমতো অসম্ভব। ‘লো ক্যাটাগরির লোকদের’ সাথে মানবিক আচরণ করার কথা উনারা ভাবতেও পারে না। মানবিক আচরণ বলতে আমি যে কোনো মানুষের সাথে মর্যাদাপূর্ণ সদাচরণের কথা বলছি।

একসাথে বসে খাওয়া, একই মানের চেয়ার বা একই সোফায় নির্দ্বিধায় পাশাপাশি বসা, বড় হলে অধীনস্তকেও সিনিয়রসুলভ সম্বোধনে কথা বলা, এসব যেন এইসব তথাকথিত ভদ্রলোকদের দৃষ্টিতে ব্যক্তিত্বের খেলাফ। অধীনস্তদের নাকি চাপে রাখতে হয়। দেখবেন, ‘কাজের লোক’, ড্রাইভার, পিয়ন, কর্মচারীদের ওয়াশরুম সুবিধা নিয়ে তাদের বসেরা কখনো উদ্বিগ্ন হন না। তাদের জন্য এ ধরনের সুবিধা কোথাও থাকলেও তা দেখবেন নিতান্ত যেনতেন ধরনের। বেচারা ‘ছোট লোকেরা’ কোনোমতে কাজ সেরে ‘স্যারের’ সেবায় সদাপ্রস্তুত থাকে। বাসাবাড়িতে চাকর-বাকরের থাকার ব্যবস্থার সাথে থানার গরাদের পিছনে হাজতখানার যথেষ্ট সাদৃশ্য। মানুষ থাকার জন্য এরচেয়ে সংকীর্ণ আবাসন আর হতে পারে না।

অফিসে দেখবেন, কর্মচারীদের বসার ব্যবস্থা এতো যৎসামান্য যেন বসতে দিলে তারা কাজে ফাঁকি দিবে। বড়লোক ও উচ্চশিক্ষিত, শীর্ষ পদাধিকারী সাহেব ও মহিলা সাহেবদের কখনো মনে হয় না, গার্ড-পিয়ন-ক্লিনারদেরও মৌলিক কিছু মানবিক অধিকার আছে। মানবিক সব প্রয়োজন পূরণের অধিকার যেন শুধুমাত্র ‘সভ্য’ শিক্ষিতদের জন্যই বরাদ্দ। সবচেয়ে অমানবিকতার শিকার হয় কর্মজীবী নারীদের শিশু সন্তানেরা। কাজে আসার সময় তাদের কোথাও রেখে আসতে হয়। বাচ্চা সাথে নিয়ে আসা মহিলাকে কেউ কাজে রাখতে চায় না। কখনো যদি কাজে নিয়ে আসেও সাহেব-ম্যাডামদের বাচ্চাদের সাথে মেশার ‘স্পর্ধা’ তারা কখনো করতে পারে না। এসব নিষ্পাপ শিশুদেরকে নিছকই বাচ্চা হিসাবে না দেখে ‘বুয়ার বাচ্চা’ হিসাবে দেখা হয়। এসব নিরীহ বাচ্চারা নিজ থেকে বুঝে যায়, তারা ভাইয়া-আপুদের মতো নয়। যেন তারা নীচ, আলাদা।

এসব দেখে ভাবছি, মানবতা, মানবিকতা, এগুলো কোথায়? সমমর্যাদার লোকের সাথে সম্মানজনক আচরণ, আন্তরিক ব্যবহার, এগুলোতে তো মানবিকতার কিছু নয়। বাধ্যবাধকতাহীন পরিস্থিতিতে মানুষকে নিজের সমান মর্যাদায় বিবেচনা করাই হলো মানবিকতার বহিঃপ্রকাশ। কোনো ব্যক্তি দণ্ডিত হলে এমন কি শাস্তি কার্যকরের সময়েও তার মানবিক অধিকার ক্ষুন্ন করা যাবে না।

মানুষকে সমান মর্যাদা দেয়ার ব্যাপারটাকে বাহ্যত অপর ব্যক্তির অধিকার আদায় হিসাবে মনে হয়। আসলে এটি মানুষ হিসাবে আমাদের নিজেদেরই সহজাত নৈতিক মানের দাবি। মানবিকতা শুধু মানুষের জন্য, এমন নয়। বরং প্রাণী, উদ্ভিদ ও যে কোনো সত্তার জন্যই এটি প্রযোজ্য। ইসলামের দৃষ্টিতে এমনকি নিজের পোশাক অবিন্যস্ত ও অপরিচ্ছন্ন রাখাটাও মানবিকতার ব্যত্যয়। বলা হয়েছে, আকাশ ও জমীনের সব কিছু সার্বক্ষণিকভাবে মহান আল্লাহ তায়ালার জিকির করে। ময়লা হয়ে পড়লে পোশাকের ‘রুহ’ দুর্বল হয়ে পড়ে। ধুয়ে পরিচ্ছন্ন করা হলে সেটি আবার তাজা হয়ে উঠে। যার ফলে সেই পোশাক পূর্ণদ্যমে আবার আল্লাহর জিকির করা শুরু করে। ভাবুন তো….

যেটা যে রকম হওয়ার কথা, সেটি সেভাবেই হবে। যেটা যেভাবে চলার কথা, সেটি সেভাবেই চলবে। যার যা কাজ, সে তাই করবে। এটিই নৈতিকতা। এটিই মানবিকতা। মানুষ হিসাবে জন্মগ্রহণ করার কারণে মানুষ মাত্রই কিছু অভিন্ন অধিকার লাভ করে। অপরের এই জন্মগত অধিকার রক্ষা করা প্রত্যেকেরই অনস্বীকার্য দায়িত্ব। এভাবেই মানবিক সমাজ গড়ে উঠে।

বলা হয়েছে, তোমরা যখন কোনো প্রাণী শিকার করবে, তখন অবশ্যই তা ভক্ষণ করবে। যখন পানি ব্যবহার করবে, এমন কি সেখানে পানির স্রোত থাকলেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করবে না। অপচয় করার যে নিষেধাজ্ঞা, তার কারণ কি জানেন? এটি হলো মানবিকতা, সহমর্মিতা, অপরের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন। তাই, আপনার সামর্থ্য থাকা সত্বেও অতিরিক্ত ব্যয় করতে পারবেন না। এ ক্ষেত্রে আইনি বাধা থাকুক না থাকুক, মানুষ হিসাবে আপনার, আমার, সকলের মানবিক-নৈতিকতার অপরিহার্য দাবি হলো বাহুল্য ব্যয় ও অপচয়কে পরিহার করা।

২.

দেশের মধ্যে এখন ব্রিটিশরা নাই। পাকিস্তানীরা নাই। এখন আমরা সবাই বাংলাদেশী। নাগরিক হিসাবে সমান। তারচেয়ে বড় কথা, মানুষ হিসাবে আমরা সবাই সমান। সবাই আমরা সমমর্যাদার বিশ্ব নাগরিক। অথচ, শাসক-শাষিতের যে প্রভুত্ব-দাসত্বের সম্পর্ক, তাতে কোনো পরিবর্তন ঘটে নাই। শোষণ-নিষ্পেষণ এখনো তা-ই যা ছিলো ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে। আপনিই বলুন, বৈষম্যের মাত্রা কি কমেছে? সমাজের হত-দরিদ্র ‘নিম্ন শ্রেণীর লোকদের’ প্রতি শহুরে শিক্ষিত বড়লোকদের ঘৃণা ও অস্পৃশ্য-মনোভাবের কি অবসান হয়েছে?

যদি এসব অমানবিক দৃষ্টিভংগীর অবসান কিছুমাত্রও না হয়ে থাকে, তাহলে এই স্বাধীনতার মানে কী? দেখে শুনে মনে হচ্ছে, স্বাধীনতা, উদারতা, মানবিকতা, মর্যাদা, মূল্যবোধ, শিক্ষা, জ্ঞানবিজ্ঞান, নারীবাদ, গণতন্ত্র ইত্যাদি সব গালভরা বুলি যেন শুধুমাত্র দেশের ক্ষুদ্র সংখ্যক এলিট শ্রেণীর নিজস্ব পারস্পরিক ব্যাপার-স্যাপার।

এমন কি যারা ইসলামপন্থী তথা আদর্শ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের কথা বলেন, তাদের সব কর্মকাণ্ড ও অবদানও যেন শিক্ষিত উঠতি বড়লোকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অধীনস্তদের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রদানে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, এমন কোনো ইসলামিস্ট এলিট পুরুষ বা নারীর সন্ধান আমি অদ্যাবধি পাই নাই। সত্যি বলছি। সর্বান্তকরণে বলছি, ইসলামের সাম্য ধারণাকে নিজের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিমণ্ডলে চর্চা করেন, এমন কোনো ইসলামী ব্যক্তিত্বের সাথে আজো আমার সাক্ষাত ঘটে নাই। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটি সত্যি। শো-অফ ও ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীলদের কাছে রিপোর্ট প্রদানের বাহিরে, নিজের আওতার মধ্যে যারা ইসলাম কায়েমে অনাগ্রহী, তারা সমাজ ও রাষ্ট্রে কোন ইসলাম কায়েম করতে চায়, আমার বুঝে আসে না। আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, প্রতিবেশি, সহযাত্রী, স্বামী বা স্ত্রী ও অধিনস্তের কাছে মানুষের আসল চরিত্র প্রকাশ হয়ে পড়ে। এই সব জায়গায় আমরা কে কতটুকু নৈতিক, মানবিক ও ইসলামিক?

মানবিক হতে পারা, এটি আল্লাহর রহমত। আল্লাহ তায়ালা বলেছন, অন্তরের সংকীর্ণতা হতে যে মুক্ত থাকতে পারলো, সেই আসলে সফল মানুষ। আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, দ্বীন হচ্ছে সবার জন্য কল্যাণ কামনা। কিছু কিছু অ-ধার্মিক ব্যক্তিকে দেখেছি, যারা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি মানবিক। এর বিপরীতে, ধার্মিক পক্ষের ব্যাপারে আমার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি নেতিবাচক। ধর্মের ভিত্তি যে মানবতা, ধর্মবাদীরা তা প্রায়শই ভুলে যায়। মানবতার দাবিকে উপেক্ষা ও অগ্রাহ্য করে তারা বায়বীয় আধ্যাত্মিকতা ও ধর্মীয় নৈতিকতার কথা বলে। সেটাও তারা একান্ত ব্যক্তিজীবনে নিজেরা তেমন একটা ফলো করে না। ধর্মবাদীরা সমাজের এতসব অর্থনৈতিক অনাচার, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তেমন কিছু বলেন না। বরং এমন তোজজোড় করেন, যাতে মনে হয়, যৌন-নৈতিকতাই যেন মানুষের নৈতিকতার মূল বিষয়…! আফসোস! এ ব্যাপারে অধিকাংশ শায়েখকে আমার কাছে বাতিকগ্রস্ত বলে মনে হয়।

এর বিপরীতে বামপন্থী কম্যুনিস্ট-মার্ক্সিস্ট সাম্যবাদীরা যে খুব মানবিক, তাও না। যদিও তারা মানুষের অধিকার ইত্যাদি নিয়ে নানা রকম বাগাড়ম্বর করে। নিতান্তই ব্যতিক্রমী কেউ কেউ বাদে, অধিকাংশ সমাজতন্ত্রীরাই প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে আপদমস্তক পুঁজিবাদী। এ দেশের কম্যুনিজম অনুসারীদের ইতিবাচক আদর্শিক চেতনা খুব দুর্বল। আমার দৃষ্টিতে তারা পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী-বহুজাতিক লুটেরা কোম্পানীগুলোর এদেশীয় দালাল। সর্বোতভাবে ধর্মবিরোধিতা করাই তাদের দৃশ্যমান মূল এজেন্ডা। আমি এ পর্যন্ত বামপন্থী স্টুডেন্টদের যতজনের সাথে কথা বলেছি, তাদের কাউকেই পাই নাই, যে কিনা মার্ক্সবাদ ভালো করে পড়েছে, বুঝে। আমাদের বিভিন্ন কোর্সে, বিশেষ করে রাষ্ট্রদর্শনে মার্ক্সবাদ পাঠ্য। সেই সূত্রে আমার ওসব পড়া। যতটুকু জেনেছি, এখনকার বামপন্থীদের মূল সবক হচ্ছে তসলিমা নাসরিন, আরজ আলী মাতুব্বর, বার্ট্রান্ড রাসেল ও সৈয়দ শামসুল হকের লেখাজোকা। বেগম রোকেয়াকে তারা পড়ে খণ্ডিতভাবে। মার্ক্স-এঙ্গেলস পড়ার সময় তাদের তেমন হয় না। অন্ততপক্ষে তারা যে ওসব ক্রিটিক্যালি পড়ে না, তা তাদের সাথে আলাপ করলে বুঝা যায়।

ডানপন্থী-বামপন্থী নির্বিশেষে তথাকথিত সচেতন সমাজকর্মী ও বিভিন্ন ধারার আন্দোলনপন্থীদের উপর ব্যাপকভাবে আভিজাত্য-প্রবণতা বা এলিটিজম ভর করে আছে। গণমানুষর জন্য তারা লড়াই করে বলে মুখে মুখে বলে। ওসব তাদের আত্মসান্তনা ও প্রবোধ মাত্র। যার যার ব্যক্তিজীবনের দিকে তাকালে তাদের মানবিক-স্ববিরোধ ও নৈতিক সংকটের বিষয়গুলো নগ্নভাবে ধরা পড়ে। পেশাগত কারণ দেখিয়ে বা পর্দারক্ষার দোহাই দিয়ে চারিদিকে যেভাবে অণুপরিবারের জয়-ডংকা-ঢোল-শহরত বাজানো হচ্ছে, তাতে করে ধনী-গরীব আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে বৃহত্তর পারিবারিক পরিবেশে সহমর্মিতা, মানবিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষার ঐতিহ্যবাহী ক্ষেত্রটাও দেখছি দিন দিন সংকীর্ণ হয়ে আসছে।

৩.

মানবিক হতে না পারাটা যখন কারো কারো ব্যক্তিগত সমস্যা, তখন সমাজের জন্য সেটা বড় কোনো সমস্যা না। কিন্তু, মানবিক হতে না পারাটাকে সমাজ যখন আদৌ খারাপ চোখে দেখে না, তখন সমস্যাটা সত্যিকার অর্থেই ভয়াবহ। সমকালীন বাংলাদেশে আমরা এমনই এক মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে বসবাস করছি। এসব দেখতে দেখতে আমরা কেমন যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছি।

ব‍্যতিক্রম বাদে যত শিক্ষিত, তত অমানবিক, তত অনৈতিক। পরিশীলিত উপায়ে নৈতিকতার দোহাই দেয়ার ও ‘মুক্তবুদ্ধি’ চর্চার সুযোগ না পাওয়ার কারণে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষেরা এখনো তুলনামূলকভাবে সৎ, অনেকটাই মানবিক ও অধিকতর নৈতিক। ন্যূনতম মানেও মানবিক হতে না পারাটা এ দেশীয় সাফ কাপড়ের এলিট শ্রেণীর গড়পরতা সমস্যা। চাচ্ছি, এমন ভয়াবহ রকমের সমস্যায় যে আমরা নিপতিত, তা নিয়ে যেন অন্তত কিছুটা উচ্চবাচ্য হয়। দেশ ও জাতি উদ্ধারের আগে অন্তত নিজ নিজ সার্কেলে অধীনস্তদের ন্যায্য মানবিক অধিকার আদায় করার জরুরত অন্তত একজন পাঠক হলেও যেন অনুধাবন করুক। আত্মসমালোচনা করুক। উপলব্ধি করুক। আপনি আচারি ধর্ম যেন আমরা পরেরে শিখাই। দেশ ও জাতি উদ্ধারের আগে অন্তত নিজেদের যেন আমরা মানবিকতার সংকট থেকে উদ্ধার করি।

আত্মউপলব্ধিই যে কোনো নৈতিক সংকট নিরসনের ক্ষেত্রে প্রধান ও পূর্বশর্ত। আসুন আমরা মানুষকে মানুষ হিসাবে সম্মান করতে শিখি। যেন মনে করি, আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের জন্য পরীক্ষা। আসুন, মানবিক হই। মানবিক সমাজের বাইরে কোনো আদর্শ সমাজ নাই। মানবিকতার ঊর্ধ্বে কোনো ধর্ম নাই। আসুন, নিছক আইন নয়, বরং নৈতিকতাকেই মেনে চলি।

ফেসবুকে প্রদ্ত্ত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Mohammed Masud Hassan: Sir! Thanks!! Would you kind enough to say, your stand please?

Mohammad Mozammel Hoque: What “stand”? I have multiple stands in different aspects. Politically I am an obedient citizen. Religiously I am a practicing Muslim. Ethnically I am a Banglee. etc.

Khondoker Zakaria Ahmed: “stand” বলতে কী বুঝাতে চেয়েছেন? কোন রাজনৈক দল করা? ইসলামি মুভমেন্টে ব্যাস্ত এমন কোন সংগঠনে যোগ দেয়া? ইনসাফের উপর থাকুন এবং ইনসাফকে সমর্থন করুন – এটাই স্ট্যান্ড হওয়া উচিৎ নয় কী?

Khondoker Zakaria Ahmed: আমার মনেহয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং জীবনে সাথে সার্বক্ষণিকভাবে জড়িত একটি বিষয়ের অবতারণা করেছেন। পেশাগত, পারিবারিক, ব্যক্তিগত নানা আংগিকে আলোচনা হতে পারে। পেশাগত বিষয়ে বলা যায়, যিনি খুবই দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং সংস্থাও তার কাছ থেকে অনেক বেশি ফলাফল পায়, যার প্রেক্ষিতে তার মজুরী বা বেতনও বেশি দেয় যা একজন পিয়ন বা ড্রাইভার থেকে বহুগুন (৮/১০ গুন বা তার অধিক) বেশি।

মেনে নিলাম তার শ্রমের বাজার দর বা দক্ষতা বিবেচনায় কিছু বেশি বেতন হতেই পারে। কিন্তু সে তুলনায় পিয়ন বা ড্রাইভারের বেতন কত হলে যৌক্তিক বা মানবিক হবে? দুই জনই মানুষ, দুইজনেরই সংসার আছে এবং জীবন-জীবিকার জন্য ব্যয় করতে হয়। আবার প্রায় একই বাজার থেকে তারা খাদ্যসহ জীবন সামগ্রী ক্রয়করে থাকে। অন্যদিকে অতিমাত্রায় বেশি বেতনভোগীরা অন্যান্য সুবিধাও ভোগ করে যেমন এসি অফিস, সার্বক্ষণিক গাড়ী, ট্যুরে গেলে ডিএ বা থাকা ও খাবার জন্য বহুগুন বেশি টাকা পায় আবার সম্মানও (?) তার বেশি। অথচ বেচারা সাধারণ অফিসার বা ড্রাইভার খুবই সাধারণ মানের রুমে থাকে, খাবার টাকাও কম পায়, মশার কামড়ে রাত কাটায়। অথচ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সাধারণ অফিসার, ড্রাইভার পিওন তারাও সকলেই মানুষ এবং তিন বেলা খায়। শুধু অতিরিক্ত যোগ্যতার কারণে সবকিছুতে এত ব্যবধান কেন হবে? অতিরিক্ত যোগ্যতার কারণে সে তো বেশি বেতন পাচ্ছে। বাকি সুবিধাগুলো না হয় মানবিক দৃষ্টিতে অন্যদের দেয়া হোক।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো কথিত উচ্চস্তরের মানুষেরা নিজেদের বিশেষ ধরনের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে জীবনযাপন করছে (মুখে তারা যাই বলুক না কেন)। অন্যদিকে মানবিকতার নসিহত তারাই বেশি করে। মোটকথা ইনসাফটা আসলে আমরা বুঝিই না। ইনসাফের সাথে রয়েছে মানবিকতার গভীর সম্পর্ক। একটা থেকে আরেকটাকে বিভক্ত করা যায় না। বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে ইনসাফের আলোচনা সমাজে খুব কমই হয়ে থাকে। যা হয় বই-পুস্তক বা কোরআন-হাদিসে লিখিত বিষয়গুলো নসিহত বা ওয়াজের মত করে আমরা বলে থাকি। ওয়াজ-নসিহতে যা বলা হয় বাস্তবতার সাথে তা মিলিয়ে দেখলে আকাশ-জমিন ফারাক পাওয়া যাবে।

Mohammad Mozammel Hoque: আপনার হৃদয় ছোঁয়া মন্তব্যটা পড়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি। ধন্যবাদ।

লেখাটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

“মানবিক হতে পারা না পারা” শীষক র্পোস্টে একটি মন্তব্য

  1. আসসালামু আলাইকুম…….

    আপনি বলেছেন-
    “অধীনস্তদের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রদানে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, এমন কোনো ইসলামিস্ট এলিট পুরুষ বা নারীর সন্ধান আমি অদ্যাবধি পাই নাই। সত্যি বলছি। সর্বান্তকরণে বলছি, ইসলামের সাম্য ধারণাকে নিজের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিমণ্ডলে চর্চা করেন, এমন কোনো ইসলামী ব্যক্তিত্বের সাথে আজো আমার সাক্ষাত ঘটে নাই।”

    আপনার পর্যবেক্ষণ সঠিক! এলিট শ্রেণীতে এটা দূষ্প্রাপ্যই!

    তবে গ্রাম্য মানুষ/পরিবার এমন অনেক আছে !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *