কেন লিখি, অথবা কেন এত কঠিন করে লিখি

আমার লেখালেখি তো মাত্র ২০১০ হতে শুরু। এর আগে যত্রতত্র অনেক বলাবলি করেছি। লিখিত ডকুমেন্টের সাপোর্ট ছাড়া দেখলাম কথাগুলো আলটিমেইটলি হারিয়ে যায়। তাই লিখছি।

সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করা হয় বলে কেউ কেউ মনে করে থাকবেন, আমি বুঝি আর দশজনের মতো ডায়েরি লেখার মতো করে লিখি। না। আমি যা কিছু লিখছি তা সব অন রেকর্ড হিসাবে লিখছি। ইচ্ছা আছে সব লেখা পুস্তক আকারে প্রকাশ করার। প্রকাশনা ব্যয় মেটানোর মতো সামর্থ্য নাই। এ ধরনের অপ্রচলিত কথাবার্তা ছাপানোর মতো প্রকাশক নাই। CSCS-কে একটা ব্র্যান্ড হিসাবে গড়ে তোলার ইচ্ছা। এসব কারণে হার্ডকপি পাবলিকেশনে এখনো যেতে পারি নাই। সংকল্পটা অবশ্য অটুট।

অনেকের অভিযোগ, আমার লেখা কঠিন। আমি নাকি কঠিন করে লিখি। যাহা কিছু রটে তাহা কিছু না কিছু বটে – এই প্রবাদ অনুসারে অভিযোগ অস্বীকার করার সুযোগ নাই। কথায় বলে, সহজ করে লেখা কঠিন, কঠিন করে লেখা সহজ। খুব সম্ভবত উদ্দীষ্ট পাঠকগোষ্ঠীর কাছে এখনো পৌঁছতে পারি নাই। যা কিছু নানাভাবে বুঝার মতো ব্যাপার তা সব একবার রিডিং পড়লেই পরিষ্কার বুঝা যাবে, এমন নয়। অনেকটা নতুন পাঠ্যবই হাতে পেয়ে ঠিকমতো বুঝতে না পারার মতো ব্যাপার। বিষয়ের ওপর আলোচনায় অংশগ্রহণের পরে বুঝা যায়, আগের বুঝায় ঘাটতি ছিলো।

বছর দুয়েকের মধ্যে মাঠে নামবো। গণহারে সেমিনার করে বেড়াবো। পথে ঘাটে হাটে মাঠে। ইনশাআল্লাহ! বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে।

লেখা বুঝতে না পারার সবচেয়ে বড় কারণ হতে পারে, বিষয়ের গভীরে না গিয়ে ভাসাভাসা ধারণা নিয়ে তুষ্ট থাকার মানসিকতা। সবাই সমাজ পরিবর্তন করতে চায়। অথচ, নিজের চিন্তাভাবনার সীমাবদ্ধতা দূরীকরণের আলোচনায় অনাগ্রহী। ভাবখানা এমন, যিনি যে দল বা ধারার সাথে আছেন তার প্রধান তাত্ত্বিকগণই সবকিছু বলে-লিখে গেছেন। সমস্যা যেন শুধু আমল বা বাস্তবায়নের। অথচ, সমাজ অনেক এগিয়েছে। গত একশ’ বছরে পৃথিবীতে যত পরিবর্তন হয়েছে তা মানব ইতিহাসে নজিরবিহীন। এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট নিয়ে কাজ করার জন্য আমি আগ্রহী।

মানুষ হিসাবে আমরা কোনো না কোনো ধারার সাথে থাকতে চাই। একা থাকার চেয়ে দল-সংশ্লিষ্ট থাকাকে আমি ভালো মনে করি। শর্ত হলো, নিজের যুক্তি, বুদ্ধি, বিবেক, বোধ ও বিবেচনাকে স্বচালিত ও স্বাধীন রাখতে হবে। অনুপযুক্ত কারো হাতে নিজেকে সোপর্দ করা যাবে না।

কিছু হাল্কা লেখালেখির পরে কেউ কেউ সে ধরনের capsule formula-তে লেখালেখি চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। আচ্ছা, পৃথিবীতে তেমন একটা কিছু করতে পেরেছে এমন কোনো আন্দোলন, নিজস্ব ধারার সাহিত্য ছাড়া কি সফল হয়েছে? এ ধরনের বৈপ্লবিক রচনার কোনোটাতে কি ‘ক্যাপসুল ফর্মূলা’ অনুসরণ করা হয়েছে? মাঝে মাঝে সরাসরি ইনজেকশান দিতে হয়। না হয়, কষ্ট করে বড়সড় সব বড়ি গিলতে হয়। অথবা কাটাছেঁড়া করে জোড়া দিতে হয়। ভবিষ্যত কাজের রূপরেখা বিষয়ক লেখাগুলোতে সোজা চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হয়, এভাবে হবে না, ওভাবে করতে হবে। সবাই যে দেখবে, তা নয়। সবাই তত্ত্বজ্ঞানী হয় না। দরকারও নাই। কেউ কেউ বুঝলেই হলো। বুদ্ধিবৃত্তিক গণপরিমণ্ডলে সঠিক চিন্তাটা হাজির থাকলেই হলো।

একজনও যদি ঋদ্ধ পাঠক পাওয়া যায়, তাহলে লেখা সফল। এমনটাই মনে করি। পপুলিস্ট নই। এমন ছন্নছাড়া লেখকের ব্যর্থতা হিসাব করবে, এমন সাধ্য কার? লোকদেরকে উদ্ধার করবো, এমন ভাব থেকে কখনো লিখি না। যেমন করে পূর্ণ গর্ভবতী কোনো নারী, মাতৃত্ব, সন্তান ইত্যাদি মহান চিন্তার পরিবর্তে আপাতত অসহ্য প্রসববেদনা হতে বাঁচার চেষ্টা করে, ঠিক সেভাবেই চিন্তাগুলোকে অক্ষরের মাঝে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করি। সোজা কথায়, না লিখে পারি না, তাই লিখি। কে পড়লো, তা নিয়ে ততটা ভাবি না। অন্তত লেখার সময়ে ভাবি, লেখাটা শেষ করতে পারলেই যেন বাঁচি।

এবার ঘুমাতে যাই। শুভ রাত্রি।

ফেসবুকে প্রদত্ত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Manzur Murshed: যদি একজন ঋদ্ধ পাঠক পাওয়া যায় তাহলে লেখা সফল। সুন্দর বলেছেন স্যার। কেমন জানি আপনার লেখা খুব ভালো লাগে। আপনার উন্মুক্ত অথচ বাস্তবধর্মী চিন্তাধারাগুলো ভালো লাগে।

Isanur Rahman: আপনার লেখা পড়ে তো আমি খুবই আরাম পাই। একেবারে ঝরঝরে, ক্লিয়ার ক্রিস্টাল, সাধারনের ভাষায় তাত্ত্বিক কথা। মনে হয় যেন হুমায়ুন আহমেদের লেখা কোন দর্শনের বই পড়ছি। লেখার ভিতর তাত্ত্বিক ফিলোসফি

Mazharul Islam: বলা হয়ে থাকে, জগতের মাত্র শতকরা দশজন চিন্তাশীল, বাকিরা ‘অনুসরণ’ করে মাত্র, চিন্তার গভীরে প্রবেশ করতে পারে না। কুরআনেও অনেক আয়াতে এর ইংগিত আছে। সুতরাং আপনি লিখে যান, এ লেখা সর্বসাধারণের জন্য বোধগম্য হতেই হবে এমন তো নয়। (সর্বসাধারণের জন্য বোধগম্য টপিক নিয়ে লেখার ও বলার জন্য অগণিত লেখক-কথক আছেন)

Mohammad Mozammel Hoque: কঠিন কথা সহজ করে বলা, আসলেই কঠিন। কঠিন কথা কঠিন করে বলা, সহজ।

Md Omar Faruq: বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট আলোচনায় কম শব্দ ব্যয়ে মৌলিক তত্ত্ব ও তথ্য তুলে আনলে পাঠকের সুবিধা হয় তার পাঠের মূল জিস্ট খুঁজে পেতে।

Mohammad Mozammel Hoque: রাইট। সমস্যা হলো, এই যে আপনি লিখলেন “তত্ত্ব ও তথ‍্য”। তত্ত্ব দিয়ে তথ্য হয় না। আবার, তথ্য দিয়ে তত্ত্ব হয় না। অথচ দুইটা শব্দ সদৃশ। কারো কাছে redundancy মনে হতে পারে। যা হোক, পরামর্শের জন্য ধন্যবাদ।

Sohrab Hossain Rokon: স্যার, আপনার ডিপার্টমেন্টের ছাত্র ছিলাম, তাই বলছি আপনার লিখাগুলো এবং পড়ানোর ভাষাগুলোও আসলেই কিছুটা কঠিন। আপনার জ্ঞানের ভান্ডার অনেক তথ্যবহুল কোনো সন্দেহ নাই, কিন্তু বেশিরভাগ পাঠক এবং শ্রোতারাই সেই পাঠ উদ্ধার করতে পারে না বলে আমার ধারণা।

দার্শনিক টার্মগুলো নিয়ে আমার দেখা মনে “পিনাকি ভট্রাচার্য” দর্শন ব্যাকগ্রাউন্ড্রের না হয়েও খুব সুন্দর বলেন।

আমার কথায় কস্ট পেয়ে থাকলে দু:খিত। ৮-১০ জন সাধারণ পাঠক বা শ্রোতার মতো আমি সহজে বুঝতে পারি এমন লেখক, বক্তাকেই ভালো লাগে বেশি। ধন্যবাদ স্যার

Mohammad Mozammel Hoque: It’s OK. এক একজনের এক একটা প‍্যাটার্ন।

লেখাটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *