নৈতিকতার ‘শূন‍্য-মানদণ্ড’ নীতি

নৈতিকতার মানদণ্ড আমরা কোথায় পাবো? ধর্মগ্রন্থ হতে পারে নৈতিকতার উৎস। প্রকৃতি হতে পারে নৈতিকতার উৎস। সামাজিক সম্মতি হতে পারে নৈতিকতার উৎস। কারো কারো মতে, বিশেষ করে বিজ্ঞানবাদী দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক স্যাম হ্যারিসের মতে, বিজ্ঞান হতে পারে নৈতিকতার উৎস। তাঁর ভাষায়, science can answer the moral questions।

নৈতিকতার উৎস বা মানদণ্ড নিয়ে এ ধরনের বিতর্কের পূর্বধারণা বা গোড়ার কথা হলো – যেভাবেই হোক না কেন, নৈতিকতা বলে কিছু আছে যার পরিমাপযোগ্য মানদণ্ড থাকা উচিত। প্রশ্ন হলো, নৈতিকতা সম্পর্কে এ ধরনের একটি presupposition বা স্বীকার্য সত্য আমরা কোত্থেকে পেলাম? এটি নৈতিকতা সংক্রান্ত মৌলিক তাত্ত্বিক প্রশ্ন বা অন্যতম বেসিক ontological question।

আমার মতে, নৈতিকতার নিরপেক্ষ মানদণ্ড খুঁজে পাওয়ার গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হতে পারে ‘নৈতিকতার শূন‍্য-মানদণ্ড পদ্ধতি’।

এর মূল কথা হলো, যে বিষয়ে নৈতিকতার মানদণ্ড বা পরিসর নিয়ে আলোচনা বা বিতর্ক করা হচ্ছে সেটাতে সব ধরনের আরোপিত নৈতিক বাধ্যবাধকতাকে স্থগিত করে পুরো বিষয়টাকে একেবারে শূন্য হতে শুরু করা। এই ধরনের নৈতিক নিরপেক্ষ পরিস্থিতিতে ফলাফল বা ঘটনা কী হতে পারে, তা যাচাই বা অনুমান করা। তারপর সব পক্ষ যেসব করণীয় বিষয়ে বা নৈতিকতার যতটুকু সীমা সম্বন্ধে একমত হবে তাকে গ্রহণযোগ্য কর্মপন্থা তথা নৈতিকতা হিসাবে গ্রহণ করা।

দেখা যায়, নৈতিকতা সংক্রান্ত নানাবিধ বিষয়ে আমরা আলোচনাগুলো মাঝখান থেকে শুরু করি। যার কারণে নৈতিকতার সীমা-পরিসীমা সংক্রান্ত আলোচনাগুলো সাধারণত ফলপ্রসূ হয় না।

প্রত্যেক নৈতিক প্রস্তাবনার পিছনে থাকে কোনো না কোনো দৃষ্টিভঙ্গি, কারণ বা যুক্তি। বাস্তবতা হলো, কোনো বিষয়ের এথিকস থেকে মেটাফিজিক্সকে আল্টিমেটলি আলাদা করা যায় না। কান টানলে মাথা আসার মতো এর একটির আলোচনাতে অন্যটির প্রসঙ্গ অনিবার্যভাবে চলে আসে।

নিজের মতকে নৈতিক হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য বা চিন্তাভাবনা ও আলাপ-আলোচনার ক্রিটিক্যাল পথকে এড়ানোর জন্য সাধারণত আমরা নৈতিকতা সংক্রান্ত বিষয়গুলো বিবেচনার সময়ে সংশ্লিষ্ট অধিবিদ্যাগত আলোচনাকে এড়িয়ে যাই। এ ধরনের যুক্তিভীতি বা অসহিষ্ণু ডগম্যাটিক মনোভাবের কারণে আমাদের নৈতিক আলোচনাগুলো সবসময়ই খণ্ডিত ও বিরোধপূর্ণ থেকে যায়।

নৈতিকতার এই শূন্য নীতি অবলম্বন করার সুবিধা হলো, আপনি প্রমাণের বোঝা বা burden of proof থেকে বেঁচে যাবেন। নৈতিকতা সংক্রান্ত যে কোনো বিষয়ে আপনি এই নীতি সফলভাবে প্রয়োগ করতে পারেন। সুনির্দিষ্ট উদাহরণ ও কেস স্টাডির অবতারণা করে আমি এই আলোচনার কলেবর আর বাড়াতে চাচ্ছি না।

*****

মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য:

Md Habibur Rahman: শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছে একটা প্রশ্ন নিয়ে কিছু পাঠক আসলেন। প্রশ্নটা ছিল – আপনার লেখা যতটা বুঝি, রবি বাবুর লেখা ততটা বুঝি না কেন? শরৎ বাবু জবাব দিলেন, “আমি তো লিখিই আপনাদের জন্য। আর রবি বাবু লেখেন আমাদের জন্য।”

দুইবার পড়লাম। পদ্ধতিটি তবু বুঝিনি। উদাহরণ দরকার (আমার ও আমার মতো পাঠকদের জন্য)।

Mohammad Mozammel Hoque: মনে করেন, পোশাকের ব্যাপারে কথা হচ্ছে। কতটুকু পোশাক কীভাবে পড়লে শালীনতা বজায় থাকবে, তা নিয়ে বিতর্ক। স্বভাবতই প্রগতিশীলরা স্বল্প পোশাকের পক্ষে বলবে। রক্ষণশীলরা এর বিরোধিতা করবে। এক্ষেত্রে নৈতিকতার শূন্য মানদণ্ড নীতির প্রয়োগ করে আপনি কোনো প্রকারের পোশাক না থাকলে কী হতো, সে প্রসঙ্গটি আলোচনায় নিয়ে আসতে পারেন। এতে করে স্বল্প পোশাকের পক্ষে যারা বলছেন তাদেরকে মার্জিত পোশাকের প্রয়োজনীয়তা বোঝানো সহজ হবে।

একই নীতি আপনি যৌন আচরণের ক্ষেত্র ও পদ্ধতির উপর আরোপ করতে পারেন। যৌনতার ওপর আদৌ কোনো বিধিনিষেধ কেন থাকবে? – এই ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন করে আপনি তথাকথিত যৌন স্বাধীনতার দাবিদারদের যতসব ফাও কথাবার্তার অযৌক্তিকতা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারেন।

টাকা-পয়সা ও অর্থ সম্পদের ক্ষেত্রে যারা অযৌক্তিক সাম্য, যেমন সাম‍্যবাদ কিম্বা অগ্রহণযোগ্য অসাম্য তথা পুঁজিবাদের পক্ষে বলেন তাদেরকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার যুক্তিসম্মত বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনার জন্য নৈতিকতার শূন্য নীতি অবলম্বন করা যেতে পারে। অর্থাৎ অর্থ উপার্জন ও সম্পদ আহরণ, উৎপাদন ব্যবস্থা, ভোগ-বিলাস, বিপণন ইত্যাদি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আদৌ কোনো নিয়ম-কানুন না থাকলে কী হতে পারে, কীভাবে সেইসব সম্ভাব্য সমস্যাগুলো সমাধান করা যেতে পারে, এ ধরনের আলোচনায় তাদেরকে নিয়ে আসেন। অর্থাৎ একটা নৈতিক নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে পুরো বিষয়টা নতুন করে আলোচনা শুরু করেন। দেখবেন, যারা অযৌক্তিক অবস্থানের পক্ষে বলছেন তারা তাদের যুক্তির অসারতা বুঝতে পারবেন। অন্ততপক্ষে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকরা what is what বা আসল ঘটনাটা কী তা জানতে পারবেন।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ছাত্রীরা মাঝেমধ্যে সান্ধ্য আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে। সান্ধ্য আইন অনুযায়ী, আবাসিক হলে বসবাসকারী ছাত্রীদেরকে সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে হলে প্রবেশ করতে হয়। আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় এটি বাস্তবসম্মত নিয়ম বা রীতি। বাংলাদেশ প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক ব্যবস্থা ও মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য প্রগতিশীল বামপন্থীদের প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। এরা স্বভাবতই সান্ধ্য আইনের বিপক্ষে। অজুহাত হিসেবে তারা লাইব্রেরি ওয়ার্কের কথা বলে। নৈতিকতার শূন্য মানদণ্ড নীতি প্রয়োগ করে আপনি বলতে পারেন, সন্ধ্যা সাতটা কেন, বা রাত দশটা কেন, রাত দু’টা হলে সুবিধা কী? কেন তাদেরকে রাতে হলে ফিরতে হবে? তারা অভিভাবকদেরকে না জানিয়ে যে কোনো জায়গায় আসা-যাওয়া করলে বা থাকলে অসুবিধা কী? আদৌ এই ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক অভিভাবক-প্রথা থাকার দরকার কী? এই ধরনের ‘মোস্ট প্রগ্রেসিভ’ কথাবার্তা যখন আপনি বলতে থাকবেন তখন দেখবেন প্রগতিশীলরা চুপসে গেছে।

ইসলামের যে কালেমা – কালেমায়ে তাওহীদ – সেটার মধ্যে আমরা এই নীতির প্রয়োগ দেখি। প্রথমত খোদায়ী দাবির সব মিথ্যা দাবিদারদেরকে অস্বীকার করা হয়েছে। এরপর একমাত্র সত্য দাবিদার আল্লাহর কথা বলা হয়েছে। আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনে রেনে ডেকার্ট এই ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। প্রথমে তিনি methodic doubt-এর মাধ্যমে সবকিছুকে খারিজ করেছেন। এরপর reversal of doubt পদ্ধতি অবলম্বন করে সবকিছুকে যথাযথ নিশ্চয়তা সহকারে আবার গ্রহণ করেছেন।

সমাজ, রাষ্ট্র, নীতি-নৈতিকতা এগুলোর দরকার কী? – এ ধরনের প্রশ্নে কিছু কিছু লোককে দেখবেন anarchism বা নৈরাজ্যবাদী মতকে সমর্থন করছেন। নোয়াম চমস্কির মতো অ্যানার্কিস্ট চিন্তাবিদরা যখন বিদ্যমান সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার নানা ধরনের অসংগতি তুলে ধরেন, এসবের সমালোচনা করেন, তখন অ্যানার্কিজমকে আমাদের কাছে খানিকটা plausible বা যুক্তিসঙ্গত মনে হয়। সমাজ ও রাষ্ট্র টিকে থাকা সাপেক্ষে, anti-establishment হিসেবে তাদের সমালোচনাগুলো ক্ষেত্রবিশেষে সঠিক। তাদের এই নৈরাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি যে ভুল তা বুঝানোর জন্য নৈতিকতার শূন্য-মানদণ্ড নীতি প্রয়োগ করা যেতে পারে। সমাজ ও রাষ্ট্র কার্যকর থাকলে আমরা এই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে কী কী সুবিধা পাই তা খুব একটা খেয়াল করি না। ভেঙ্গে পড়ার সমাজের কিংবা রাষ্ট্রহীন মানবগোষ্ঠীর দুর্দশার দিকে তাকালে আমরা বুঝতে পারি সমাজ ও রাষ্ট্র আমাদেরকে কতটুকু দিয়ে থাকে। সমাজ রাষ্ট্র নামক এই প্রপঞ্চগুলো আদৌ যদি না থাকতো তাহলে অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়তো। নৈরাজ্যবাদের দার্শনিক মতবাদ হলো নিহিলিজম। এই মত অনুসারে মানুষের জীবন ও এই জগতের সামগ্রিক কোনো অর্থ বা উদ্দেশ্য নাই। ভাবতে পারেন, কতটা মারাত্মক কথা? যাদের মতে জীবন ও জগতের শেষ পর্যন্ত কোনো অর্থ বা উদ্দেশ্য নাই তারা কেন বেঁচে আছেন, জানি না। এ জীবনের পিছনে কোনো বৃহত্তর যুক্তি না থাকলে কারো পক্ষে আত্মহত্যা করাও অসম্ভব। কারণ কোনো ব্যক্তি কোনো না কোনো কারণে আত্মহত্যা করে। কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন কোনো মানুষ এমন কোনো কাজ করে না, যার পিছনে কোনো উদ্দেশ্য বা কারণ নাই। হতে পারে সেটি ভুল। সেটি ভিন্ন বিবেচনা। মূলকথা হলো মানুষ কারণ ছাড়া কিছু করে না। কারণ ছাড়া কোনো কিছু হবে না। অথচ নৈরাজ্যবাদীরা দাবি করে, সামগ্রিকভাবে জগতের কোনো কারণ বা উদ্দেশ্য নাই। এই ধরনের অ্যানার্কিস্টদেরকে যদি বলেন, এসো আমরা universal অর্থ ও উদ্দেশ্যের সাথে সাথে সব ধরনের particular অর্থ ও উদ্দেশ্যকেও ত্যাগ করি, তখন দেখবেন তিনি নড়েচড়ে বসছেন। নৈতিকতার শূন্য মানদণ্ড নীতিকে প্রয়োগ করে এনার্কিজম বা নিহিলিজমকে খণ্ডন করা সম্ভব।

পোস্টটির ফেসবুক লিংক

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক

নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াই। চাটগাইয়া। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *