কেন আমি কোনো প্রকার রাজনৈতিক তৎপরতায় আর অংশগ্রহণ করবো না: কৈফিয়ত ও ভবিষ্যত চিন্তা

এতো বছর সব নির্বাচনে ভোট দিয়ে আসছি। ভাবছি, এখন থেকে প্রচলিত ধারার এসব নির্বাচনে আর অংশ নিবো না। এটি রাজনীতির ব্যাপারে বীতশ্রদ্ধ হয়ে ‘ব্যাক টু দ্য প্যভেলিয়ন’ টাইপের কিছু নয়। বরং রাজনীতিকে মূল্যবোধনির্ভর হিসাবে গড়ে তোলার জন্য আমার কয়েক দশকের সম্পৃক্ততার ব্যাপারে ব্যক্তিগত মূল্যায়ন-উপলব্ধি। ব্যর্থতাবোধ। আগামী ১লা এপ্রিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নির্বাচন। রেজাল্ট গ্রেডের চতুর্থ ধাপ তথা B+ ওয়ালাদের পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় নিয়োগদানের বদৌলতে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল এই নির্বাচনে নিশ্চিতভাবে জয়লাভ করবে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে টাইয়ের নট লাগাতে লাগাতে উনারা ছুটে যাবেন। সৌজন্য সাক্ষাতে। সারা বছর রাজনৈতিক বিবৃতি ও মানববন্ধন ইত্যাদি করে কাটাবেন, ধারণা করি। যেমনটা করেছেন বিদায়ী সমিতি। শিক্ষক সমিতি লাউঞ্জকে রিনোভেট করা ছাড়া বিদায়ী কার্যকরী সংসদের কোনো ব্যতিক্রমী তৎপরতা চোখে পড়েনি। যারা সংগ্রামী বিরোধীদলে বসে ভবিষ্যতে দেখিয়ে দেয়ার স্বপ্নে-আক্রোশে উড়ছেন-ফুসছেন, ক্ষমতা পেলে উনারা ভিন্ন ধরনের বা ব্যতিক্রমী কোনো আমলনামা গড়ে না তুলে বরাবরের মতো করে যার যার ‘ক্র্যাডেনশিয়াল বাড়ানোর’ কাজে মনোযোগী হবেন, তা হলফ করে বলতে পারি।

এতএব, এসব বাগাড়ম্বর কেন? শিক্ষক সমিতি কি কখনোই সত্যিকারের ‘বার্গেইনিং এজেন্টের’ ভূমিকা পালন করেছে? সাম্প্রতিক থেকে অতীতের সব উদাহরণ বরং এই যে, শিক্ষক সমিতির গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করতে পারা মানে লটারি জিতার মতো অলমোস্ট বিনাশ্রমে প্রশাসনের কোনো না কোনো বড় ‘ক্ষমতার ভাগ’ পেয়ে যাওয়া। রাজনীতির দরকার আছে বটে। কিন্তু দেশের এসব তথাকথিত সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনীতির নামে যে নীতিহীনতার মহোৎসব চলছে, তাতে অংশগ্রহণ করে বৈধতা দেয়ার জন্য মন কোনোমতেই সায় দিচ্ছে না। ‘বিজয় নিশ্চিত প্যানেলের’ প্রার্থী এক বড় ভাই ভোট চাইতে ফোন করার সুবাদে আমি উনাকে ওয়াদা করিয়েছি– চবির ভর্তি পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া নিয়ে সেমিনার ইত্যাদির মাধ্যমে মতামত গঠনে উনি ভূমিকা রাখবেন। ভেবেছিলাম, অন্তত তাকে ভোট দেয়ার জন্য ইলেকশানে পার্টিসিপেট করবো। পরে ভাবলাম, তাতে যে দলকে আমি নিকট-অতীতে নেতৃত্ব দিয়েছি, তার সদস্যরা এটিকে ফ্লোর ক্রসিং মনে করবেন।

আমি মূলত পুরো ব্যবস্থাটির ওপরই ত্যক্তবিরক্ত। মনে হচ্ছে, রাজনীতি আমার জন্য নয়। অথবা, যথেষ্ট হয়েছে। আর নয়। এখন আমি স্বাধীনভাবে কাজ করছি। ২০০১ সাল হতে Centre for Social & Cultural Studies (CSCS)-এর ব্যানারে সেমিনার হতে শুরু করে ফিল্ম শো পর্যন্ত, বহু কিছু করেছি। গত দু’বছর হতে সিএসসিএসকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার চেষ্টা করছি। স্ত্রীর বেতনে সংসার চলে। আমার বেতনের বলা যায় প্রায় পুরোটাই এখন ‘সমাজ ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন কেন্দ্র’ পরিচালনায় ব্যয় করছি। কোনো কিছু করতে হলে ফান্ড জোগাড়ের চিন্তাকে যারা ফার্স্ট এন্ড ফোরমোস্ট আর্জেন্ট হিসাবে বিবেচনা করেন, সেই শ্রদ্ধেয় সহকর্মীদের কাছে এটি অচিন্তনীয় বটে!

সিএসসিএসকে একটা থিংক-ট্যাংক হিসাবে ব্যাকে রেখে বছর কয়েকের মধ্যে একটি মধ্যপন্থী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে নামবো, ইনশাআল্লাহ। বিকেন্দ্রীকৃত তথা গুচ্ছপদ্ধতির সংগঠন-কাঠামোর এই সোশ্যাল মুভমেন্টই এখন আমার স্বপ্ন, একমাত্র চিন্তা। ভোট না দিলে, দল না করলে, চাকুরী তো থাকবে, আশা করি। না থাকলেওবা কী করা? এভাবে তো চলতে পারে না..! মুক্তির জন্য চাই, সমাজ বিপ্লব। রাজনীতি সেখানে গৌণ। মতাদর্শিক চর্চাই মুখ্য।

জানার যে অদম্য আগ্রহে বিজ্ঞানের ভালো ছাত্র হয়েও পরিবারের মতামতের বিপরীতে গিয়ে ফিলোসফিতে ভর্তি হয়েছিলাম, আদর্শের যে প্রেরণায় ‘ইসলামী আন্দোলনে’ শরীক হয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজেকে ডেডিকেট করেছিলাম, সেই একই প্রেরণায় এখন নতুন করে কিছু করতে চাই। অগ্রণী ও আস্থাযোগ্য কোনো উদ্যোগ বা কাউকে না পেয়ে জীবনের এই পড়ন্তবেলায় দায়শোধের জন্যই এই অনেস্ট কনফেশান, আর্নেস্ট ডিটারমিনেশান। চাই, অন্তত আগামী প্রজন্মের জন্য হলেও একটি সুস্থধারা গড়ে উঠুক।

সমস্যা হলো, বাম-ডান নির্বিশেষে অধিকাংশ সহকর্মীর কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকুরী হলো একটা পেশামাত্র। নৈতিকতা ইত্যাদি তাঁদের কাছে কথার-কথা রেটরিক মাত্র। যেন collective rationality’র নামে সুবিধাবাদিতা জায়েয বটে! Personal morality তথা পরিণতিমুক্ত নীতিবোধের কারণে উনারা আমাকে বেকুব মনে করে। আবেগী মনে করে। এটি আমাকে ততটা কষ্ট দেয় না। যখন এমন ধরনের সুবিধাবাদী মনমানসিকতার লোকেরা যখন সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়, নানা মতাদর্শের নামাবলী গায়ে দিয়ে দেশ ও জাতির চালিকাকেন্দ্রগুলোকে ভাগাভাগি করে নেয় তখন সত্যিই খুব কষ্ট লাগে। পরাজিত বোধ করি। তাই ভাবছি যারা কোনো না কোনো ধারার সাথে সম্পৃক্ত, তাদেরকে সসম্মানে এড়িয়ে গিয়ে তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ ও গোবেচারা, সমাজের মূলধারার লোকদেরকে, বিশেষ করে তরুণদেরকে নিয়ে নানা মাত্রায় কাজ করবো। নিশ্চিত জানি, একদিন কাদম্বিনি মরিয়াই প্রমাণ করিবে, সে আগে মরে নাই…!

পোস্টটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *