কেন আমি জামায়াতের সংস্কারবাদী নই

(১) কর্মবিমুখ বাকপটুতা
(২) ইবাদতের বিষয়ে শুদ্ধবাদিতা
(৩) মজহারপন্থা
(৪) সংস্কারের ক্ষেত্র ও অগ্রাধিকার নির্ণয়ে বিভ্রান্তি
(৫) সামগ্রিকতার ভুল আন্ডারস্ট্যান্ডিং
(৬) এস্টাবলিশমেন্ট প্রবলেম

*****

এই কৈফিয়তের কারণ

বিগত তিন দশক ধরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি জামায়াত-শিবিরের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি হিসাবে একজন পরিচিত ব্যক্তি। একনিষ্ঠভাবে ‘সাংগঠনিক কাজ’ করার পাশাপাশি ছাত্রজীবন হতে আমি বুদ্ধিবৃত্তি চর্চা বলতে যা বুঝায় তার সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। তাই জামায়াতের সংস্কারপন্থা টাইপের কিছুতে আমার অগ্রগণ্য ভূমিকা থাকার কথা ছিলো। ২০০৯-১০ হতে সংস্কারবাদী হিসাবে পরিচিত দেশ-বিদেশে অবস্থানরত বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত জামায়াত নেতা-কর্মীদের সাথে আমার এক ধরনের যোগাযোগ গড়ে উঠে।

চলমান সরকারী দমন-পীড়নের মুখে জামায়াত বা যে কোনো সংগঠনের কম-বেশি কোনঠাসা হওয়াই ছিলো স্বাভাবিক। অথচ, বহুস্তরের নেতৃত্ব ও পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থাকার গালগল্পকে মিথ্যা প্রমাণ করে চলমান দমন অভিযানের শুরুতেই জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামো কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। তাছাড়া দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী পরও ‘যোগ্য’ জনশক্তি, বুদ্ধিবৃত্তিক মান ও গণভিত্তির লক্ষ্য অর্জিত না হওয়াও হতাশাজনক ব্যাপার। কেন এমন হলো? কী করা যায়? ইত্যাদি নানা বিষয়ের ক্ষেত্র ও মাত্রা বিবেচনায় আমার স্বভাবতই জামায়াতের সংস্কারবাদী হওয়ার কথা ছিলো।

আমার স্বতন্ত্র ধারায় কাজ শুরু করা

বিগত কয়েক বছর হতে, অধিকতর সুনির্দিষ্ট করে বললে ২০১৩ সাল হতে আমার জামায়াত-পরিচয়কে পাশ কাটিয়ে (disown) ইসলামী আদর্শের আওতায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠনের রূপরেখা নির্মাণের কাজ শুরু করি। যারা আমার জীবনের এই নতুন অধ্যায় সম্পর্কে জানেন না, বা জানলেও স্বতন্ত্র অবস্থান হতে কাজ করাটাকে আমার স্বভাবসুলভ সরলতা বা আবেগপ্রবণতার কারণে অসম্ভব মনে করেন, কিংবা একে কৌশলমাত্র মনে করেন তারা আমাকে জামায়াত ছাড়া ভাবতে পারেন না। অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বড়জোর তারা আমাকে জামায়াতের সংস্কারবাদীদের মধ্যে গণ্য করেন। এই ধারণাটি ভুল। না, আমি জামায়াতের সংগঠনবাদী বা সংস্কারবাদী –কোনো ধারার সাথে একমত নই।

এ দেশের মানুষ সাধারণত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন বিশেষ সম্পর্কে হুইমজিক্যালি কিছু গড়পরতা ধারণা পোষণ করে। এটি তাদের নন-একাডেমিক ও ওভার-পলিটিসাইজড মন-মানসিকতার কারণে হয়ে থাকে। আমার সম্পাদিত ‘কামারুজ্জামানের চিঠি এবং জামায়াতের সংস্কার প্রসঙ্গ’ শীর্ষক একটা বই গত বছর সিএসসিএস পাবলিকেশন হতে প্রকাশিত হয়। এতে অনেকে ধরে নিয়েছেন, আমি আসলে জামায়াতের সংস্কারবাদীদেরই একজন। অথচ এই সংকলনে সংস্কার নিয়ে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের মধ্যে যে আভ্যন্তরীণ বিরোধ, তার একটি পক্ষপাতহীন ও ধারাবাহিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে মাত্র। শুধুমাত্র আগ্রহী ও গবেষকদের সুবিধার্থে এটি সংকলন করা হয়েছে। ব্যাপারটি এর বেশি কিছু নয়।

জামায়াত সংস্কার নিয়ে আমার ফোর পয়েন্টস

২০১০ সাল হতে আমি ব্লগ লিখে আসছি। তখন থেকেই প্রসঙ্গক্রমে জামায়াতের বিষয়ে লেখালেখি করছি। জামায়াতের সংস্কার প্রসংগ আসলেই আমি ‘ফোর পয়েন্টস’ হিসাবে এই কথাগুলো সব সময়েই বলেছি:

(১) জামায়াত কখনো কোনো মৌলিক সংস্কারকে গ্রহণ করবে না। অথচ

(২) জামায়াতের বিকল্প কিছু করাটাও নানা কারণে সম্ভব নয়।

(৩) ইসলামকে ‘ইসলামী আন্দোলন’ হিসাবে যারা বুঝেছে তাদের পক্ষে কিছু না করে বসে থাকাও অসম্ভব। অতএব

(৪) প্রত্যেকেরই উচিত নিজ নিজ ক্ষেত্র ও পরিসরে সাধ্য মোতাবেক কিছু না কিছু কাজ শুরু করা। বিশেষ করে কনসেপ্ট বিল্ডআপের কাজ করে যাওয়া। শেষ পর্যন্ত জামায়াত সংশোধন হবে, নাকি নতুন কোনো ধারা তৈরি হবে, নাকি উভয়টাই ঘটবে – তা কেবলমাত্র ভবিষ্যতই বলে দিবে।

আমার বর্তমান কাজের উদ্দীষ্ট জনশক্তি কারা?

অতএব, দেখা যাচ্ছে আমি কখনোই নিজেকে জামায়াতের সংস্কারবাদী হিসাবে মনে করি নাই। গোড়া থেকেই অর্থাৎ তাত্ত্বিক ভিত্তির পুনর্গঠন হতেই কাজ করতে হবে – এটি আমি বরাবরই বিশ্বাস করেছি। সে জন্য জামায়াত শুধু নয়, যারা কোনো না কোনোভাবে কোনো সংগঠন ও সাংগঠনিক ব্যবস্থার সাথে জড়িত তাদেরকে উদ্দীষ্ট জনশক্তি হিসাবে বিবেচনা না করে আপাতদৃষ্টিতে নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা এ দেশের ১৫% লোককে আমি টার্গেট করে কাজ শুরু করেছি। বিশেষ করে এই শতকরা পনের ভাগের মধ্যকার তরুণ ছাত্র-ছাত্রীদেরকে অন্য যে কোনো জনগোষ্ঠীর তুলনায় অধিকতর সম্ভাবনাময় হিসাবে গুরুত্ব দিয়ে আসছি।

এই ইয়াং গ্রুপকে প্রায়োরিটি দিতে গিয়ে, কনভিন্স করতে গিয়ে প্রসংগক্রমে অপরাপর ইসলামপন্থীদের সাথে এই নতুন ধরনের কাজের পার্থক্য নিয়ে কথা বলতে হয়। তারই অংশ হিসাবে ‘কেন আমি জামায়াতের সংস্কারবাদী নই’ – তা নিয়ে এই নোট।

জামায়াতের সংস্কারবাদীদের ব্যাপারে আমার আপত্তির বিষয়সমূহ

জামায়াতের সংস্কারবাদীদের যেসব কমন বৈশিষ্ট্যকে আমি কোনোক্রমেই সঠিক মনে করি না তার মধ্যে আছে:

(১) কর্ম তৎপরতার দিক থেকে তারা সমালোচনায় যত পটু বাস্তবে লেগে থেকে গঠনমূলক কিছু করার ব্যাপারে তারা ততটাই বিমুখ।

(২) দ্বীনি তথা ধর্মীয় দিক থেকে তারা কম-বেশি শুদ্ধতাবাদী (puritanic) যা বাহ্যত আহলে হাদীস ও সালাফি পন্থার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

(৩) বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ‘সহজিয়া-সাম্যবাদী’ ফরহাদ মজহারের দ্বারা প্রভাবিত।

(৪) জামায়াতের সংস্কারবাদীরা মনে করে জামায়াতের যত সমস্যা তা মূলত পরিচালনাগত সমস্যা (operative or procedural problem)।

(৫) রাজনৈতিক সংস্কার তথা রাজনীতিই তাদের উক্ত বা অনুক্ত লক্ষ্য।

(৬) টাকা-পয়সার দিক থেকে তারা তারিক রমাদানের ভাষায় ‘হালাল ক্যপিটালিজমে’র একনিষ্ঠ অনুরক্ত, ভক্ত ও অনুসারী।

এ সব পয়েন্টের ওপর আমি সংক্ষেপে কিছু বলার চেষ্টা করবো।

(১) কর্মবিমুখ বাকপটুতা

জামায়াতের সংস্কারবাদীদেরকে যদি জামায়াতের কী কী ভুল ও সমস্যা রয়েছে তা সম্পর্কে বলতে দেয়া হয় তাহলে মাশাআল্লাহ তারা সুপার-ডুপার-হাইপার একটিভ হয়ে যাবেন। জামায়াতকে তুলাধুনা করতে করতে তাদের দিনরাত পার হয়ে যাবে। এ কাজে তাদের কোনো ক্লান্তি নাই। এমনকি, বলা যায়, তাদের কোনো লজ্জা-শরমও নাই। নিজ নিজ সাংগঠনিক জীবনের কতো সব কৃতিত্ব, তদীয় দায়িত্বশীলদের নিয়ে তাদের যত সব আপত্তি ইত্যাদি নিয়ে কথা বলতে বলতে তাদের মুখে যেন খৈ ফোটে …!

নেতা-কর্মীদের নিয়েই সংগঠন

জামায়াত তথা কোনো সংগঠন ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা আসমান হতে নাযিল হয় না। জমি ফুঁড়েও উঠে না। নেতা-কর্মীদের নিয়েই সংগঠন। অতএব জামায়াতের যা ভালোমন্দ তার কৃতিত্ব ও দায়দায়িত্ব আনুপাতিক হারে এর নেতা-কর্মীদের ওপরও বর্তায়। জামায়াতের যেসব ভুল তার দায় বহন করতে প্রস্তুত না থাকলেও সে সব ভুল হতে পরিত্রাণ লাভের জন্য যা করণীয় তার একটা আনুপাতিক অংশ তো সংস্কারবাদী-সংগঠনবাদী নির্বিশেষে প্রত্যেকের ওপরই বর্তায়। তাই না? সংস্কারবাদীদেরকে দেখেছি, তারা দোষারোপ চর্চায় যতটা ত্বড়িৎকর্মা ও ক্লান্তিহীন, নিজ নিজ ন্যূনতম দায়িত্ব স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালনের ব্যাপারে ততটাই অনিচ্ছুক ও পলায়নপর।

সংস্কারবাদী ফাঁকিবাজদের অজুহাতের শেষ নাই

কিছু করার কথা বললে তারা কৌশল হিসাবে নিজেকে হেয় করতেও পিছপা হন না। এ ধরনের লোকেরা আমার সাথে এনগেজ হলে এক পর্যায়ে বলে বসেন, “আপনি পারেন। করছেন। আমি দুর্বল। আপনার মতো অতোটা বেপরোয়া নই। তাছাড়া আমার অনেক সমস্যা। এসব কাজ একা একা হয়ও না”, ইত্যাদি।

everybody’s business is no body’s business অথবা রাজার পুকুরে দুধ ঢালার গল্প

সংস্কারবাদীদের বদ্ধমূল ধারণা হলো অন্য সবাই এগিয়ে না আসলে একা একা কিছু করা সম্ভব না। শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটি রাজার পুকুরে দুধ ঢালার মতো হয়ে দাড়ায়। গল্পটা হলো এ রকম: কোনো এক রাজা দুধের পুকুরে গোসল করতে চাইলেন। সে মোতাবেক একটা পুকুর খনন করা হলো। অতঃপর তিনি রাজ্যের সব গোয়ালাকে হুকুম দিলেন যাতে তারা রাতের মধ্যে প্রত্যেকে এক গামলা দুধ ওই পুকুরে ঢেলে আসে। রাজা মশাই যথারীতি পরদিন দুধের পুকুরে গোসল করতে গিয়ে দেখেন পুকুরটা একেবারেই শুন্য, কোনো দুধ নাই। কী ব্যাপার? অবশেষে জানা গেলো, প্রত্যেক গোয়ালাই মনে করেছে, সবাই তো দুধ ঢালবে। আমার এক গামলা না ঢাললেও বা কী আসে যায় …। এবার বুঝুন ….। কথায় বলে, ছোট ছোট বালুকণা বিন্দু বিন্দু জল, গড়ে তোলে মহাদেশ সাগর অতল।

প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজ নিজ অবস্থান হতে বিশেষ ভূমিকা রাখার যোগ্যতা রাখে

আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক মানুষকে স্বতন্ত্রভাবে সৃষ্টি করেছেন। আমার কাজ আপনাকে দিয়ে হবে না, আবার আপনার কাজ আমাকে দিয়ে হবে না। প্রত্যেক মানুষ তো বটেই, দুনিয়াতে আল্লাহ তায়ালা কোনো কিছুকেই নিরর্থক সৃষ্টি করেন নাই। আর দায়দায়িত্বের দিক থেকে বললে তো সেই হাদীসটিই আমাদের পথনির্দেশক হতে পারে যাতে বলা হয়েছে যে, সাবধান, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। প্রত্যেককেই নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের যে শক্তি সামর্থ্য দিয়েছেন তা সম্পর্কে তিনি আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। অন্য কারো দায় কোনো ব্যক্তির ওপর বর্তাবে না। বলাবাহুল্য, চেষ্টাটাই মুখ্য, সাফল্য লাভের বিষয়টা নিতান্তই গৌণ, যদিও সাফল্য লাভের জন্য সর্বাধিক উপযোগী পন্থাতেই কর্মতৎপর হতে হবে।

কোরাইশদের মতো জামায়াতের সংস্কারবাদীরা নিরাপদে থেকেও হাত-পা গুটিয়ে বসে আছেন

আল্লাহ তায়ালা কোরাইশদেরকে শীত ও গ্রীষ্মে তথা সারা বছর আরবের অনিরাপদ এলাকায় নিরাপত্তা লাভের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। যাতে তারা আল্লাহর কথা স্মরণ করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। আল্লাহ তায়ালার প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপনের প্রমাণ হলো নিজ নিজ সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে কর্মতৎপর হওয়া। আমি অবাক হয়ে দেখি সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পর্যায়ে কর্মরত সহস্রাধিক ভেটেরান জামায়াত পিপল চলমান দমন-পীড়নের মধ্যেও যথেষ্ট নিরাপদ আছেন। উনারা সব কাজই করছেন। যারা রুকন, ভেতরে ভেতরে উর্ধ্বতনদের কাছে কিছু কাগুজে রিপোর্ট পাঠানো ব্যতিরেকে তারা এবং বাদবাকি বিরাট সংখ্যক জনশক্তি কার্যত সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে আছেন।

জামায়াতের সংস্কারের কথা দিনরাত জপতে থাকলেও নিজেদেরকে এক একটি থিংক-ট্যাংক বা চিন্তা-বলয় হিসাবে গড়ে তোলার কাজে উনারা ধারেকাছেও নাই। চাপিয়ে দিয়ে চিন্তা ও সৃজনশীলতা গড়ে তোলা যায় না। মেধাবীরা নিজ গুণেই নতুন জ্ঞান তৈরি করেন, অন্তত করার কথা। কবে উর্ধ্বতন জামায়াত নেতৃত্ব উনাদেরকে কোনো প্রাসঙ্গিক বিষয়ে চিন্তা করতে বলবেন, সেজন্য যেন উনারা বসে আছেন। কী অবাক কাণ্ড! আশ্চর্য!

অনিচ্ছুক ঘোড়াকে জোর করে পানি খাওয়ানো যায় না

আসলে এসব কিছু হলো ফাঁকি দেয়ার ফন্দি-ফিকির। কথায় বলে you can’t make drink an unwilling horse। নিজেদের সীমাহীন সুবিধাবাদিতা ও কর্মবিমুখতাকে ঢাকার জন্য জামায়াতের উচ্চ শিক্ষিত লোকজনেরা সংস্কারের কথাবার্তা বলেন ও মৃদু দাবি তুলে থাকেন। আমি ওসবের মধ্যে নাই। I am always a theorist-activist.

(২) ইবাদতের বিষয়ে শুদ্ধবাদিতা

জামায়াতের সংস্কারবাদীরা ইবাদতের বিষয়ে শুদ্ধবাদিতাতে ভোগেন। বলতে পারেন, এত ছোট একটা বিষয়কে আমি এভাবে হাইলাইট করছি কেন? হ্যাঁ, বিষয় হিসাবে এটি আপাতদৃষ্টিতে একটা অনুল্লেখ্য ব্যাপার। কিন্তু একটু ভালো করে খতিয়ে দেখলে দেখবেন, ইবাদাতের বিষয়গুলোতে এই শুদ্ধতাবাদিতা তথা পিউরিটানিজমের সাথে অনেক বড় ব্যাপার জড়িত।

আকীদাগত দিক থেকে সমস্যাগ্রস্তদেরকে সহযোগিতা করার পদ্ধতি

দেখুন, ইসলামপন্থীদের ঘোষিত লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে একটি ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করা। তো এ দেশে হাজার বছর হতে যে ইসলাম আছে তা ট্রাডিশনাল সুন্নী ধারার হানাফী মাজহাবের। এই ‘লোক-ইসলামের’ মধ্যে কোনো কোনো গ্রুপের মারাত্মক আকীদাগত সমস্যা আছে। এই সমস্যাকে কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী মেয়াদে সংশোধন করা যায় সে চেষ্টা করার পরিবর্তে চরমপন্থী প্রতিক্রিয়াশীলদের মতো একদা সক্রিয়, এখন তুলনামূলকভাবে নিষ্ক্রিয় জামায়াত নেতা-কর্মীদের অন্যতম কমন বৈশিষ্ট্য হলো ‘বাতিলদেরকে’ হেনস্থা করা ও হেয় প্রতিপন্ন করা। এমন কি এ ধরনের আক্রমণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গিকে উনারা খুব এনজয় করেন। অনেকটা ঈমানী কর্তব্য ও করণীয় মনে করেন। দেশের আকীদাগত দিক থেকে সমস্যাগ্রস্ত মুসলমানদেরকে সহায়তা করার যে ইতিবাচক মানসিকতা তা তাদের নাই।

এ জন্য জায়গায় জায়গায়, মসজিদে মসজিদে নিরেট দ্বীনি আমেজে মজলিশ কায়েম করা এবং প্রত্যেক এলাকায় কোরআন ও হাদীসের অবিতর্কিত (classical) শরাহ-কিতাবের পঠন-পাঠনের ব্যবস্থা করা জরুরি। এসব বিষয়কে তারা কখনো ফিল করেন না।

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোক-সংস্কৃতির প্রতি চরম অশ্রদ্ধা

তাবলীগ জামায়াতসহ দেশের মাদ্রাসাকেন্দ্রিক যেসব সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেসবের সমালোচনা করা, তাদের কাজের নানা রকমের সীমাবদ্ধতা ও খুঁত বের করা ও এসবকে ‘খেদমতে দ্বীন’ হিসাবে ট্যাগ লাগিয়ে খারিজ করে দেয়ার ব্যাপারে জামায়াতের সংগঠনবাদী ও সংস্কারবাদীরা মাশাআল্লাহ হাতে-হাত, কাঁধে-কাঁধ, ভাই-ভাই এক…! নিজেরা ছাড়া অন্য কারো সম্পর্কে তাদের অন্তরে তেমন কোনো শ্রদ্ধাবোধ আছে, এমন মনে হয় না। মনে হয়, ইসলামকে যেন জামায়াতে ইসলামী এ দেশে কাঁধে করে নিয়ে এসে সবাইকে ধন্য করেছেন। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোক-সংস্কৃতির প্রতি কেমন অশ্রদ্ধা…!

মাজহাবী বিতর্ককে পরিহার করাই সঠিক কর্মপন্থা

আমাদের দেশের মানুষ মূলত হানাফী মাজহাবের অনুসারী। যারা ইসলামের জন্য দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার কথা, অংকের সরল নিয়মে তাদের তো মাজহাবী বিতর্ককে সর্বোতোভাবে পরিহার করে চলার কথা। তা না করে তারা বরং নানাভাবে প্রতিষ্ঠিত হানাফী মাজহাবের বিরোধিতা করেন। হানাফী মাজহাবই একমাত্র সহীহ – এমন দাবি যেমন ভুল, তেমনি হানাফী মাজহাব অনুসারে কেউ ইবাদাত ইত্যাদি করলে তাকে কার্যত ভুল সাব্যস্ত করতে হবে – এ ধরনের মন-মানসিকতায়ও অগ্রহণযোগ্য।

রিলিজিয়াস সেক্টরে ভুল ম্যাসেজ যাচ্ছে

হানাফী মাজহাব সমর্থিত কোনো আমলের পক্ষে যদি ন্যূনতম দলীল থাকে তাহলে সেসব নিয়ে বাড়াবাড়ি না করাই তো সামাজিক-উদ্যোক্তা (social-entrepreneur) হিসাবে ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের কাছ হতে প্রত্যাশিত। তাই না? স্মরণ রাখতে হবে, এদেশে ইসলাম কায়েমের জন্য সবচেয়ে বড় ও সর্বাধিক কার্যকরী স্তম্ভ বা সাপোর্ট বেইজ হলো রিলিজিয়াস সেক্টর। জামায়াত কিংবা এ ধরনের কোনো ফোর্সকে মানুষ যখন তাদের দ্বীনি অনুভূতির রক্ষক ও বাস্তব রূপায়ণ হিসাবে দেখবে, পাবে, কেবলমাত্র তখনই জামায়াত কিংবা এ ধরনের কারো পক্ষে এ দেশে ইসলামের নামে কিছু একটা করা এবং টিকে থাকা সম্ভব হবে।

রিলিজিয়াস সেক্টরই ইসলাম কায়েমের মূল শক্তি

শুধুমাত্র এই একটি সেক্টরই ইসলামপন্থীদের একচ্ছত্র। রাজনীতি বলুন, সংস্কৃতি বলুন, সমাজসেবা বলুন, অর্থনৈতিক সামর্থ্য বলুন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সামর্থ্য বলুন, কোনো দিকেই ইসলামপন্থীরা কখনো একচ্ছত্র তো দূরের কথা, সেরাও হতে পারবে না। বড়জোর উল্লেখযোগ্য বিকল্প হতে পারবে।

ইত্তেহাদ মায়াল ইখতেলাফ

অথচ, নানাভাবে হানাফী মাজহাবের বিরোধিতার মাধ্যমে দেশের বৃহত্তর ইসলামপ্রিয় জনগোষ্ঠীর কাছে একটা ভুল মেসেজ যাচ্ছে। আমি এসবের সাথে নাই। আমি সবাইকে নিয়েই চলার পক্ষপাতী। ইবাদাতের বিষয়ে আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ ও তুচ্ছ শুদ্ধবাদিতার পরিণামে ‘ইত্তেহাদ মায়াল ইখতেলাফ’ তথা মতবিরোধ সত্বেও ঐক্যের যে ফর্মুলা তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাওলানা মওদূদীকে বিশেষ করে ক্বওমী ধারার সাথে বিরোধ মিটিয়ে ফেলার কার্যকর উদ্যোগ না নেয়ার জন্য দোষারোপ করার ক্ষেত্রে জামায়াতের সংস্কারবাদীরা উচ্চকণ্ঠ। অথচ তারা নিজেরা তুচ্ছ ইবাদতি ইখতিলাফের মধ্যে নিজেদের জড়িয়ে এদেশের মূলধারার ইসলামপন্থীদের সাথে নিজেদের অনতিক্রম্য দূরত্ব সৃষ্টি করছেন…! কোনো বিষয় নিয়ে সিরিয়াসলি ইনভলভলড হয়ে কোনো ওয়ে আউট বের করার জন্য যে স্থিরতা ও কমিটমেন্ট লাগে, যে উদার ও নিরবচ্ছিন্ন চিন্তাভাবনার প্রয়োজন হয়, যে ধরনের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ইতিবাচক মানসিকতা লাগে তা জামায়াতের সংস্কারবাদীদের মধ্যে আমি আদৌ দেখতে পাই না।

(৩) মজহারপন্থা

বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে জামায়াতের সংস্কারবাদীরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ফরহাদ মজহারের দ্বারা প্রভাবিত। এই কথাটা বুঝতে হলে এবং এর বিপদ সম্পর্কে আন্দাজ করতে হলে নিচে উল্লেখিত কিছু বিষয়কে ভালো করে বুঝতে হবে।

জামায়াতের মধ্যে স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তি চর্চা গড়ে না উঠার কারণ

শুনতে খারাপ লাগলেও জামায়াতে ইসলামীতে বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে মাওলানা মওদূদীই শেষ কথা। এত বছর পরেও এটি সমভাবে প্রযোজ্য। মাওলানা মওদূদীর আশেপাশে উনার সমকক্ষ কোনো বুদ্ধিজীবী বা আলেম শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীতে টিকে নাই। এর দায়দায়িত্ব কার কতটুকু সেটি ঐতিহাসিক বিচার-বিশ্লেষণের বিষয়।

মাওলানা মওদূদী নিজের লেখালেখি তথা বুদ্ধিজীবীতাকে জামায়াতের সংগঠন থেকে আলাদাভাবে বিবেচনার কথা বললেও ‘সংগঠনের বাইরে সাংগঠনিক বিষয়ে কথা বলা যাবে না’ – এই নীতির অবশ্যম্ভাবী ফল হিসাবে জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার ধারা অংকুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। জামায়াতে ইসলামীর মূল এন্টারপ্রাইজ হলো ইসলাম। তাই জামায়াতের আপাতদৃষ্টিতে নিতান্তই ‘সাংগঠনিক’ বিষয় শেষ পর্যন্ত ইসলামের কোনো না কোনো বেসিক আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের সাথে রিলেটেড হয়ে পড়ে। কান টানলে মাথা আসার মতো। তাই শিয়াদের ‘তাকিয়া’ তথা গোপনীয়তা ও চেপে যাওয়ার প্র্যাকটিক্যাল উসূলের কারণে জামায়াতের মধ্যে আজ পর্যন্ত স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তি গড়ে উঠে নাই। কড়ই গাছের মতো ক্রমাগত তা বেড়ে উঠেছে বটে কিন্তু ওতে ফলজ গাছের মতো কোনো ফুল ও ফল উৎপন্ন হয় নাই। এ ধরনের নিয়ন্ত্রণবাদী ব্যবস্থায় তা না হওয়াটাই স্বাভাবিক।

জামায়াতে ইসলামীতে মেধাসম্পন্ন লোকের অভাব নাই

জামায়াতের এই বুদ্ধিবৃত্তিক শুন্যতার মানে এই নয় যে, জামায়াতে তেমন মেধাবী লোকেরা জয়েন করে নাই। বরং বাস্তবতা হলো এর উল্টো। এ দেশের শিক্ষিত ও মেধাবীদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ছাত্রজীবনে শিবির করেছে। বর্তমানে উপায়ান্তর না পেয়ে জামায়াতের সাথে লেগে আছে। কেউ কেউ পরিণত বয়সে হয়তোবা নাজাতের চিন্তায় ব্যাক টু দ্য প্যভিলিয়ন হিসাবে জামায়াতের রুকনিয়তও নিয়েছেন। তো কথা হলো মেধা বা বুদ্ধি থাকা মানেই বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন হওয়া নয়। বুদ্ধি থাকলেই, মেধাবী হলেই বুদ্ধিবৃত্তি ডিভেলপ করে না।

বুদ্ধিবৃত্তি একটা চর্চার ব্যাপার

চর্চা না থাকলে একজন মেধাবী ব্যক্তিও কোনো বিষয়ে পোলাপানে মতো (adolescent) কথাবার্তা বলতে পারে ও আচরণ করতে পারে। আশেপাশে আমরা এর প্রচুর নজির দেখি। শান না দিলে ইস্পাতের ছুরিও যেমন ভোঁতা হয়ে যায় স্বাধীন চিন্তা, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড ও বুদ্ধিবৃত্তিও তেমনি নিরবচ্ছিন্ন চর্চার ব্যাপার। নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক দীনতাকে ঢাকার জন্য যে কোনো ব্যক্তি প্রতিক্রিয়াশীল হতে বাধ্য, হালকা মানসিকতার (subtle-minded) হতে বাধ্য। এমন ধরনের ব্যক্তিবর্গ নিজেরা নিজেরা এক একটা বলয়ের মধ্যে (comfort zone) নিজেদেরকে সদাসর্বদা গুটিয়ে রাখে। কমিউনিটি ক্যারেকটারের পরিবর্তে cult system-ই তাদের কাছে অধিকতর স্বস্তিদায়ক। এই দৃষ্টিতে জামায়াতের মতো জামায়াতের সংস্কারবাদের ধারাও দিন শেষে একটা কাল্ট সিস্টেমই বটে।

বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জনপরিমণ্ডলে ইসলামপন্থীদের অবস্থান

দেশের ইসলামপন্থী ধারা, মত, পথ ও সংগঠনসমূহের বিশেষ করে জামায়াতের এই সাংগঠনিক রেজিমেন্টেড সিস্টেমের কারণে দেশের মূলধারার বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় ইসলামপন্থা একটা হীনমন্য ধারা। এপলোজেটিক এন্ড রিএকশনারি। এ দেশের বুদ্ধিবৃত্তির মূলধারা তথা জনপরিমণ্ডল (public intellectual sphere) বলতে যা বুঝায় তা একচ্ছত্রভাবে বামপন্থা দ্বারা প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত।

কেন এমন প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি হলো

ইসলামপন্থীদের মতো বিপ্লব আমদানী করতে গিয়ে ঐতিহাসিকভাবে এ দেশের বামধারা ইসলামপন্থীদের সাথে একটা বিরোধে লিপ্ত হয়ে আছে। এর পরিণতিতে তারা এ দেশের ধর্মীয় অংগন হতে বিতাড়িত হয়ে নাস্তিকতার ‘গ্লানিময়’ পরিচয়কে আজো বহন করে বেড়াচ্ছে। সমাজের মূলধারা হতে বিতাড়িত হয়ে তারা সমাজ ব্যবস্থার আশপাশ তথা পেরিফেরিগুলোতে অবস্থান মজবুত করার দিকে মনোনিবেশ করেছে। যার ফল হলো সাহিত্য, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম – এক কথায় দেশের পাবলিক স্ফিয়ারে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য। যাদেরকে ঘর হতে বের করে দেয়া হয়েছে তারা আশেপাশের সব রাস্তা দখল করে নিয়েছে। এমন এক অভাবনীয় পরিস্থিতি!

ফরহাদ মজহার ও বামধারার সংস্কারবাদ

বাংলাদেশের বামধারায় ফরহাদ মজহার ব্যতিক্রম। এক দৃষ্টিতে তাকে বামধারার সংস্কারপন্থী বলা যায়। তার থিসিস হলো, বাংলাদেশের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ তৃতীয় বিশ্বের একটা দেশে প্রভাবশালী ধর্ম, ধর্মীয় শক্তি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে আস্থায় নিয়ে, সাথে নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। এর গত্যন্তর নাই। সোজা কথায়, পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সাম্যবাদকে বিজয়ী করতে হলে ইসলামকে কৌশলগত দিকে থেকে ব্যবহার করতে হবে। বিভিন্ন লেখায় তিনি তা বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। অতএব দেখা যাচ্ছে মজহারের ইসলাম-এজেন্ডা আর ইসলামপন্থীদের ইসলাম-ভাবনা এক জিনিস নয়।

‘ইসলামী আন্দোলন’ হিসাবে ইসলাম বনাম মজহারের ‘সাম্যবাদী-সহজিয়া ইসলাম’

অন্যদিক থেকেও ফরহাদ মজহারের ইসলাম আর ইসলামপন্থীদের ইসলাম এক নয়। মজহার সাহেবের ইসলাম-প্রিয়তায় ইসলাম ততটুকুই আছে যতটুকু বাংলাদেশে লোকধর্ম হিসাবে প্রচলিত আছে। স্বভাবতই তার মধ্যে টেক্টচুয়্যাল অথেনটিসিটি বা আক্বীদাগত শুদ্ধতার কোনো ব্যাপার নাই। অশুদ্ধতার কোনো প্রযোজ্যতা নিয়েও তাই তার কোনো টেনশান বা কনসার্ন নাই। যদ্দুর দেখেছি জামায়াতের সংস্কারবাদীদের প্রিয় ‘ফরহাদ ভাই’য়ের ফিলোসফিক্যাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং বা তার মূল ‘আক্বীদা’ হলো বাউলতত্ত্ব। নদিয়ার নবপ্রাণ আখড়া হলো উনার মক্কা-মদীনা। নদিয়ার ভাবান্দোলন তথা লালনের দর্শনই উনি ইসলামপন্থীদেরকে গিলাতে চান। উনি এক ‘সহজিয়া ইসলামে’র প্রচারণায় নিবেদিত প্রাণ।

ফরহাদ মজহারের লন্ডন বক্তৃতার পরবর্তী কাহিনী

এ ধরনের একজন ব্যক্তির নিকট হতে কীভাবে ইসলামী আন্দোলনের ধারণা পোষণকারীরা ইসলাম বিষয়ক বুঝজ্ঞান লাভ করতে আসে তা আমার আক্বলে ধরে না। বছর দেড়েক আগে ফরহাদ মজহার লন্ডনে গিয়ে ইসলামিস্টদের বিভিন্ন সমাবেশে নানা রকমের ইসলাম-জ্ঞান বিতরণ করেছেন। এতে তার ‘সহজিয়া-সাম্যবাদী ইসলামের’ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা হাজির করেন। যার মধ্যে আছে – ১. ইসলামের ধর্মীয় ব্যাখ্যার পাশাপাশি একটি মুক্ত দার্শনিক ব্যাখ্যাও থাকতে হবে। ২. ব্যক্তি নয়, সমাজই ইসলামে মূল বিষয়। ৩. সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই ইসলামের লক্ষ্য। ৪. অস্থায়ী মুজিব নগর সরকারের ঘোষিত লক্ষ্যসমূহের ভিত্তিতেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। এসব উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কথাবার্তা শুনে উপস্থিত ইসলামপন্থীদের উদ্বেলিত করতালি দেখে আমি রীতিমতো স্তম্ভিত! পরিচিত মহলে এ সব বিষয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরে জামায়াতের কিছু মজহারপন্থী-সংস্কারবাদী উপর্যুপরি অনুরোধের মাধ্যমে আমার উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করলেন যাতে আমি উনার বক্তব্যের আপত্তিযোগ্য দিকগুলো নিয়ে কয়েকটি প্রবন্ধ লিখি। নিতান্ত বাধ্য হয়ে আমি (১) ইসলামের দার্শনিক ব্যাখ্যার সমস্যা ও ইসলামে দর্শনের পরিসর, (২) ব্যক্তি ও সমাজের অগ্রাধিকার নির্ণয়ে পাশ্চাত্য চিন্তাধারা বনাম ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি, (৩) সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই কি ইসলামের লক্ষ্য? এবং (৪) মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষিতে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার শীর্ষক অত্যন্ত মৌলিক, বিস্তারিত ও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটা প্রবন্ধ লিখি। দুর্ভাগ্য হলো, ওসব মুহতারামের সাথে পরবর্তী কথাবার্তায় আমি বুঝতে পারলাম, তারা এগুলোর কোনোটাই পড়েন নাই। এটি ‘নিজেদের’ লোক সম্পর্কে উনাদের হীনমন্যতাসুলভ তুচ্ছজ্ঞান ও হালকামিসুলভ মানসিকতার পরিচয় ছাড়া কিছু নয়। আমার লেখার সাথে এনগেজ হলে না জানি মজহার-ভক্তি টুঁটে যায় … !

কে কার টার্গেট?

যথেষ্ট বিত্তশালী অথচ সাম্যবাদী (?) ফরহাদ মজহারের পিকনিক স্পটে যাতায়াতকারী জামায়াতের সংস্কারবাদী সোশ্যাল এলিটদের দৃষ্টিতে ফরহাদ মজহার হলেন উনাদের ‘দাওয়াতী টার্গেট’। আমি উনাদের মধ্যকার সিনিয়রদের কাউকে কাউকে বলেছি, কে ভিকটিম, কে প্রিডেটর, কে কার টার্গেট সেটি সময়ই বলে দিবে। বিশেষ করে বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার ধরন হিসাবে মজহারপন্থাকে গ্রহণ করার ব্যাপারে জামায়াতের মূলধারা ও সংস্কারবাদী ধারা মোটের ওপর দৃশ্যত একমত। উভয়ের মতে এটি একাধারে একটা সরকারবিরোধী কৌশলও বটে। যে কারো সাথে স্ট্র্যাটেজিক রিলেশন গড়ার ব্যাপারে লাভ ছাড়া ক্ষতি নাই। এটি সত্য। সমস্যা হলো অসতর্ক ও বা অতি সরল স্ট্রেটেজিক রিলেশন শেষ পর্যন্ত নিছক কৌশলগত সম্পর্ককে হতে মতাদর্শগত সম্পর্কে গড়ায়। এটি আমরা বারে বারে দেখতে পাই। ফরহাদ মজহারের সাথে জামায়াতের সম্পর্কের ব্যাপারেও সেটি ঘটেছে। ফরহাদ মজহারের শক্তিশালী লেখনীর জোয়ারে দুর্বল জামায়াত-বুদ্ধিবৃত্তি কবে যে তলিয়ে গেছে তা তারা বুঝতে পারছেন না।

ফরহাদ মজহারের মতাদর্শগত লেখাগুলোকে প্রমোট করার কারণ কী?

কুষ্টিয়া অঞ্চলের বাউলধারার সাথে ফরহাদ মজহারের বিশেষ মতাদর্শিক সম্পর্ক দৃশ্যমান। নদিয়াকেন্দ্রিক এই ভাবান্দোলন নিয়ে ২০০৭ সালে জামায়াতপন্থী দৈনিক নয়া দিগন্তের মাসিক ম্যাগাজিন অন্যদিগন্তে তিনি ধারাবাহিকভাবে লেখা শুরু করেন। ২০০৮ সালে তাঁর ‘ভাবান্দোলন’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। ‘ধর্মের পর্যালোচনা ও বাংলাদেশে ইসলাম’ শিরোনামে তিনি দৈনিক নয়া দিগন্তে দশ পর্বের একটা ধারাবাহিক লিখেছেন। দেখা যাচ্ছে, ফরহাদ মজহারের সরকারবিরোধী কলাম ছাপাতে ছাপাতে জামায়াত তার একান্ত মতাদর্শগত লেখাগুলোও নিজেদের দলীয় বলয়ের গণমাধ্যমে ছাপিয়ে চলেছে। দৈনিক আমার দেশ প্রত্যক্ষভাবে জামায়াতের পত্রিকা না হলেও এতে ফরহাদ মজহারের ‘তবু কমিউনিজমের কথাই বলতে হবে…’ শিরোনামের দু’পর্বের লেখা ছাপানোর বিষয়টিও লক্ষ্যণীয়। জামায়াতের এমনকি শিক্ষিত-সংস্কারবাদীদেরকেও এসব লেখা গোগ্রাসে গিলতে দেখেছি। ‘মজহার সাহিত্য’ নিয়ে জামায়াতের সংগঠনবাদী ও সংস্কারবাদী উভয়পক্ষের কূপমন্ডুকতা ও হীনমন্যতার গভীরতা দেখে অবাক হয়ে গেছি। অথচ ‘অন্যদিগন্তে’র কোনো এক সংখ্যায় তিনি স্পষ্ট করেছেন বলেছেন, যারা আল মাহমুদের মতো তিনি একদিন ইসলামপন্থী হয়ে উঠবেন বলে ভাবছেন তা ভুল।

তবুও জামায়াত শিবিরের দিকভ্রষ্ট ব্যক্তিবর্গ মজহারের পাঠচক্রে গিয়ে বসে থাকেন। বউপোলা ও ভাইবেরাদরদেরকেও তাশকিল করে নিয়ে যান। সেখানে যখন আলোচনা সূত্রে মাওলানা মওদূদীর ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ চিন্তাকে ধুয়ে মুছে সাফ করা হয় তখনও তারা নীরব থাকেন। এক শীর্ষ শিবির নেতা হতে এটি শোনা। আমার সাথের একজন উনাকে জিজ্ঞাসা করলেন, যখন তিনি মাওলানাকে এভাবে খারিজ করে দিচ্ছিলেন তখন কি আপনার খারাপ লাগেনি? আপনি কিছু বলেছেন? উত্তরে সেই উর্ধ্বতন দায়িত্বশীল নিশ্চুপ ছিলেন।

সাংগঠনিক পরিবেশে মুক্ত আলোচনার সুযোগ না থাকা একটা কারণ

সাংগঠনিক পরিবেশে কথা বলা যায় না, সেজন্য উনারা চিন্তা পাঠচক্রে যান। কেন সলিমুল্লাহ খানের আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভাতে উনারা যান না? কারণ সেখানে ততটা পাত্তা পান না, এ ছাড়া আর কি? মজহার যে ইসলামপন্থীদেরকে খাতির করেন তা তাদেরকে ব্যবহার করার জন্য। সত্য-মিথ্যার মাখামাখি অবস্থার চেয়ে নির্জলা ও প্রকাশ্য মিথ্যা মোকাবিলার দিক থেকে ভালো ও সুবিধাজনক – এ কথাটা জামায়াতের সংগঠনবাদীরা তো বটেই, ‘এনলাইটেন্ড’ সংস্কারবাদী ‘বুদ্ধিজীবীরা’ও বুঝেন না। দুঃখ!

যোগাযোগে সমস্যা নাই, সমস্যা হলো দিলখোলা মেলামেশায়

হাদীসের মর্ম অনুযায়ী, এমনকি আমাদের কাণ্ডজ্ঞান দিয়েও আমরা বুঝি, মানুষ আপন মনে করে যার সাথে উঠাবসা করে একসময়ে সে তার মতোই হয়ে যায়। অন্তর হলো জীবন্ত হাড়ের মতো। সংস্পর্শে থাকলে তা জোড়া লাগবেই। ভুলভাবে হোক, শুদ্ধভাবে হোক। কমিউনিজম বুঝার জন্য, সামাজিক উদ্যোগকে জানার জন্য, অন্ততপক্ষে কী হয় তা দেখার জন্য কখনো যাওয়া যেতে পারে। এমনকি আধুনিক তত্ত্ব ও বিশ্লেষণ সম্পর্কে জ্ঞান লাভের জন্য নিয়মিত অংশগ্রহণও হতে পারে। আমিও নাস্তিক, আধানাস্তিক এমন বহু বুদ্ধিজীবীর কথা ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুনে থাকি। আমার বাসার বৈঠকখানা ও সিএসসিএসের কক্ষগুলো শুঁকলে এ রকম তাত্ত্বিকদের সিগারেটের ঘ্রাণ পাওয়া যাবে। আমি তাদের অবস্থান সম্পর্কে সম্যক অবহিত। তারাও আমার মতাদর্শিক অবস্থান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।

সমস্যা হলো বামপন্থী লোকজনের কাছে প্রত্যাখ্যাত ‘ঈমানদার-কম্যুনিস্ট’ ফরহাদ মজহারের চারিদিকে এখন জামায়াত-শিবিরের লোকেরাই ভীড় করে আছে। উনার মতো একজন দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবীর খামার ও অবকাশ যাপনকেন্দ্রে গিয়ে উনার সাথে ছবি তুলতে পারাকে জামায়াতের তাবৎ হীনমন্য লোকেরা বিরাট প্রাপ্তি মনে করে। দাওয়াতী টার্গেট শুধু ফরহাদ মজহারকে কেন? সলিমুল্লাহ খান, আনু মোহাম্মদ, আবদুল্লাহ আবু সায়িদ এবং এ ধরনের বাদবাকিরা কেন নয়? জামায়াতের সংস্কারবাদীরা ইনস্ট্রাকটর অর্থে শিক্ষক আর অভিভাবক (mentor অথবা guide) অর্থে শিক্ষকের পার্থক্যটাই বুঝে না।

মাল্টি-লেয়ার ডিফেন্স

ফরহাদ মজহারের বুদ্ধিবৃত্তির চর্চার অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো তিনি তার বক্তব্যকে নানা স্তরে সাজিয়ে কথা বলেন। আসল কথাটা খুব পরিষ্কার করে ও দায়দায়িত্ব নিয়ে বলেন না। পাঠক যখন কোনো একটা পয়েন্টে দ্বিমত পোষণ করে তখন তিনি তার উক্ত লেখারই অন্য একটি অংশকে সামনে নিয়ে আসেন এবং তর্কে লিপ্ত হন। এ ধরনের multiple identity’র সাথে যদি ভাষার চমৎকারিত্বের সংযোগ ঘটে তখন তাকে বুঝতে পারা ও মোকাবিলা করা কঠিন ব্যাপার। ফরহাদ মজহারের সাথে এনগেজ হওয়ার মানে হলো – খেলা চলাকালীন যে মাঠের গোলপোস্ট পরিবর্তন হয়ে যায় সে রকম কোনো মাঠে খেলার মতো বিড়ম্বনা, বোকামী ও পণ্ডশ্রম।

নেতিবাচক সমালোচনা-সর্বস্বতা

ফরহাদ মজহার সবসময়ে একটা ক্রিটিক্যাল অবস্থান হতে কথা বলেন। এটি কম্যুনিস্ট তাত্ত্বিকদের একট কমন বৈশিষ্ট্য। সমালোচনা ও খুঁত ধরাতে উনারা যতটা এক্সপার্ট, করণীয় সম্পর্কে বলা ও উক্ত করণীয়ের ভেলিডিটির পক্ষে যুক্তি দেয়ার ক্ষেত্রে উনারা ততটাই পিছলা, পলায়নপর ও অনিচ্ছুক। ইসলাম এ ধরনের তথাকথিত বিচক্ষণতা ও চাতুর্য্যকে নিরুৎসাহিত করে। দ্বীন ইসলাম হচ্ছে সরল ও স্পষ্ট প্রস্তাবনা (claim)। তাই কোনো কিছুকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে ক্রিটিক্যাল হওয়া, দ্বিমত পোষণ করা ইত্যাদি পদ্ধতি ও সতর্কতা হিসাবে জরুরি হলেও শেষ পর্যন্ত ক্রিটিক্যাল ও সন্দেহবাদী থেকে যাওয়াটা ইসলামের দিকে থেকে খুবই খারাপ। অসুস্থতার লক্ষণ। এই অসুস্থতার আর একটি লক্ষণ হলো কোনো গবেষক-পণ্ডিতের দু’একটি বই পড়েই গ্রস বা কনক্লুডিং মন্তব্য করা। এই আক্রমণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি উনার সোহবতপ্রাপ্ত সবার মধ্যেই কম-বেশি লক্ষ করি।

এই পণ্ডিতপ্রবর এতো এতো ডিগ্রি নিয়েছেন, এতো ওয়াইড রেঞ্জে পড়াশোনা করেছেন, নিজেকে (রেডিও তেহরানের সাথে এক সাক্ষাৎকারে) ইসলামিস্ট হিসাবেও দাবি করেছেন অথচ ইসলামের বেসিক টেক্সট তথা কোরআন ও হাদীস স্টাডি করেছেন, এমনটা মনে হয় না। প্রাক্তন শিবির নেতা বর্তমানে উনার খুব কাছিকাছি এমন লোকজনের কাছ হতে উনার এই গ্যাপ সম্পর্কে কনফার্ম হয়েছি। ইসলাম নিয়ে উনার হাস্যকর ও স্ববিরোধী কথাবার্তা শুনলেও এটি বুঝা যায়।

কেমন করে উনারা পারেন

দু’জন বয়োবৃদ্ধের প্রতি জীবনে আমি হিংসাবোধ করেছি। একজন হলেন চবি’র একজন প্রাক্তন বরিষ্ঠ প্রফেসর। অন্যজন হলেন বাংলাদেশের হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা ফরহাদ মজহার।

সুদর্শন বলতে যা বোঝায় স্যার তেমনটা ছিলেন না। বয়স তখন ষাটের কোটায়। ক্যাম্পাস ক্লাবে উনার প্রগতিশীল সহকর্মীদের কিশোরী মেয়েদের একটা গ্রুপকে প্রতিদিন সকালের দিকে তিনি টেবিল টেনিস খেলা শিখাতেন। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য জয়েন করেছি। একদিন ফজরের পরে দক্ষিণ ক্যাম্পাসে লিজেন্ডারি জামায়াত নেতা ড. মোহাম্মদ লোকমান স্যার ও প্রফেসর হারুনুর রশীদ স্যারদের সাথে হাঁটতে বের হয়েছি। কথায় কথায় উনারা স্যারের এসব দৃষ্টিকটু কাজের খুব সমালোচনা করলেন। তখন আমি মকারি করে বললাম, ‘স্যার, আমার তো উনাকে হিংসা হচ্ছে। কই, আমি তো উঠতি বয়সীদের কাউকে আকৃষ্ট করতে পারছি না। যদিও আমি সুদর্শন ও তরুণ ….!’ যাহোক, সংশ্লিষ্ট প্রতিবেশীদের কাছ হতে শুনেছি, উনার এক প্রফেসর বন্ধুর বাসায় রাতে ডিনার করে বন্ধুর প্রফেসর স্ত্রীকে নিয়ে উনি উপরের তলায় রাত্রিযাপন করতেন। সকাল বেলায় সবাই মিলে একসাথে নাস্তা করতেন …!! কী অবাক হচ্ছেন? জগতের অনেক কিছুই আপনারা জানেন না। কার ডিমে কে তা দেয়!

ফরহাদ মজহারকে হিংসা করার কারণ হলো উনার কোনো দল নাই। অথচ, জায়গায় জায়গায় উনার লোক। যারা উনার কাছ হতে ছুটে গিয়ে এখন উনার বিরোধিতা করছে তারাও এমনকি মজহারীয় স্টাইলেই কথাবার্তা বলে ও লেখালেখি করে। অবাক কাণ্ড! তাই না? তিনি এক কথার যাদুকর। তিনি বা তার মেসেজ গ্রহণযোগ্য বা অনুকরণীয় কিনা তা যার যার স্বতন্ত্র বিবেচনার ব্যাপার। তিনি আধুনিক বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার একটি স্বতন্ত্র ধারা। অবশ্য অনেকের মতে এটি আদতে আহমদ ছফার ইন্টেলেকচুয়্যাল প্রজেক্ট। তার সবচেয়ে বড় সাফল্য হচ্ছে নিজের সহজিয়া-সাম্যবাদী অবস্থানকে প্রকাশ্যে রেখেই তিনি ইসলামপন্থীদের সবচাইতে চৌকষ লোকজনের একটা বিরাট গ্রুপকে তাদের অজান্তেই নিজ প্রভাব বলয়ে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন।
উনার বুদ্ধিবৃত্তির ধরনকে আত্মস্থ করে তারা জাতে উঠার চেষ্টায় নিয়োজিত। বারে বারে সব লেখায়, কথায় ও কাজে তিনি নিজেকে লালনপন্থী কম্যুনিস্ট দাবি করলেও ইসলামিস্টদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ, বলতে পারেন ক্রিম পোরশান, উনাকে মাথায় তুলে নাচছেন। উনার কাছ হতে আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ার তরিকার সবক নিচ্ছেন। উনার স্টাইলে এনজিও করে সামাজিক বিপ্লব করার ট্রেনিং নিচ্ছেন। কম্যুনিজমের সাথে ইসলামের নির্বিরোধের ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাঠ গ্রহণ করছেন। সেলুকাস! সেলুকাস! বাহ, বাহ, বেশ। ভালো তো, ভালো না? এমন লোককে হিংসা করা বোধকরি ‘জায়েয’!

কাকের বাসায় কোকিলের ডিম

মজহারের ফর্মুলা হচ্ছে পার্টি করার দায়দায়িত্ব না নিয়ে কোনো কোনো পার্টির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের মগজ ধোলাই করে মাঠে ময়দানের কাজ তথা বিপ্লবের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। উনার দৃষ্টিতে এটি গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রক্রিয়া। কাকের বাসায় কোকিলের ডিম পাড়ার মতো। কোকিল যেমন করে কাকের বাসায় ডিম পেড়ে আসে। নিজের মনে করে কাক তাতে তা দেয়। বাচ্চা ফুটলে কাক সেটিকে খাওয়ায়। বড় হওয়ার পর সেই সব কোকিল ছানা মা কোকিলের কাছেই ফিরে যায়।

নিজেদের বিপ্লব অন্যরা করে দেয় না

এই কৌশল ও নীতির বাস্তবায়ন তিনি করে চলেছেন। খুব সম্ভবত ইসলামিস্টরাও উনাকে নিয়ে এমনই কৌশলকে মাথায় রাখছেন। উভয় পক্ষই আমার দৃষ্টিতে ভুল করছেন। সমমনা কারো সাথে বা কৌশলগত সম্পর্কে সম্পর্কিত কারো সাথে একটা নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত যাওয়া যায়। কিন্তু কারো বোঝা অন্য কেউ বহন করে না। আমার বিপ্লব অন্য কেউ করে দিবে না। ইরানের কম্যুনিস্ট তুদেহ পার্টি ইরান বিপ্লবের সময়ে মোল্লাদের সাথে আঁতাত করেছিলো। এমনকি একসাথে মাঠে-ময়দানেও ছিলো। তাদের ধারণা ছিলো মোল্লারা আর কী করতে পারবে? এরপর তো ময়দান আমাদের জন্য ফাঁকা। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, তারা ভুল করেছিলো। বাংলাদেশে পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে কর্ণেল তাহেরের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা জিয়াউর রহমানকে নিয়ে এ রকম খেলা খেলছিলো। পরবর্তী ইতিহাস আমাদেরকে দেখিয়ে দিয়েছে, নিজেদের বিপ্লব একান্ত নিজের লোক দিয়েই করতে হয়। পুতুল শাসকও মুহূর্তের মধ্যে সত্যি সত্যি চেপে বসতে পারে। হিংস্র পোষা প্রাণী যে কোনো মুহূর্তে ঘাড় মটকাতে পারে। দুঃখজনকভাবে এটি মানুষ কখনো কখনো ভুলে যায়।

প্রকৃতিগত অনুপপত্তি (fallacy)

কাকের বাসায় কোকিলের ডিম – এই ব্যাপারটিকে ইনফর্মাল লজিকে প্রকৃতিগত অনুপপত্তি (naturalistic fallacy) হিসাবে মনে করা হয়। ন্যচারালিস্টিক ফ্যলাসি হলো প্রকৃতির বিরল ও বিরুদ্ধ ঘটনাকে কোনো আচরণের বৈধতার পক্ষে দাবী হিসাবে উপস্থাপন করা বা এর বৈধতার ভিত্তি হিসাবে দাবি করা। তাই প্রকৃতিতে থাকলেই হবে না, সংশ্লিষ্ট আচরণটি কমন, নাকি এক্সেপশনাল, তাও দেখতে হবে। তা না হলে প্রকৃতিকে আইনের উৎস হিসাবে গ্রহণ করার পুরো প্রস্তাবনাটাই কলাপস করবে।

এতক্ষণে পাঠকের কাছে নিশ্চয়ই স্পষ্ট, কেন আমি জামায়াতের সংস্কারবাদীদের সাথে নাই।

(৪) সংস্কারের ক্ষেত্র ও অগ্রাধিকার নির্ণয়ে বিভ্রান্তি

জামায়াতের সংস্কারবাদীরা মনে করে জামায়াতের যতো সমস্যা তা মূলত পরিচালনাগত সমস্যা (operative or procedural problem)। আমার দৃষ্টিতে জামায়াতের মূল সমস্যা পরিচালনাগত বা পদ্ধতিগত নয়, বরং তত্ত্বগত সমস্যাই জামায়াতের মূল সমস্যা। সংস্কারের চিন্তা করেন বা এজন্য কথাবার্তা বলেন এ রকমের জামায়াত-জনশক্তি এমনটা মনে করেন না। সংস্কারের ক্ষেত্র ও অগ্রাধিকার নির্ণয়ে তারা ভুল করছেন। আমার মতো গুটিকতেকের মতে জামায়াতসহ সব ইসলামী দল ও গোষ্ঠীর জন্য একটা প্যারাডাইম-শিফট অত্যন্ত জরুরি। ‘সাংগঠনিক ফরজিয়াত’ বলা যায়। এ বিষয়ে আমার নিজস্ব মত হচ্ছে প্যারাডাইম-শিফট নয়, বরং জামায়াতসহ সব ইসলামী দল ও গোষ্ঠীর জন্য নতুন ধরনের চিন্তা, সংগঠন পদ্ধতি ও এপ্রোচ হাজির করা জরুরি। তাই একে paradigm shift না বলে paradigm buildup বলাটাই এপ্রোপ্রিয়েট।

নতুন ধরনের চিন্তার আবশ্যকীয়তা

সত্যিকারের যে সংস্কার জরুরি তা বিদ্যমান কোনো চিন্তা-কাঠামো তথা প্যারাডাইমের মধ্যে পুরোপুরি নাই। সেজন্যই নতুন ধরনের চিন্তাপদ্ধতি বা meta-theory গড়ে তোলা দরকার। কারণ পৃথিবী প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। বিশেষ করে বর্তমান যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে প্রতি দশকে নয়, এমনকি প্রতি পাঁচ বছরের মধ্যেই নতুন নতুন সামাজিক অবয়ব ও প্রেক্ষিত তৈরি হচ্ছে। এজন্য কালোত্তীর্ণ আদর্শ হওয়া সত্বেও ইসলামের প্রতি পুনর্দৃষ্টি, সত্যি কথা হলো, ভালো করে নতুন করে একে বুঝতে পারা জরুরি।

ইসলামের নামে প্রচলিত কোনটি ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতি, কোনটি আরব সংস্কৃতি এবং এসবের মাঝে শরীয়াহর মূল অংশ হিসাবে ইসলাম কতটুকু তা ভালো করে বুঝতে হবে। এ বিষয়ে সমাজ ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন কেন্দ্র (CSCS) প্রকাশিত ‘ইসলামী চিন্তার সংস্কার: কোথায়, কেন এবং কিভাবে‘ লেখাটিতে ও ‘ইসলামী চিন্তার সংস্কার: বিচ্যুতি, প্রগতি নাকি সময়ের দাবি‘ – শীর্ষক সিরিজ লেখাগুলোতে বিস্তারিত আলোচনা আছে। পড়তে পারেন। উপকৃত হবেন। গ্যারান্টিড।

‘আধুনিক ইসলামী রাষ্ট্র’ ভাবনার গোড়াপত্তন কীভাবে হলো

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মাওলানা মওদূদী যখন তার চিন্তাভাবনাগুলোকে ফর্ম, মডিফাই ও পাবলিক করা শুরু করেন তখনকার ঔপনেবেশিক পরিবেশে ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ ধারণাটি কোনো না কোনোভাবে ইসলামপ্রিয় জনগণকে এগিয়ে যাওয়ার, লড়াই করার প্রেরণা জুগিয়েছে। তখনকার তুলনায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় এখনকার কলোনিয়ালিজম ততটা রাজনৈতিক নয় যতটা সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও অর্থনৈতিক।

তাই দ্বীন কায়েমের বিষয়টির কালোত্তীর্ণ প্রযোজ্যতা সত্বেও দ্বীন কায়েমের ধরন ও এর বাস্তব-প্রযোজ্যতা এখন স্বভাবতই ভিন্ন রকমের হবে। এই নবতর প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে কীভাবে দ্বীন কায়েমের কাজ করতে হবে তা নিয়ে সমকালীন স্কলাররা ভাবছেন, কাজ করছেন। বাংলাদেশের জামায়াত এসব থেকে বিচ্ছিন্ন। জামায়াতের সংস্কারবাদীদেরও সমকালীন চিন্তাবিদদের কাজকর্ম নিয়ে ভাসা ভাসা জ্ঞানের বাইরে কোনো সামগ্রিক ও সুসমন্বিত জ্ঞান নাই। সমকালীন চিন্তাবিদদের চিন্তাভাবনা নিয়ে উনারা যখন এনগেজ হোন তখন, আমার দৃষ্টিতে, এক প্রকারের ফ্যাশন বা ফ্যান্টাসি হিসাবেই সেগুলোকে গ্রহণ করেন। খুব যে সিরিয়াসলি এনগেজ হোন, তা না।

‘ঢাকা, পুরোটাই ফাঁকা’!!!???

এমনে কথার কথা হিসাবে বলেন, ‘আমাদেরকে অমুক তমুকের চিন্তাধারা বুঝতে হবে’, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আজ পর্যন্ত জামায়াত ঘরানার একজনকেও পেলাম না যিনি ইউসুফ কারজাভী বা তারিক রামাদানের কোনো একটি বইও ভালো করে পড়েছেন। বাজারে পাওয়া যায় এমন কিছু বই অবশ্য উনারা কিনে সাজিয়ে রাখেন। গুটিকয়েক উদ্যমী ও ব্যতিক্রমী তরুণ বাদে, বিগত ছয় বছরের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, ইসলামপন্থার পক্ষে বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার দিক থেকে, এক কথায়, ‘ঢাকা, পুরোটাই ফাঁকা’।

আগামী দিনের ইসলাম-এর উপযোগী ভরকেন্দ্র

মাওলানা মওদূদীর চিন্তা-গঠনে প্রচলিত মাদ্রাসাকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থারও প্রবল প্রভাব বিদ্যমান। জামায়াতে এক ধরনের গুরুবাদিতার প্রবর্তন ও রক্ষণশীল নারীনীতি এর অন্যতম লক্ষণ। দিনশেষে তাকে একজন টিপিক্যাল আলেম হিসাবেই পাই যদিও তিনি অনেক উঁচু মাপের গবেষক। আগামী দিনের ইসলামের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ভরকেন্দ্র হতে পারে মাদ্রাসা শিক্ষিত দ্বীনি আলেম ও বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করা পেশাজীবীদের সমন্বয়ের মাধ্যমে। তারিক রমাদানের ভাষায় নলেজ অব দ্য টেক্সট ও নলেজ অব দ্য কনটেক্সেটের সমন্বয়ের মাধ্যমে।

নিছকই পরিচালনাগত সমস্যা, নাকি তাত্ত্বিক-গঠনগত সমস্যাও

শুরুতেই বলেছি, জামায়াতের সংস্কারবাদীরা এতসব তাত্ত্বিক বিষয়ে এনগেজ হতে চান না। আমার অভিজ্ঞতায়, তারা এমন ধরনের সমস্যা থাকার কথা মনেও করেন না। মাঝে মধ্যে বা প্রসঙ্গক্রমে তাত্ত্বিক কিছু রিফর্মের কথা বললেও একে তারা আদৌ যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে ভাবেন না। তাদের দৃষ্টিতে জামায়াতের যতো সমস্যা তা মূলত পরিচালনাগত ও পদ্ধতিগত সমস্যা। সাধারণ কথায় যাকে আমরা কোনো কিছুকে হ্যন্ডেলিংয়ের সমস্যা বলি।

তাদের কারো কারো মতে, জামায়াতের ক্যাডার পদ্ধতি একটা সমস্যা। কারো কারো মতে কোনো বিশেষ লোকাল ইস্যুকে হ্যন্ডেলিং করতে না পারাই জামায়াতের সমস্যা। যেমন ১৯৭১ ইস্যু। কোনো একটি দেশের বিশেষ কোনো রাজনৈতিক সংকট, যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, ইসলামের মতো একটা কালজয়ী মতাদর্শের নিজস্ব সংকট বা ইস্যু নয়। বরং তা এই মতাদর্শের পতাকাবাহীদের জন্য একটা অতীব গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সুনির্দিষ্ট প্রাসঙ্গিক সমস্যা। সংস্কারবাদীদের মতো জামায়াতের মূলধারাও এই ইস্যুটিকে প্রপারলি মোকাবিলা করতে পারে নাই। যার কারণে জামায়াতের এই পরিণতি।

জাতি, জাতীয়তাবাদ ও জাত্যাভিমানের মধ্যে পার্থক্যকে একাকার করে দেখা

আমার দৃষ্টিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকার মতো আপাতদৃষ্টিতে নিতান্তই একটি লোকাল ইস্যুও জাতি, জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা সম্পর্কে ইসলামের আন্ডারস্ট্যন্ডিং নিয়ে জামায়াতের তাত্ত্বিক বিভ্রান্তির সাথে সম্পর্কিত। ইসলামের দিক হতে জাতীয়তাবাদ যদি খারাপ হয় তাহলে পাকিস্তান সৃষ্টিও ইসলামের দিক থেকে ভুল ছিলো। এই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করার কারণে পাকিস্তান কায়েমের সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করা হতে মাওলানা মওদূদী বিরত ছিলেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হলো পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যবহিত পরেই তিনি পূর্ব পাঞ্জাবের পাঠানকোটে কায়েম করা তথাকথিত ‘দারুল ইসলাম’ হতে পাকিস্তানে হিজরত করতে বাধ্য হন। মুসলিম জাতীয়তানির্ভর এই পাকিস্তানকে রক্ষা করার জন্য নিজে সরকারী রেডিওতে বক্তৃতাও দিয়েছেন। আবার উনারই সংগঠন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ একই তত্ত্ব, যুক্তি ও জাতীয়তাভিত্তিক বাংলাদেশ আন্দোলনকে সম্ভাব্য সব উপায়ে বিরোধিতা করে। এখন আবার এই জাতিরাষ্ট্রকে রক্ষার করার ঈমানী শপথও নিচ্ছেন।

আমার দৃষ্টিতে জাতি, জাতীয়তা, জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বা জাত্যাভিমানের মধ্যকার পার্থক্যকে উনারা গুলিয়ে ফেলছেন। এটি শুধু জামায়াতের সমস্যা না, এটি সামগ্রিকভাবে ইসলামপন্থীদেরই এক ঐতিহাসিক মানস-সংকট। এর নিরসন হওয়া জরুরি। এবং এসব লোকাল প্রবলেম, ইসলামের সামগ্রিক বুঝজ্ঞান না থাকারই সমস্যা। কেবলমাত্র প্রতিক্রিয়াশীলতামুক্ত, স্বাধীন ও নির্মোহ আলাপ-আলোচনা-পর্যালোচনাই পারে এধরনের তাত্ত্বিক সংকট হতে মুক্তি দিতে।

আবেগ ও চিন্তার বুদ্বুদের মধ্যে নিশ্চিন্ত জীবনযাপন

দুঃখের বিষয় হচ্ছে ব্যক্তিজীবনে সচরাচর মেধাবী ইসলামপন্থীরা এ ধরনের সংকট বা সমস্যাগুলোকে আদৌ কোনো সমস্যা মনে করে না। কোরআন-হাদীসের খণ্ডিত ও অসমন্বিত (inconsistent) কিছু উদ্ধৃতি কপচিয়ে উনারা মনে করেন, সব বুঝে ফেলেছি। এক একটি বিষয়ে প্রকল্পভিত্তিক গবেষণা, মুক্ত আলোচনা, অন্ততপক্ষে দিনব্যাপী ওয়ার্কশপ করা – এসবের কোনো কিছু উনাদের সক্রিয় বিবেচনায় কখনো ছিলো না। বড়জোর সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশ্বখ্যাত কোনো স্কলারের একটা যেনতেন অনুবাদ প্রকাশ কিংবা এ ধরনের কোনো প্রকাশিত বই ক্রয় করে সেটিকে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা পর্যন্ত উনাদের ইন্টেলেকচুয়্যাল একটিভিজম সীমাবদ্ধ। চিন্তা ও আবেগের যে বুদ্বুদের মধ্যে উনারা দিনরাত নিজেদের আড়াল করে রাখেন, তার বাইরেও যে বিশাল জগত আছে, তা ভাবতে তারা অপারগ।

মাইন্ডসেট পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখছি না

জামায়াতের সংস্কারবাদীদের চিন্তা একটা লিবারেল জামায়াত প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু কোনো ধরনের বিকল্প জামায়াত দিয়ে জামায়াতের বড় ধরনের গলদগুলো সারানো অসম্ভব। ক্যাডার সিস্টেম থাকা বা না থাকার উপর এটি নির্ভর করছে না। যার উপর এই যুগোপযোগী ও কাংখিত পরিবর্তন নির্ভরশীল তা হলো মাইন্ডসেটের পরিবর্তন। সংস্কার নিয়ে এখন যেসব তোড়জোড় চলছে তাতে সর্বাত্মকবাদী মাইন্ডসেট কিন্তু অপরিবর্তিতই থাকছে। যা দেখছি।

মানুষের স্বভাবগত পরিবর্তনবিরোধী মনোভাব

এর চেয়ে গুরুতর যে কারণে আমি নিজেকে কখনো জামায়াতের সংস্কারপন্থী ভাবি না, বা যে কারণে জামায়াতের সংস্কার উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কিছু পলিশিং ও গ্যালভানাইজিংয়ের বেশি কিছু হবে না, তা হলো ব্যক্তি ও সংগঠন ব্যবস্থার অন্তর্গত (inherent) পরিবর্তনবিরোধী (change resistant) বৈশিষ্ট্য। অর্গানিক থিওরি অনুসারে সংগঠন ব্যবস্থাসমূহও ব্যক্তি বিশেষের মতো। ফলে তা পরিবর্তনবিরোধী। এটি বুঝার জন্য বিশেষ কোনো একাডেমিক গবেষণার দরকার নাই।

প্রত্যেক সংগঠনেরই নির্দিষ্ট কনস্টিটিউয়েনসি থাকে

নির্দিষ্ট কিছু মৌলিক ভাবনা (paradigm of thought), নির্দিষ্ট জনপদ যার রয়েছে নিজস্ব ও স্বতন্ত্র ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি, নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক শ্রেণিভিত্তি, নির্দিষ্ট একটা সংগঠন পদ্ধতির সমষ্টি হচ্ছে এক একটা সংগঠন ব্যবস্থা । এক কথায় যাকে আমরা constituency বলতে পারি। রাজনীতিতে যেমন জননেতারা স্বীয় নির্বাচনী এলাকার লোকজনদের সমন্বিত মতামতের বাইরে যেতে পারে না তেমনই কোনো সংগঠনের নেতা-কর্মীরা চাইলেই সেই সংগঠনের প্রতিষ্ঠালগ্নের ধ্যান-ধারণার (foundation-paradigm) বাইরে যেতে পারে না। কনস্টিটিউয়েনসির অদৃশ্য সূতা মধ্যাকর্ষণ শক্তির মতো করে সংগঠন ব্যবস্থাসমূহকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য সহকারে টিকিয়ে রাখে।

তাহলে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন তাবলীগের লোকেরা একসমসয়ে জামায়াতে যোগদান করবে, প্রফেসর গোলাম আযম সাহেবের এমন আশাবাদ কেন ভুল প্রমাণিত হয়েছে। উনার ‘ইক্বামতে দ্বীন’ বইয়ে এমন অবাস্তব বুদ্ধিবৃত্তিক আশাবাদের (anticipation) কথা বলা আছে। বাস্তবে কোনো অসংগতি বা ভুল দেখা দিলে মানুষ ক্বদাচিৎই ভাবে, হতে পারে সমস্যাটা তাত্ত্বিক। তত্ত্বগত সমস্যাকে আমরা প্রায়ই ভুলবশত প্রয়োগগত সমস্যা মনে করি।

আমি তো মনে করি না যে আগামী দিন বাদে পরশু বা কোনো একদিন তাবলীগ জামায়াতের লোকেরা জামায়াতে জয়েন করবে বা জামায়াতের লোকেরা তাবলীগে যোগ দিবে। এমনকি মধ্যবাম হিসাবে আওয়ামী লীগ ও মধ্যডান হিসাবে বিএনপি পরষ্পরের খুবই কাছাকাছি হওয়া সত্বেও কেন্দ্র হতে মাত্র কয়েক ডিগ্রি এদিক-ওদিকের এ দু’টি দলও শেষ পর্যন্ত স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে চলবে। টিকে থাকবে কিনা সেটি ভিন্ন প্রশ্ন।

ইসলামের সবটুকু জামায়াতে ইসলামী বা এ ধরনের একটিমাত্র সংগঠনের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হতে হবে কেন

অতএব, সমকালীন প্রেক্ষাপটে ইসলাম নিয়ে যা যা করণীয় তা সব জামায়াতে ইসলামীকে দিয়েই যারা বাস্তবায়ন করতে চান তা তাদের অতিসরল ও অবাস্তব আশাবাদ ছাড়া আর কিছু নয়। জামায়াতে ইসলামী বা এ ধরনের কোনো সংগঠন যদি এমনটা মনে করে বা দাবি করে তাহলে তা হবে নিজেদের ও সমকালীন জীবনব্যবস্থা সম্পর্কে তাদের অতিরিক্ত ও অমূলক আত্মবিশ্বাস। আমি সরাসরি ‘মিথ্যা দাবি’ কথাটা ব্যবহার করলাম না!

এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, কেন আমি জামায়াতের সংস্কারবাদী নই।

জায়ান্ট ট্রি মডেলের অকার্যকারিতা –

এ বিষয়ে আর একটি কথা না বললে নয়। তা হলো, সংগঠন ব্যবস্থা। না আমি ক্যাডার সিস্টেমের কথা বলছি না। তার চেয়ে মৌলিক একটা দিকে আমি আলোকপাত করতে চাই। তা হলো জামায়াত কিংবা যে কোনো সংগঠন ব্যবস্থার জন্য এ পর্যন্ত চলে আসা কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা (centralized system)। বর্তমান সংগঠন ব্যবস্থাকে আমি একটা বট বৃক্ষের সাথে তুলনা করতে পারি। যার শেকড়, প্রধান কাণ্ড, শাখা-প্রশাখা, ফুল ও পাতা পরষ্পর পরষ্পরের অংশ। এই জায়ান্ট ট্রি মডেলেই সব সংগঠনগুলো চলছে।

সামাজিক সংগঠন ব্যবস্থা আর প্রশাসনিক কাঠামো এক বিষয় নয়

আমার দৃষ্টিতে টপ-ডাউন তথা পিরামিড সিস্টেম মূলত প্রশাসনিক ব্যবস্থার নকশা বা মডেল। সামাজিক সংগঠনগুলোর ক্ষেত্রে এই কাঠামোর সুবিধা হলো কেন্দ্র হতে নাযিল করা কোনো কিছু সরাসরি সবখানে পৌঁছে যায়। এই সুবিধাই যে কোনো সংগঠনের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। যেমনটা বর্তমানে জামায়াতের হয়েছে। কেন্দ্র যখন কোনো বিপদে পড়ে, বা সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারে না তখন পুরো কাঠামোটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ভেংগে পড়ে বা আক্রান্ত হয়। স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা কেবলমাত্র কেন্দ্রীয় কর্তা ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত থাকে। অথচ তারা পেরিফেরির সব বিষয় ভালো করে বুঝেন না। না বুঝাই স্বাভাবিক। কারণ, সামাজিক ব্যাপারগুলো তুলনামূলকভাবে জটিল ও অধিকতরভাবে স্থানিকতা (locality) দ্বারা প্রভাবিত। সে তুলনায় প্রশাসনিক ব্যাপারগুলো বেশ মোটা দাগের ও সঠিক তথ্য পাওয়া সাপেক্ষে কেন্দ্র থেকে অনুমানযোগ্য। সামাজিক সংগঠন ব্যবস্থাকে প্রশাসনিক ব্যবস্থার সাথে মিলিয়ে ফেলা হলো ডিমের ঝুড়িকে আলুর বস্তা মনে করা মতো গ্রস মিসটেক।

ওয়াইড গার্ডেন মডেল

সামরিক ও রাজনৈতিক বিষয় বাদে বর্তমান সময়ে সংগঠন ব্যবস্থা হবে একটি বিস্তীর্ণ বাগানের মতো। চাই তা বুদ্ধিবৃত্তির কাজ হোক, সাংস্কৃতিক কাজ হোক, সমাজসেবার কাজ হোক, আধাত্মিকতার কোনো ব্যাপার হোক, প্রতিটা ‘গাছ’ একই মাটির নির্যাস নিয়ে একই আলো বাতাসে নিজ নিজ সম্ভাবণার নিরিখে বেড়ে উঠবে, নিজের মতো করে টিকে থাকার সংগ্রাম করবে, এমনকি পরষ্পরের সাথে টিকে থাকার ও বেড়ে উঠার প্রতিযোগিতাও করবে।

নেতৃত্ব চাওয়া ও নারীদের অধিকার নিয়ে শরীয়াহর নামে প্রচলিত ট্যাবু

জামায়াতের লোকেরা কখনো নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতার কথা ভাবতে পারে না। এ যেন এক বিলকুল হারাম জিনিস। ইবাদতের বিষয়ে নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের সাথে সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বিলকুল গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। অথচ ভালো কাজে পরষ্পরের প্রতিযোগিতা করতে উৎসাহিত করা হয়েছে, আমরা জানি। আর নেতৃত্ব না চাওয়ার যে হাদীসটাকে তারা ‘রক্ষাকবচ’ মনে করে তার কনটেক্সট সুনির্দিষ্ট ও স্বতন্ত্র।

আমরা জানি, আল্লাহর রাসূল (সা) নারীদের মসজিদে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন এবং তাদেরকে এ কাজে বাধা না দেয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। এহেন সুস্পষ্ট হুকুমকে অকার্যকর করার জন্য আপাতদৃষ্টিতে নিষেধাজ্ঞাসূচক দু’একটি হাদীসকে কনটেক্সট হতে বিচ্ছিন্ন করে পেশ করা হয়। একটা উদাহরণ হিসাবে বিষয়টির অবতারণা। টেক্সটের নির্মোহ ও নিরপেক্ষ তথা অবজেকটিভ পাঠ জরুরি হওয়া সত্বেও মানুষ সাধারণত স্বীয় মানসিক ঝোঁক ও প্রবণতার দৃষ্টিতে কোনো টেক্সট হতে পাঠ গ্রহণ করে। এ জন্য যার যা রুচি, সে মোতাবেক তিনি এবারত (রেফারেন্স), উত্তর ও ফতোয়া খুঁজে পান।

কোরআন-হাদীসের ভুল প্রয়োগ

জামায়াত যেসব ইসলামী দলকে কোরআন-হাদীসের ভুল প্রয়োগের জন্য সমালোচনা করে তা সঠিক কিংবা ভুল কিনা তা নিয়ে এই নোটে আমি মন্তব্য না করলেও তারাও যে একই কাজ কোনো কোনো ক্ষেত্রে করে, সেটা জামায়াতের লোকেরা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেন না। আসলে তারা বুঝতে চান না, তাই বুঝেন না। মানুষ তার মনের চোখে প্রথমে দেখে, মনের কানে প্রথমে শোনে।

গ্লোবাল ভিলেজ সিস্টেম

জামায়াতের সংস্কারবাদীরা জামায়াতের মতোই একটা সেন্ট্রালাইজড সংগঠন কায়েম করতে চান। আর আমি চাই একই মতাদর্শের বৃহত্তর পরিসরের মধ্যে ডিসেন্ট্রেলাইজড সিস্টেমে সংগঠন-গুচ্ছ গড়ে উঠুক। আমি বিস্তীর্ণ বাগান (wide garden) পদ্ধতিতে বা মৌচাকের মতো করে সংগঠন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পক্ষপাতী। বিশেষ করে বর্তমান গ্লোবাল ভিলেজ সিস্টেমে সর্বাত্মকবাদী সংগঠন ব্যবস্থা অচল। এর থাকার সুবিধার চেয়ে না থাকার ফযিলত বেশি।

এলাকাভিত্তিক সাংগঠনিক ইউনিট পদ্ধতির অকার্যকারিতা

আর একটি সিগনিফিকেন্ট বিষয়ে আমার স্বতন্ত্র অবজার্ভেশান রয়েছে। তা হলো সাংগঠনিক ইউনিট বা শাখা কায়েমের পদ্ধতি। জামায়াতসহ সব সংগঠন ব্যবস্থায় ইউনিট কায়েম করা হয় এলাকাভিত্তিক। আমার মতে তা হতে হবে যার যার ঝোঁক, প্রবণতা, যোগ্যতা, বয়স ও সামাজিক মর্যাদা অনুসারে। এই ক্ষুদ্র বিষয়টি কাজের দিক থেকে যথেষ্ট তাৎপর্যবহ।

জামায়াতের সংস্কারবাদীরা কি কখনো এসব নিয়ে ভেবেছেন? অন্তত আমি জানি না।

(৫) সামগ্রিকতার ভুল আন্ডারস্ট্যান্ডিং

রাজনৈতিক সংস্কার তথা রাজনীতিই জামায়াতের সংস্কারবাদীদের উক্ত বা অনুক্ত লক্ষ্য। যারা ‘রাজনীতি করি না’ বা ‘করবো না’ টাইপের কথা বলেন তারাও দেখেছি ঘনিষ্ট ব্যক্তিগত আলাপে বলেন, ‘আরে, এসব কাজের ফলাফল তো শেষ পর্যন্ত আমাদের বাক্সেই আসবে’। কী আশ্চর্য! রাজনীতি নিয়ে মশগুল (obsessed) জামায়াতের লোকেরা দুইটা মৌলিক ভুল করেন।

প্রথম মৌলিক ভ্রান্তি:

মানুষের জীবনে যা কিছুই অপরিহার্য সে সব কিছুকেই তারা সংগঠনের কনসার্নিং বিষয় বলে মনে করেন। ভাবেন, ওতেই বুঝি সামগ্রিকতা রক্ষা হবে।

জিহাদ নিয়ে ডিলেমা

যদি সামগ্রিকতাই রক্ষা করা অপরিহার্য মনে করা হয় তাহলে মানুষের জীবনে সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও তো অপরিহার্য ব্যাপার। জামায়াতের ঘোষিত কর্মসূচি বা কাজকর্মে এর অন্তর্ভুক্তি ও প্রতিফলন কই? এ বিষয়ে কোরআন-হাদীসের রেফারেন্স তো প্রচুর। তাই না? অবশ্য বিরোধী দলের সাথে ট্রাডিশনাল মারামারির সময় জিহাদের রেফারেন্সগুলোকে ব্যবহার করা হয়। এটি স্ববিরোধিতা এবং কোরআন-হাদীসের অপব্যবহার ছাড়া আর কিছু নয়। পারষ্পরিক বাদ-বিসম্বাদগুলো জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ নয়, যদিও হক্বের ওপর থাকা নিহত ব্যক্তি যে কোনো ধরনের সংঘর্ষেই শহীদী মর্যাদা পাবে।

ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে স্ববিরোধ

অর্থনৈতিক সামর্থ্যও মানবজীবনের একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জামায়াত সাংগঠনিকভাবে কোনো ব্যবসা করবে না – এটি মাওলানা মওদূদী অনেক আগেই বলে গেছেন যা জামায়াতে ইসলামীর কার্যবিবরণী নামক বইয়ে উল্লেখ করা আছে। এতদসত্বেও জামায়াতে ইসলামীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উদ্যোগে ইসলামের সামাজিকীকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের নামে বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে যেগুলোর ভায়াবিলিটি, কোয়ালিটি ও লাভ-ক্ষতি প্রশ্নসাপেক্ষ। ব্যাপারটা স্ববিরোধীও বটে।

দ্বিতীয় মৌলিক ভ্রান্তি

এ ব্যাপারে জামায়াতের দ্বিতীয় যে চিন্তাবিভ্রাট তা হলো, মানুষের জীবনে কোনো কিছু অপরিহার্য হওয়া মানে এই নয় যে এটি অর্জিত হয়ে গেলে অপরিহার্য বাদবাকিগুলোও আপনাতেই বা খুব সহজেই কায়েম হয়ে যাবে।

মার্ক্সও এ ধরনের ভুল করেছেন

মানবজীবনের যে কোনো পর্যায়ে অর্থনীতির একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও যে কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে অর্থনীতির একটা যোগসূত্র থাকায় কম্যুনিস্টরা মনে করে অর্থনীতিই সবকিছুর নির্ণায়ক। প্রমাণ হিসাবে তারা দেখায়, এমন কোনো ঘটনা নাই, হতে পারে না, যেখানে অর্থনীতির কোনো উপযোগিতা বা সংশ্লিষ্টতা নাই।

রাজনৈতিক ইসলামের ধারণা প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব অথবা দায়

সাম্যবাদীদের এই ভুল জেনারালাইজেশানের মতো জামায়াতের লোকেরাও মনে করে, মানুষের যে কোনো উত্থান-পতন ও বড় ধরনের ঘটনাপ্রবাহের সাথে যেহেতু রাজনৈতিক উত্থান-পতন ও ঘটনা প্রবাহের প্রভাব, গুরুত্ব ও ভূমিকা রয়েছে; অতএব, রাজনীতিই হচ্ছে মূল জিনিস। যেন ইউনিভার্সাল মেজিক স্টোন। তাদের মতে, রাজনীতি ঠিক হয়ে গেলে সবকিছু আপনা-আপনি ঠিক হয়ে যাবে। তাই তারা নিতান্ত সওয়াবের নিয়তেই রাজনীতি করেন। রাজনীতিকে ইনারা রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে না দেখে একে এক প্রকারের ধর্মীয় বিষয় মনে করেন! ধর্ম বিবর্জিত রাজনীতির বিরোধিতা করতে গিয়ে ধর্ম আর রাজনীতির বিভাজনকেই গুলিয়ে ফেলেছেন।

স্বতন্ত্র্যতা (particular) মানে বাদ দেয়া (exclusion) কিংবা সামগ্রিকতার (holistic) দৃষ্টিতে দেখা মানে একাকার (identical) করে ফেলা বুঝায় না

কোনো মানুষের বেঁচে থাকার জন্য তার ফুসফুস সক্রিয় থাকা যেমন জরুরি তেমনি তার হৃৎপিণ্ড সচল থাকাও জরুরি। মস্তিষ্ক আবার এ দুটো থেকে আলাদা। এমনিভাবে সব অপরিহার্য অংগ একে অপরকে সাপ্লিমেন্ট করে। এ সবগুলোর অপরিহার্যতা সত্বেও সবগুলো অঙ্গ নিয়েই মানুষটা। ইসলামও তেমনই। এর এক একটি শাখা-প্রশাখাকে স্বতন্ত্রভাবে বুঝতে হবে। স্বাতন্ত্র্য মানে বিরোধিতা বা বিচ্ছিন্নতা নয়। আবার সামগ্রিকতা মানে সব কিছুকে এক করে ফেলাও (messed up) নয়। এটা বুঝতে হবে। জামায়াতের সংস্কারবাদীরা এসব অতি প্রয়োজনীয় কনসেপ্টচুয়্যাল বিষয়গুলো বুঝতে ও মানতে নারাজ। এমনকি তাদের ওসব নিয়ে তেমন কোনো আগ্রহও লক্ষ করা যায় না।

সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক

আর একটা জিনিস তারা প্রায়ই গুলিয়ে ফেলেন। তা হলো রাষ্ট্র ও সমাজের পার্থক্য। জামায়াতের মূলধারা তথা সংগঠনবাদী ও এর আধুনিক সংস্কারবাদীরা ক্ষমতায় যাওয়ার চিন্তায় এতটাই আচ্ছন্ন যে তাদের দৃষ্টিতে সামাজিক বিষয়গুলো রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য পেলে সহসাই গড়ে উঠবে। এর উল্টা মানে হলো, রাষ্ট্রীয় প্রতিকূলতার মুখে কোনো সামাজিক এপ্রোচ সফল হতে পারে না। এটি তাদের মজ্জাগত দোষারোপ চর্চার মানসিকতা (blame game) এবং আক্রান্ত-দুর্বলের মতো ষড়যন্ত্র তত্ত্বে (conspiracy theory) আত্মসমর্পণের পরিচায়ক।

মূলকথা হলো রাষ্ট্র না থাকলেও সমাজ থাকবে। রাষ্ট্র ক্ষমতায় না থেকেও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী হওয়া যায়। অতীতের তুলনায় বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় মানুষের জীবনের বৃহদাংশ জাতি-রাষ্ট্র ও এর সরকার বিশেষের নিয়ন্ত্রণের বাহিরে থাকে। অন্ততপক্ষে প্রত্যক্ষ ও নিরংকুশ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ একশ বছর আগের তুলনায় বর্তমানে অধিকতর দুর্বল। সামাজিক বুনিয়াদের উপরই রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে উঠে ও কায়েম থাকে। বিপরীত দিকে, রাষ্ট্র ব্যবস্থাও সামাজিক গড়ন ও পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। বলাবাহুল্য, সমাজ হলো এমন একটা সত্তা যা প্রতি নিয়ত নানা রকমের ফ্যক্টরের প্রভাবে নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিবর্তিত হতে থাকে।

‘কাজ’ করার উপযোগী ধরন

‘কাজে’র ব্যাপারে আমার দৃষ্টিভঙ্গি খুবই স্বচ্ছ, যদিও তা বর্তমানে প্রচলিত কোনো সংগঠন ব্যবস্থার সাথে মিলে না। আমার মতে প্রত্যেকে নিজ নিজ পটেনশিয়াল ফিল্ডকে বেছে নিবে এবং কেবলমাত্র সেই ক্ষেত্রেই সে পূর্ণ মনোনিবেশ করবে। অতএব, এ হিসাবে সংস্কৃতি কর্মীরা শুধু সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথেই জড়িত থাকবে অন্য কিছুর সাথে জড়াবে না। বুদ্ধিবৃত্তির কাজ যারা করবে সুরা তাওবার ১২২নং আয়াতের মর্মানুযায়ী তারা কেবলমাত্র বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার কাজই করবে। যারা সমাজসেবামূলক কাজকে বেছে নিবে এটি হবে তাদের মূল কর্মক্ষেত্র। যারা রাজনীতি করবে তারা তাতেই পূর্ণ মনোনিবেশ করবে। একইসাথে রাজনীতি, ধর্ম, সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তি ইত্যাদি চলবে না। নিজের কর্মক্ষেত্রের বাহিরে অন্যান্য বিষয়ে প্রত্যেকে অকেশনালি সহযোগিতা করবে।

ইসলামের সামগ্রিকতাটা থাকবে প্রত্যেকের চিন্তায়, চেতনায় ও নির্দিষ্ট উপলক্ষ্যে। আপদকালে যেমন জাতীয় দূর্যোগে সবাই লড়াই করবে। ভোট ইত্যাদি সময়ে ভোট দিয়ে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করবে। এভাবে।

এ ধরনের discrete বা segment type of working method সম্পর্কে জামায়াতের সংস্কারবাদীদের কোনো চিন্তা বা আগ্রহ আমার নজরে পড়ে নাই।

সংগঠনবাদী কিংবা সংস্কারবাদীদের কেউ কি এসব কথা শুনবে?

এই লেখা পড়ে সংগঠনবাদী কিংবা সংস্কারবাদীদের কেউ যে সংশোধন হবে, এমনটা আমি আশা করি না। শুরুতেই যেমনটা বলেছি, এই লেখার উদ্দেশ্য হলো আমার নিজের অবস্থানকে পরিষ্কার করা। কেউ যদি এতে কিছুটাও উপকৃত হয় সেটি আল্লাহর রহমত। যাদেরকে আমি সংগঠনবাদী হিসাবে সোনার বাংলাদেশ ব্লগে উল্লেখ করা শুরু করেছিলাম (এখন এটি একটা টার্ম হিসাবে চালু হয়ে গেছে) এতোদিন তো তারা আমার উপর ক্ষেপে ছিলো; এই লেখার পর, ধারণা করছি, জামায়াতের সংস্কারবাদীরাও আমার উপর ভীষণ ক্ষেপবেন। সেটি তাদের ব্যাপার। ভয়-ডর তো আল্লাহ তায়ালা আমাকে খুব কম পরিমাণেই দিয়েছেন, সেটি আমাকে যারা ব্যক্তিগতভাবে চিনেন, তারা ভালো করেই জানেন। সে যাই হোক।

(৬) এস্টাবলিশমেন্ট প্রবলেম

যেসব কারণে জামায়াতের সংস্কাবাদীদের সাথে আমি নাই তার অন্যতম বড় একটা ব্যাপার হলো টাকা-পয়সা। না, জামায়াতের সংস্কারবাদীদের টাকা-পয়সা নাই, বা থাকলেও আমাকে দিচ্ছে না – ওসব কিছু নয়। আমি ‘ফকির-ফ্যাকরা’ মানুষ। আল্লাহ সাক্ষী, স্ত্রীসহ সরকারী চাকুরি করা সত্বেও আমার কোনো ফরমেটেই, কোনো পরিমাণেরই টাকা-পয়সা নাই। কোনো ‘জমা-জাতি’ নাই। কোনো জায়গা নাই। ফ্ল্যাট নাই। কোথাও কোনো শেয়ার নাই। আমর বউয়েরও আমার মতো একটা ক্ষেপাটে গোবেচারা স্বামী ও দুটি ততধিক অবুঝ মেয়ে সন্তান ছাড়া আর কিছু নাই। হ্যাঁ, এই যে ল্যাপটপ, যেটাতে টাইপ করছি, সেটি আছে। এ রকম আরো কিছু প্রযুক্তি সামগ্রী আছে যা দিয়ে ‘সমাজ ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন কেন্দ্র’ (CSCS) চলে।

প্রযুক্তি ও মূল্যবোধের সম্পর্ক

সচরাচর প্রযুক্তির সাথে মূল্যবোধের অবক্ষয়কে আমরা দেখি। পেশাগত জীবনের প্রথম থেকে তাই প্রযুক্তির সাথে মূল্যবোধের সমন্বয় করার চেষ্টা করেছি। এজন্য নিজেকে সবসময়ে সর্বশেষ (সামাজিক) প্রযুক্তির সাথে সম্পৃক্ত রাখার চেষ্টা করেছি। জীবনের সব উপার্জন এই প্রযুক্তির পেছনে ব্যয় করেছি। সে জন্য আমার বয়েসী অন্য অনেকের চেয়ে তরুণ প্রজন্মের পালসটাকে বোধহয় অধিকতর সঠিকভাবে বুঝতে পারি। সে জন্যই হয়তোবা ‘সিএসসিএস’ এখন বাংলাদেশের ইসলামপ্রিয় লোকদের অনেকের কাছে একটা পরিচিত নাম।

‘ক্যারিয়ার সেক্রিফাইস’ পলিসির কুফল

আমার মতো ‘যাকাত ফরজ না হওয়া’ লোকদের সাথে জামায়াতের সংস্কারবাদীদের কেমন করে মিলবে যখন তারা সবাই হলেন এক একজন মাশাআল্লাহ যথেষ্ট সম্পদশালী। তৎকালীন ইসলামী ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় পলিসি হিসাবে ক্যারিয়ার সেক্রিফাইসের যে সর্বনাশা ফর্মুলা অনুসরণ করা হয়েছে তার পরিণতিতে প্রাক্তন শিবির নেতারা বিসিএস বা এ ধরনের উপযুক্ত আয়-উপার্জনের সুযোগ থেকে গণহারে বঞ্চিত হয়েছেন। তাকে কী? সাংগঠনিক সুনাম ও দক্ষতা তো আছে। এসবকে পুঁজি করে এখন তারা এক একজন মাশাআল্লাহ যথেষ্ট বিত্তশালী।

কমিটমেন্ট ও এস্টাবলিশমেন্টের মধ্যকার অম্ল-মধুর সম্পর্ক

বিত্তশালী হওয়া খারাপ না। সেগুলোর যে দুনিয়াবী-উত্তাপ তা হজম করতে না পারাটাই হলো সমস্যা। আমার মতো আপার লেভেলের পেশাজীবীদের পদ-পদবীর উত্তাপও বিপ্লবী হওয়ার পথে বড় বাধা। কোন জাদুমন্ত্রের বলে যেন ছাত্রজীবন শেষ করার সাথে সাথে নানা রকমের ব্যবসায়িক উদ্যোগ নিয়ে এক একজন এলিট বনে গেছেন। এলিট বনে যাওয়া খারাপ কিছু নয়। সমস্যা হলো এলিটিজমের আগুন হতে নিজেকে রক্ষা করতে না পারা।

এক সময় জামায়াত-শিবিরের লোকদের ক্যারিয়ার ছিলো না। তখনকার নীতি ছিলো ‘ক্যারিয়ার সেক্রিফাইস’ করা। এখন তাদের নিজ নিজ মতো ঈর্ষণীয় এস্টাবলিশমেন্ট এবং ক্যরিয়ার। কিন্তু নাই সেক্রিফাইস করার মন-মানসিকতা। সুযোগ পেলেই যিনি এই করা দরকার, সেই করা দরকার বলে মুখে ফেনা তুলেন তাকেই যখন কিছু করার জন্য বলা হয় তখন তার সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠা তাকে পেছন দিকে টেনে ধরে। দেশ ও জাতির বৃহত্তর কল্যাণের জন্য তখন তিনি নিজেকে অক্ষুন্ন রাখাটাকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন! বিপ্লবের জন্য তথা সিগনিফিকেন্ট কিছু করার জন্য এস্টাবলিশমেন্টের সহযোগিতা দরকার হলেও এ কথা সত্য যে, এস্টাবলিশমেন্টে মশগুল কাউকে দিয়ে র‍্যাডিক্যাল কিছু করা সম্ভব হয় না।

বেনিফিশিয়ারিদের দিয়ে কাজের কাজ কিছু হওয়ার নয়

এর পাশাপাশি জামায়াতের সংস্কার নিয়ে যারা উচ্চকণ্ঠ তাদের একটা অংশ পরোক্ষভাবে জামায়াতের কাছ হতে আর্থিক বা প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা উভয় দিক হতে বেনিফিশিয়ারি। জামায়াতের যারা বেনিফিশিয়ারি, তা যেভাবেই হোক না কেন, তারা কীভাবে জামায়াতের উপর সংস্কারের জন্য চাপ সৃষ্টি করবেন? আমার বুঝে আসে না। সেজন্যই কোনো এক লেখায় লিখেছিলাম, জামায়াতের সংস্কারবাদীদের অবস্থা হলো বড় ভাইয়ের কাছে ছোট বোনের আবদার কিংবা রাগ-গোস্বা করার মতো। ভাই জানে একটু কিছু দিলেই বোনটি আমার সুর সুর করে কান্না ভুলে সেবা-যত্ন শুরু করে দিবে।

ভোগবাদী মানসিকতা অন্যতম প্রধান সমস্যা

পেশাজীবী হিসাবে ক্যারিয়ার গড়ে তোলা বা ব্যবসায়ী হিসাবে টাকাপয়সা বানানো বা জামায়াতের হালুয়া-রুটি খাওয়া – ব্যাপার যাই হোক না কেন, এগুলোর চেয়ে বড় সমস্যা হলো সংস্কারবাদীদের প্রায় সবাই ভেতরে ভেতরে ভীষণ ভোগবাদী। এই কনজিউমারিস্ট মেন্টালিটিটা মারাত্মক সমস্যা। তারিক রমাদানের ভাষায় এরা হলেন ‘হালাল ক্যপিটালিজমে’র একনিষ্ঠ অনুরক্ত ও অনুসারী।

সারাজীবন সেক্রিফাইসের কথা বলতে বলতে ইনারা বোধহয় হয় খুব বিরক্তি ও হতাশাবোধ করে থাকবেন। তাই কর্মজীবনে তাদের চালচলনে আর দশজন স্টাবলিশড লোক থেকে কোনো বিশেষ পার্থক্য নাই। অধীনস্তদের সাথে আচরণে ইনাদের অনেকের সম্পর্কেই খুব খারাপ কথা শুনতে পাই। টাকা-পয়সা লেনদেনের ব্যাপারেও ইনাদের ট্র্যাক রেকর্ড খুব খারাপ। আদর্শ হলো ত্যাগের ব্যাপার। এমন লোকদের পক্ষে কখনো সাময়িকভাবে কোনো চমক দেখানো সম্ভব হলেও সত্যিকারের টেকসই সামাজিক মূলধারা সৃষ্টির কাজে তাদেরকে পাওয়া অসম্ভব।

আখেরী মন্তব্য

শুধুমাত্র এমন বোতলেই পানি ঢালা যায় যাতে সত্যি সত্যিই কিছু জায়গা খালি আছে। এমন মাটিতেই চারা জন্মাতে পারে যা পানি শোষণ করে কিছুটা ধরেও রাখতে পারে। যার সাথে সূর্যালোকের সম্পর্ক আছে। জেগে থাকা লোকদেরকে তো জাগানো সম্ভব না। তাই যারা জামায়াতে আছেন তারা শেষ পর্যন্ত জামায়াতেই থাকবেন, যেই পন্থী হিসাবেই থাকুন না কেন। দিন শেষে তারা জামায়াত।

আর হ্যাঁ, যত দমন-পীড়নই চলুক না কেন, কোনো নিষেধাজ্ঞাই জামায়াতকে নিশ্চিহ্ন করতে পারবে না। যে কারণে জামায়াতের ভিতরে সাবস্ট্যানশিয়াল পরিবর্তন সম্ভব নয়। সেই একই কারণে জামায়াতের এনিহিলেশানও সম্ভব নয়। উপরে এই বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে। তা হলো জামায়াতের কনস্টিটিউয়েনসি। না, এটি পলিটিক্যাল কনস্টিটিউয়েনসি নয়। এটি এ দেশের মাটি ও মানুষের ধর্মচেতনায় জামায়াতের মতো কিছুটা রক্ষণশীল ও কিছুটা উদার ইসলামী চিন্তার প্রতি আস্থা ও সমর্থন।

*****

[পুরো লেখাটি ফেসবুক চার পর্বে দেয়া হয়েছিলো। সেখানকার মন্তব্য-প্রতিমন্তব্যগুলো পড়তে চাইলে ভিজিট করুন: প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্ব, তৃতীয় পর্বচতুর্থ পর্ব। এছাড়া একজন পাঠকের মন্তব্যের প্রেক্ষিতে লেখা প্রতি-উত্তর পড়ুন: চিন্তার প্যারাডাইম, প্যারাডাইমের পরিবর্তন ও চিন্তাগত উন্নয়ন প্রসংগে কিছু প্রতিমন্তব্য]

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *