কেন চাই কনসেপ্ট গ্রুপ

ইসলামী সমাজ বলতে আমরা যা বুঝি তার নিম্নোক্ত দিকসমূহ (আসপেক্টস) থাকতে হবে:

(১) আধ্যাত্মিক
(২) সামাজিক
(৩) বুদ্ধিবৃত্তিক
(৪) সাংস্কৃতিক
(৫) অর্থনৈতিক
(৬) রাজনৈতিক ও
(৭) সামরিক।

এই সাত পদ্ধতি বা ধারায় বিশ্বে অতীতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজ হয়েছে, বর্তমানে হচ্ছে। ভবিষ্যতেও এইসব দিক নিয়েই ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজ হতে পারে। এগুলো একাধারে ইসলাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজের পদ্ধতি এবং ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দিক। এগুলো পরস্পরের পরিপূরক।

এই পদ্ধতিসমূহের শুধুমাত্র যে কোনো একটি বা দুটির সমন্বয়ে কাজ শুরু করা ও অনেকটা এগিয়ে নেয়া সম্ভব হলেও এক পর্যায়ে প্রাথমিকভাবে বাদ পড়া বা বাদ দেয়া দিকসমূহ নিয়ে কাজ শুরু করতেই হবে। এই ধারা বা বৈশিষ্ট্যগুলোর কোনো একটিকেও যদি স্থায়ীভাবে বাদ দেয়া বা স্থগিত রাখা হয় তাহলে সংশ্লিষ্ট সংগঠন বা সমাজে মারাত্মক আত্মবিরোধ ও একদেশদর্শীতার সৃষ্টি হবে। এবার আসুন, বিদ্যমান পরিস্থিতির আলোকে সম্ভাব্য কনসেপ্ট গ্রুপ যেসব বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে কাজ করবে তা নির্ণয় করার চেষ্টা করি –

সামরিক ধারা বা এপ্রোচে কাজ করার প্রসংগ মূলত ইসলামী রাষ্ট্রের অনুষঙ্গ। অতএব, এ ধারায় কাজ করার সুযোগ বা প্রয়োজনীয়তা আমাদের অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশে নাই। আধ্যাত্মিক ধারায় কাজের মাধ্যমে এ দেশে ইসলাম প্রচারিত হয়েছে। আধ্যাত্মিক ধারার পাশাপাশি অন্যান্য ধারা বা দিকসমূহে উল্লেখযোগ্য কাজ না হওয়ার কারণে ‘মাইনরিটি ইসলাম ইন দ্য মুসলিম মেজরিটি বাংলাদেশে’ সেক্যুলারিজমের ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে। উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিবর্গও ইসলামকে জীবনাদর্শ হিসাবে গ্রহণ না করে নিছক (শ্রেষ্ঠ) ধর্ম হিসাবে বিবেচনা করে। তাছাড়া আধ্যাত্মিকতা মূলত ব্যক্তিগত পর্যায়েই চর্চার বিষয়।

জামায়াতে ইসলামী দাবি করে, ইসলামে রাজনীতি আছে, ইসলামী হতে হলে রাজনৈতিকও হতে হয় – এটি বাংলাদেশের আলেম সমাজকে বুঝাতে তাঁদের পঞ্চাশ বছর লেগেছে। তাঁদের এ দাবি যে সঠিক তার প্রমাণ হলো এখন তাবলীগ জামাত ছাড়া বাংলাদেশের সব ইসলামী দল ও প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক শাখা আছে। দুঃখজনক ব্যাপার হলো পাগলকে ভালো করতে গিয়ে ভালো মানুষ পাগল হয়ে যাওয়ার মতো পরিপূর্ণ ইসলামী সমাজ আন্দোলন হিসাবে যাত্রা করা জামায়াতে ইসলামী এখন এমনকি তাঁদের নিজ দাবি মোতাবেকই একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, যাদের আদর্শিক পছন্দ হচ্ছে ইসলাম। জামায়াতসহ ইসলামী রাজনৈতিক দল ও সংগঠনসমূহ সমান্তরাল ধারায় অপরাপর প্রয়োজনীয় ধারা বা দিকসমূহে কাজ না করা বা বিকাশ লাভ না করার ফলশ্রুতিতে এক ধরনের অনাকাঙ্খিত ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়েছে।

অর্থনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের বিষয় মূলত ব্যক্তিনির্ভর। ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে এ বিষয়ে সামষ্টিক ব্যবস্থাপনার সুযোগ সৃষ্টি হবে। ইসলামের অর্থনৈতিক যোগ্যতাকে সফল উদ্যোগ ও উদাহরণ সৃষ্টি করেই সাধারণ জনগণকে বুঝাতে হবে, আশ্বস্ত করতে হবে। এ দায়িত্ব ইসলামপন্থীদের। এ কথা সত্য। সাথে সাথে এটিও সমভাবে সত্য, এ দায়িত্ব ইসলামপন্থীদের ব্যক্তিগত দায়িত্ব। ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠাকামী সংগঠন যদি ব্যবসায়িক উদ্যোগ গ্রহণ করে তাহলে তা সংগঠনটির বিকাশ ও পরিচালনায় বিরোধ সৃষ্টি ও বাধার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

আমাদের বিবেচনার জন্য অবশিষ্ট থাকলো সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা। কনসেপ্ট গ্রুপ বুদ্ধিবৃত্তিক ধারায় কাজ করবে। ইসলাম সম্পর্কে বিদ্যমান সকল ভুল ধারণার অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে, বিশেষ করে একবিংশ শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে ইসলামের জাগতিক যোগ্যতাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কাজ করবে। প্রচলিত পন্থায় একাডেমিক ও গণ-সেমিনার, স্টাডি সার্কেল আয়োজন করা হবে। কনসেপ্ট গ্রুপের থাকবে ব্যাপকভিত্তিক প্রকাশনা সংস্থা ও গণমাধ্যম। দেশব্যাপী পাঠাগার ও আর্কাইভ প্রতিষ্ঠাকে আন্দোলন হিসাবে গড়ে তোলার পাশাপাশি নন-ট্র্যাডিশনাল এপ্রোচে (এনটিএ) ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। এই গ্রুপের কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও কর্মসূচি থাকবে না। এটি হবে অনেকটাই শিথিল কাঠামোর। ইন্টারেক্টিভ ইন্টেলেকচুয়্যালিটি হবে এর কার্যনিয়ামক।

কনসেপ্ট গ্রুপের শাখা বা সহযোগী হিসাবে অথবা স্বতন্ত্র গঠন কাঠামো নিয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধারায় দুটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। সামাজিক ধারায় কাজ করার জন্য Education, Tolerance, Respect, Compassion এই চারটি বিষয়কে সামনে নিয়ে ETRC নামে কোনো সংগঠন হতে পারে। প্রচলিত ইসলামী সংগঠনসমূহের সাংগঠনিক এককেন্দ্রিকতাকে পরিহার করে শুধুমাত্র আদর্শিক সাযুজ্যতাকেই যথেষ্ট মনে করতে হবে। সিঙ্গেল জায়ান্ট ট্রি মডেলের পরিবর্তে ওয়াইড গার্ডেন মডেলকে বিবেচনায় রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, ক্রমধারা এবং বৈচিত্রময়তাই একবিংশ শতাব্দীতে সময়ের দাবি। অতএব, একটি, দুটি বা কয়েকটি নয়; প্রয়োজনে দশজন মিলে বিশটা সংগঠন কায়েম করা ও চালিয়ে নেয়ার কথা ভাবতে হবে। একই লোকেরা বিভিন্ন ফোরাম, ভিন্ন ভিন্ন পরিচয় ও ভাবমূর্তি নিয়ে কাজ করবে। যে কোনো পর্যায়ে কোনো সংগঠন হবে কতিপয় সংগঠনের সংস্থা।

সাংস্কৃতিক ধারায় যারা কাজ করবে তাঁরা ইসলামের মৌলিক ভাবধারা ও আবশ্যকীয় ব্যক্তিগত ইবাদত (যেমন– নামাজ) ছাড়া অন্য কোনো নিয়ন্ত্রণের অধীন থাকবে না। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় যেমন সাতার কাটা যায় না, তেমনি অসাংস্কৃতিক ব্যক্তির নেতৃত্বের অধীনে কখনো শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ধারা সৃষ্টি হওয়া এবং সেটি টিকে থাকা অসম্ভব। চোখ বাঁধা অবস্থায় মার্শাল আর্টিস্টরা যেভাবে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়কে কাজে লাগিয়ে লড়াই করে, বর্তমান সময়ের সংস্কৃতি কর্মীদেরকেও তেমনি শাণিত বিবেক ও বিবেচনাবোধের আলোকবর্তিকা নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। যুদ্ধের ময়দানে যেমন মারো অথবা মর পরিস্থিতিকে স্মরণ করে প্রাণপণ লড়াই করে যেতে হয়, সংস্কৃতি কর্মীদেরও সেভাবে অদম্য মনোবল নিয়ে কাজ করতে হবে। ধর্মবাদীরা কী বলবে – তা নিয়ে পেরেশান হওয়া যাবে না। দুঃখজনক হলেও সত্য, ইসলামী আন্দোলনপন্থীদেরও বৃহত্তর অংশ, সংস্কৃতি, বিশেষ করে বিনোদন-সংস্কৃতির ব্যাপারে (রক্ষণশীল) ধর্মবাদী।

ব্যক্তিগতভাবে শুভানুধ্যায়ীরা কনসেপ্ট গ্রুপের রূপরেখা দেয়ার জন্য প্রায়শ বলেন। তাই এই লেখা। এটি একটি প্রস্তাবনা ও আহ্বান। যেহেতু ইসলামী আন্দোলনের প্রচলিত ধারা নিজ থেকে ও প্রয়োজনীয় মাত্রায় সংশোধন হবে না তাই যারা ‘চেঞ্জ ফ্রম উইদিন’ ফর্মূলা নিয়ে আছেন, তাঁরা নিছক দায়দায়িত্ব বা ঝুঁকি এড়িয়ে চলছেন অথবা ভুলক্রমে নিছক সময় নষ্ট করছেন বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। এ মুহূর্তে পরিস্থিতিগত দিক থেকে প্রতিকূলতা ও প্রয়োজনীয় মানের নেতৃত্বের অভাবে বিকল্প কোনো প্লাটফরম গঠনও সম্ভব নয়। অথচ, অন্যরা কী করে; দেখি না কী হয়; সময় আসুক, পরে দেখা যাবে – এসব ধ্যানধারণারও কোনো সুযোগ নাই। হকের দাওয়াত, ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের প্রতিরোধের জন্য সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার কোনো বিরতি নাই, বিকল্প নাই। অনুকূল সময়ের জন্য অপেক্ষার কোনো সুযোগ নাই। দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম হতে আমরা বিরত থাকতে পারি না। এ জন্য যে ‘নো অল্টারনেটিভ’ তত্ত্ব দেয়া হয়, তা শুধুমাত্র অক্ষম, দুর্বল ও অবুঝের কাছেই গ্রহণযোগ্য পন্থা হতে পারে।

এরিস্টটলেরর ভাষায়, what we have to learn to do, we learn by doing। তাই আল্টিমেইটলি কী হবে তা নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট না করে নিজ নিজ অবস্থান ও সংগঠন-সংশ্লিষ্টতাকে বজায় রেখেই আসুন চিন্তার পরিশুদ্ধি ও সবলতা সৃষ্টির জন্য কনসেপ্ট গ্রুপ গঠন করে কাজ করতে থাকি। সময়ের পরিক্রমায় এর গতি কোনদিকে যাবে তা ভবিষ্যতই বলে দিবে। আল্লাহ হাফেজ।

মূল পোস্টের ব্যাকআপ লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *