নিঃস্বার্থ ভালোবাসা

ডুবে ছিলাম যখন

অন্তহীন ভালোবাসার স্বচ্ছ-শীতল জলে,

তখন বুঝি নাই তার মর্ম।

এখন অনুভব করি প্রতি পলে।

 

জীবনের এ সময়ে

সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো

নিঃস্বার্থ ভালোবাসা হতে

বঞ্চিত হওয়া।

যারা ভালোবাসে আমাকে

তারা, কোনো না কোনো ‘কারণে’

ভালোবাসে।

 

হ্যাঁ, বাবা-মায়ের তরফ থেকে

সন্তানের প্রতি ভালোবাসাই হলো

দুনিয়াতে একমাত্র

অকৃত্রিম নিঃশর্ত ভালোবাসা।

এমনকি,

বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসাও

‘ভালো বাবা-মা’ হওয়ার শর্তে,

সাপেক্ষ।

সময়ে তা, ঠিকই টের পাওয়া যায়।

দাম্পত্য সম্পর্ক তো

সুনির্দিষ্ট লেনদেনের ব্যাপার।

আদর্শের সম্পর্ক তো

আদর্শের মান দ্বারা শর্তায়িত।

অতএব, সীমিত।

 

যে সম্পর্কে কখনো কোনো শর্ত,

বা কোনো মানদণ্ড কাজ করে না,

একতরফা ও অন্ধ-ভালোবাসা

যে সম্পর্কের ভিত্তি ও সবকিছু,

তা-ই হলো

সত্যিকার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।

সন্তানের প্রতি

বাবা-মায়ের ভালোবাসা হলো

তেমনই ধরনের

এক নজিরবিহীন ভালোবাসা।

 

না বলা তেমন কষ্টের সময় যখন

অসহ্য ছুঁয়ে যায়,

সম্মুখীন হই যখন দুঃসহ সময়ের

প্রবল প্রতিকূলতার,

তখন,

বাবা-মায়ের কবরের পাশে

একাকী দাঁড়িয়ে কাঁদতে ইচ্ছা করে।

 

দেয়ার কথা ছিলো

অথচ পারিনি দিতে

প্রিয়জনদের ন্যায্য অধিকার,

এমন ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়ে

স্মরণ করি মাঝে মাঝে

শৈশব, কৈশোর আর প্রথম যৌবনের

সেই হারানো সময়কে, যখন

ছিলাম বাবা-মায়ের সাথে।

তখন, ভাবি নাই কখনো,

দিতে হবে তাদের…

যা কিছু আমার

কথা ছিল দেয়ার।

মনে হয়েছে বরং,

যেমন করে

দুনিয়ার তাবৎ সন্তানদের

মনে হয় এখনো,

নিজের অধিকারই যেন

মুখ্য বিষয়। পাওয়াটাই যেন

সন্তানের একপাক্ষিক অধিকার।

 

কোন বন্ধু পারে না শেষ পর্যন্ত

অপর বন্ধুকে নিঃশর্ত মেনে নিতে।

ভাইবোন সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য বটে,

সবচেয়ে নিকটের,

তাও নিঃসন্দেহ,

কিন্তু শর্তহীন নয়।

সন্তানেরাও সব সময় পারে না,

বাবা-মাকে নিঃশর্ত গ্রহণ করতে।

অথচ, সব বাবা-মাই

নিজ সন্তানদের ভালোবাসে,

আজীবন দিয়ে যায়

স্বীকৃতি, প্রাপ্তি কিংবা সদাচরণের

কোনো শর্ত ব্যতিরেকে।

 

নিদ্রাহীন এই রজনীতে,

সমস্ত দেহ-মন জুড়ে

স্নায়ুতন্ত্রের প্রতিটা গ্রন্থিতে,

নিঃশব্দ শব্দময় এই রাত্তিরে

অন্তরতম এই প্রার্থনা,

গ্রহণ করো,

বিশ্ব জাহানের প্রভু হে,

তোমার রহমতের ছায়ায়

আশ্রয় দান করো তাদের,

স্বীয় সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে

অনাবিল ভালোবাসার

নিবিড় আশ্রয়ে,

হৃদয়ের সবটুকু উষ্ণতা দিয়ে,

যেমন করে তারা

লালনপালন করেছেন আমাদের।

 

দশটা সন্তানের জন্ম দিয়েছেন যে মা,

সদাপরোপকারী প্রবল আত্মমর্যাদাসম্পন্ন

বিশ্বাসী সেই মানুষটিকে,

তুমি ক্ষমা না করে পারো না…!

এতগুলো ছেলেমেয়েকে লালনপালন আর

যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার কাজে,

যে বাবা তিলে তিলে ক্ষয় করেছেন

নিজের সব সামর্থ্যকে,

সদা সত্যবাদী, মানবিক হৃদয়ের,

আদর্শবোধ আর নীতির প্রশ্নে আপসহীন,

সেই বিশ্বাসী মানুষটিকে,

তুমি ক্ষমা না করে পারো না…!

 

তোমার একান্ত দয়া

আর ক্ষমাশীলতার মহোত্তম গুণে,

গ্রহণ করো তাদের সব সৎকর্ম,

মুছে দাও তাদের সব অন্যায়।

ওগো পরওয়ারদিগার,

বিশ্ব জাহানের প্রভু হে,

এ জীবনের মত পরজীবনেও তুমি

তাদের একমাত্র সহায়।

একমাত্র ভরসা।

রাব্বির হাম হুমা, কামা

রাব্বা ইয়ানি সগীরা…!

কবিতাটির ফেসবুক লিংক

[আমি যখন কিছু লিখি তখন একেবারে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে লিখি। মানুষ পড়বে, আমাকে বাহবা দিবে, পপুলার হবো– এমন কোনো চিন্তা আমার মধ্যে কাজ করে না। ভালো করে কথা বলতে পারে না, হতে পারে তোতলা কিংবা খানিকটা বাক-প্রতিবন্ধী, এমন কেউ যেমন করে অনুভবের বিস্ফোরনের মুখে হঠাৎ কিছু একটা বলে ফেলে, বা বলতে থাকে, আমার লেখালেখি ও কথাবার্তা অনেকটা সেরকম।

তারপরও দেখি অপ্রচলিত বাক্য বিন্যাসের এই এলোমেলো লেখাজোকা কারো কারো ভালো লাগে। জানি, মোটিভেশনাল স্পিকার হতে পারব না কখনো। আসলে এ ধরনের বকোয়াজ লোকদেরকে আমি অপছন্দ করি। তারপরও কিভাবে যেন দিন দিন সেরকম হয়ে যাচ্ছি। নিয়তি মানুষকে দিন দিন তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিয়ে যায়। ছিলাম এক রকম। হচ্ছি কেমন যেন ভিন্ন রকম।

যাহোক, নিচের এই লেখাটা লিখেছিলাম মাস তিনেক আগে। কিভাবে যেন গত দুদিন থেকে কাউকে কাউকে দেখছি, লেখাটা পড়ছেন। পছন্দ করছেন। তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। নিজের এ ধরনের ‘ব্যক্তিগত’ কোনো লেখা আমি জনসমক্ষে পড়ি না।

ব্যক্তিগতভাবে আমি খুব আবেগপ্রবণ। নিতান্তই অ-জরুরি ও নৈমত্তিক কোনো ‘সাংগঠনিক দায়িত্ব’ পালনের অন্ধ আবেগে মৃত্যুর আগে বাবার শয্যাপাশ হতে পালিয়ে এসেছিলাম, এই অপরাধবোধ আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। ভালো প্যারেন্ট হতে পারি নাই, এ আমার ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা। কিন্তু না চাইতেই হতে পেরেছি এক আদর্শ দম্পতির সবচেয়ে বেশি সুবিধাপ্রাপ্ত, সবচেয়ে বেশি সুস্থ ও অনেক ভালোভাবে গড়ে ওঠা সন্তান। এ আমার সৌভাগ্য।

১৮ মার্চ, ২০১৮]

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *